চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে
চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন নেমে এসেছে ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এই সময়ে এডিপির মাত্র ৪৮ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে, যা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধীরগতির একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন

বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৭৬৯ কোটি টাকা। টাকার অঙ্ক এবং বাস্তবায়ন হার—উভয় বিবেচনায় গত ছয় অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরে এডিপির মোট আকার ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা।

১৬ বছরের রেকর্ড

আইএমইডির সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে জুলাই-মে সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার সাধারণত ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে ছিল। কিন্তু এবার তা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুর্বল বাস্তবায়নে পিছিয়ে কয়েকটি মন্ত্রণালয়

প্রতিবছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপির আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। তবে চলতি অর্থবছরের ১১ মাসের চিত্রে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম অত্যন্ত হতাশাজনক।

সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ১১ মাসে এক টাকাও ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বাস্তবায়ন হার শূন্য শতাংশে অবস্থান করছে।

এ ছাড়া বরাদ্দের ২৫ শতাংশও ব্যয় করতে পারেনি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, জননিরাপত্তা বিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। এসব প্রতিষ্ঠানকে এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল পারফরমার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কেন কমলো বাস্তবায়ন

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এডিপি বাস্তবায়ন কম হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ করতে ব্যর্থতা অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের ধীরগতির কাজও প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, মামলা-মোকদ্দমা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শুরু করা যায়নি। পাশাপাশি দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, আপত্তি এবং পুনরায় দরপত্র আহ্বানের মতো বিষয়গুলোও প্রকল্প বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

অর্থ সংকটও এডিপি বাস্তবায়নে বড় প্রভাব ফেলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং অন্যান্য বাধ্যতামূলক ব্যয় মেটানোর পর উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের গতি কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প গ্রহণের সময় যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না হওয়ায় পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়ক্ষেপণের ঘটনা ঘটছে। তদারকি ও জবাবদিহির দুর্বলতার কারণে অনেক প্রকল্পে সমস্যা সময়মতো চিহ্নিত ও সমাধান করা সম্ভব হয় না।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অনেক প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন কমিটি কাজ করছে। ফলে কিছু প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি কমেছে এবং অর্থ ছাড়ও সীমিত হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, উন্নয়ন ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ধরে রাখতে প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি কাঠামো শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।