মসজিদুল হারাম: বিশ্বের বৃহত্তম পবিত্র মসজিদের গৌরবময় ইতিহাস
মক্কা শহরের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত মসজিদুল হারাম পৃথিবীর বৃহত্তম ও পবিত্রতম মসজিদ হিসেবে পরিচিত। পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, 'নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো বাক্কায় (মক্কার অপর নাম); তা আশীর্বাদ ও বিশ্বজগতের দিশারি।' (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬)। এই আয়াত মসজিদুল হারামের অতুলনীয় মর্যাদা ও গুরুত্বকে তুলে ধরে।
কাবার ঐতিহাসিক পটভূমি ও নির্মাণ
কাবা, যা বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর নামেও পরিচিত, তাকে 'বায়তুল আতিক' বা প্রাচীন ঘরও বলা হয়। ভৌগোলিক মানচিত্র অনুযায়ী এই ঘরের অবস্থান পৃথিবীর কেন্দ্রে বলে বিবেচিত হয়। কাবার ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের মহৎ আখ্যান। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও শিশুসন্তান ইসমাইল (আ.)-কে জনশূন্য মক্কায় রেখে এসেছিলেন। তৃষ্ণার্ত শিশু ইসমাইলের জন্য তখন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল সুপেয় পানির কূপ 'জমজম'। পরবর্তীকালে আল্লাহর নির্দেশেই পিতা-পুত্র মিলে কাবার পুনর্নির্মাণ করেন, যা আজও মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিরাজমান।
কাবার গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও বৈশিষ্ট্যসমূহ
- হাজরে আসওয়াদ: এটি জান্নাত থেকে আসা একটি পবিত্র পাথর, যা কাবার এক কোণে স্থাপন করা হয়েছে।
- মাকামে ইব্রাহিম: কাবার পাশে যে পাথরে দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম (আ.) নির্মাণকাজ তদারকি করতেন এবং যাতে তাঁর পায়ের ছাপ রয়েছে।
- হাতিম: কাবার উত্তর দিকে অর্ধবৃত্তাকার দেয়ালঘেরা অংশটি কাবারই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয়।
- মুলতাজম: হাজরে আসওয়াদ ও কাবার দরজার মধ্যবর্তী স্থান, যা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
- গিলাফ: কাবাঘরকে আবৃত করে রাখা বিশেষ চাদর, যা প্রতি বছর পরিবর্তন করা হয়।
কাবার পরিমাপ ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা
কাবার উচ্চতা ১৪ মিটার। মুলতাজমের দিকে এর দৈর্ঘ্য ১২.৮৪ মিটার এবং হাতিমের দিকে ১১.২৮ মিটার। রুকনে ইয়ামেনি থেকে হাতিম পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ১২.১১ মিটার এবং হাজরে আসওয়াদ থেকে রুকনে ইয়ামেনি পর্যন্ত ১১.৫২ মিটার। মসজিদুল হারামে এক রাকাত নামাজের সওয়াব অন্য মসজিদের তুলনায় এক লাখ গুণ বেশি বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯৬)।
সুবিধা, নিয়মাবলি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা
বর্তমানে মসজিদুল হারামে ১০০টিরও বেশি প্রবেশপথ রয়েছে। মুসল্লিদের সুবিধার্থে পুরো চত্বর এখন কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। প্রবেশের ক্ষেত্রে আধুনিক সংকেত ব্যবস্থা চালু রয়েছে; প্রবেশের সময় গেটের ওপর সবুজ আলো জ্বললে বুঝতে হবে প্রবেশের অনুমতি আছে, লাল আলো থাকলে প্রবেশ নিষেধ। নামাজ ও কাতারের জন্য মসজিদের ভেতরে ও বাইরে মেঝেতে কিবলামুখী দাগ দেওয়া আছে। জমজম পানি ভেতরে ও বাইরে পান করার জন্য উন্মুক্ত। অসুস্থ বা বয়স্কদের জন্য হুইলচেয়ার ও ব্যাটারিচালিত গাড়ির ব্যবস্থা আছে। মূল্যবান সামগ্রী রাখার জন্য বাইরে লকার সুবিধা পাওয়া যায়। নিরাপত্তাকর্মীরা ব্যাগ চেক করে ভেতরে ঢুকতে দেন এবং সাধারণত বড় ব্যাগ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা যায় না।
মসজিদুল হারামের বিশিষ্ট ইমামগণ
- শেখ আবদুর রহমান আল-সুদাইস: ১৯৮৪ সাল থেকে ইমাম ও খতিব। তিনি বর্তমানে দুই পবিত্র মসজিদের ধর্মীয় বিষয়ক প্রেসিডেন্সির প্রধান।
- শেখ সালেহ বিন আবদুল্লাহ আল-হুমাইদ: ১৯৮৪ সাল থেকে ইমাম ও খতিব।
- শেখ ওসামা আব্দুল আজিজ আল-খায়ইয়াত: ১৯৯৮ সাল থেকে ইমাম ও খতিব।
- শেখ মাহের আল-মুআইকলি: ২০০৭ সালে ইমাম এবং ২০১৬ সালে খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ২০২৪ সালের হজের খুতবা প্রদান করেন।
- শেখ ফয়সাল জামিল গাজ্জাবী: ২০০৮ সাল থেকে ইমাম ও খতিব।
- শেখ আবদুল্লাহ আওয়াদ আল-জুহানি: ২০০৭ সালে ইমাম এবং ২০১৯ সালে খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।
- শেখ বান্দার বালিলাহ: ২০১৩ সালে ইমাম এবং ২০১৯ সালে খতিব হন।
- শেখ ইয়াসির আদ-দৌসারি: ২০১৯ সালে ইমাম নিযুক্ত হন। ২০২৩ সালে সাময়িক বিরতির পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে পুনরায় ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
- শেখ বদর আল তুর্কি: ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর রাজকীয় আদেশে ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান।
- শেখ ওয়ালিদ আশ-শামসান: ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর রাজকীয় আদেশে ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান।
মসজিদুল হারাম শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং এটি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দু। এর ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিশ্বব্যাপী লক্ষাধিক মুসল্লিকে আকর্ষণ করে চলেছে।



