সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)-এর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা: মুকাওকিসের প্রশ্নের কালজয়ী উত্তর
সাহাবি হাতিব (রা.)-এর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও মুকাওকিসের প্রশ্নের উত্তর

সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)-এর অনন্য কূটনৈতিক দক্ষতা

যেকোনো আদর্শ বা বার্তা প্রচারের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তথ্য জানাই যথেষ্ট নয়, বরং তা উপস্থাপনের কৌশল ও প্রজ্ঞা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রাথমিক যুগের সাহাবিরা কেবল ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন অসাধারণ কূটনীতিক। তাঁদের বিচক্ষণতা ও উপস্থিত বুদ্ধি সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে মূল ভূমিকা পালন করেছিল। এই তালিকায় অন্যতম উজ্জ্বল নাম হলেন বদরি সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন সাহাবি

হাতিব (রা.) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, দক্ষ তীরন্দাজ এবং ঘোড়সওয়ার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর ভাষাজ্ঞান ছিল ঈর্ষণীয়; তিনি একজন সাবলীল কবিও ছিলেন। ইসলামের দাওয়াতি মিশনের জন্য তাঁর এই ব্যক্তিগত যোগ্যতাসমূহ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।

মিসরের শাসক মুকাওকিসের দরবারে একটি ঐতিহাসিক মিশন

হোদাইবিয়ার সন্ধির পর আরবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হলে, রাসুল (সা.) সমকালীন বিশ্বনেতাদের কাছে ইসলামের বার্তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই প্রেক্ষাপটে হাতিব (রা.)-কে মিসরের শাসক মুকাওকিসের কাছে প্রেরণ করা হয়। দরবারে উপস্থিত হয়ে মুকাওকিস হাতিবকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি যাঁর পক্ষ থেকে এসেছ, তিনি কি সত্যিই আল্লাহর নবী?’ হাতিব (রা.) আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দেন, ‘অবশ্যই।’ তখন মুকাওকিস একটি চ্যালেঞ্জিং প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুকাওকিস বলেন, ‘যদি তিনি সত্যিই নবী হন, তবে মক্কার লোকেরা যখন তাঁকে নিজ দেশ থেকে বের করে দিচ্ছিল, তখন তিনি তাদের ওপর বদদোয়া করলেন না কেন?’ এই প্রশ্নটি ছিল বেশ জটিল এবং আবেগ বা তাত্ত্বিক আলোচনার পরিবর্তে হাতিব (রা.) এক অভাবনীয় উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একটি কালজয়ী যুক্তির মাধ্যমে জবাব

হাতিব (রা.) সরাসরি তর্কে না জড়িয়ে মুকাওকিসের নিজস্ব বিশ্বাসের একটি রেফারেন্স সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘আপনি তো ইসা ইবনে মারিয়ামকে (আ.) আল্লাহর নবী বলে মানেন। তাঁকে যখন তাঁর নিজের জাতি শূলিতে চড়ানোর চেষ্টা করেছিল, তখন তিনি কেন তাদের ধ্বংসের জন্য বদদোয়া করলেন না?’ মুকাওকিস এমন উত্তরের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। নিজের ধর্মতত্ত্বের এই উদাহরণটি তাঁকে স্তব্ধ করে দেয়।

হাতিব (রা.)-এর এই জবাবে মুগ্ধ হয়ে মুকাওকিস বলেন, ‘তুমি সত্যিই একজন জ্ঞানী ব্যক্তি, এবং তুমি একজন জ্ঞানীর পক্ষ থেকেই প্রেরিত হয়েছ।’ (সাহারানপুরি, বাজলুল মাজহুদ, ১২/১০১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৯৯৬ খ্রি.) এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, নবীদের বৈশিষ্ট্য প্রতিহিংসা নয়, বরং অসীম ধৈর্য ও সহনশীলতা। তাঁরা বদদোয়া করতে আসেননি, এসেছেন মানবতার মুক্তিদাতা হিসেবে।

বর্তমান সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

হাতিব (রা.)-এর এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, বর্তমান সময়ের একজন দাঈ বা বক্তার জন্যও শ্রোতার মানসিকতা ও বিশ্বাস বুঝে কথা বলা অত্যন্ত জরুরি। কঠিন প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে পাল্টা যুক্তির মাধ্যমে সুন্দরভাবে দেওয়া যায়, এটি তারই একটি ধ্রুপদি উদাহরণ। এই প্রজ্ঞা ও কৌশল আজকের যুগেও ইসলামী দাওয়াত ও শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক এবং অনুসরণীয়।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।