হজ ও ওমরাহ: ইসলামের পবিত্র ইবাদতের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
পবিত্র কাবা শরিফে হজ পালন করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য জীবনে একবার ফরজ ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। অন্যদিকে, ওমরাহ করা সুন্নত হিসেবে বিবেচিত হয়। হজের নিয়ত করার সময়সীমা হচ্ছে পয়লা শাওয়াল থেকে শুরু করে ৯ জিলহজ পর্যন্ত। ওমরাহর নিয়ত করার জন্য বছরের যেকোনো সময় উপযুক্ত, তবে ৮ জিলহজ থেকে ১০ জিলহজ পর্যন্ত সময় ব্যতীত। হজ ও ওমরাহর নিয়তকে ইসলামী পরিভাষায় ইহরাম বলা হয়ে থাকে।
হজের তিনটি প্রধান ধরন
ইফরাদ হজ বা একক হজ: এই ধরনের হজে শুধুমাত্র হজের ইহরামের নিয়ত করে তা সম্পন্ন করতে হয়। হজ পালনকারী মক্কা শরিফে পৌঁছার পর তাওয়াফে কুদুম আদায় করেন এবং ইহরাম না খুলে রেখে ১০ জিলহজ হজ সম্পন্ন হওয়ার পর ইহরাম ত্যাগ করেন।
কিরান হজ বা যৌথ হজ: এই পদ্ধতিতে হজ ও ওমরাহর জন্য একত্রে ইহরামের নিয়ত করে একই ইহরামে উভয় ইবাদত সম্পন্ন করা হয়। প্রথমে ওমরাহর তাওয়াফ ও সাঈ আদায় করার পর সেই একই ইহরামে হজ সম্পাদন করে ১০ জিলহজ ইহরাম ত্যাগ করতে হয়।
তামাত্তু হজ: এই ধরনের হজে প্রথমে শুধুমাত্র ওমরাহর ইহরামের নিয়ত করে তা সম্পাদন করা হয়। ওমরাহ সম্পন্ন হওয়ার পর ৭ জিলহজ তারিখে হজের জন্য নতুন করে ইহরামের নিয়ত করে ১০ জিলহজ তা সম্পন্ন করতে হয়।
ওমরাহ ও হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত
ওমরাহর ফরজ: ওমরাহর জন্য দুটি ফরজ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে ইহরামের নিয়ত করা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাওয়াফ করা।
ওমরাহর ওয়াজিব: সাফা-মারওয়া সাঈ করা এবং মাথা মুণ্ডন করা বা চুল কাটা ওমরাহর দুটি ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হয়।
হজের ফরজ: হজের তিনটি ফরজের মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে ইহরামের নিয়ত করা। দ্বিতীয় ফরজ হচ্ছে অকুফে আরাফা করা, অর্থাৎ ৯ জিলহজ জোহর থেকে ১০ জিলহজ ফজরের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। তৃতীয় ফরজ হচ্ছে তাওয়াফে জিয়ারত করা, যা ১০ জিলহজ ভোর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় কাবাঘর তাওয়াফ করার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
হজের ওয়াজিবসমূহের বিস্তারিত বিবরণ
হজের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কিছু সময় মুজদালিফায় অবস্থান করা। ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ শয়তানকে পাথর মারা এবং তামাত্তু ও কিরান হজে দমে শোকর বা কোরবানি করা। মাথার চুল মুণ্ডন করে বা কেটে ইহরাম সমাপ্ত করা, সাফা ও মারওয়া সাঈ করা এবং বিদায়ী তাওয়াফ করা। হজের আগে বা পরে মদিনা শরিফে রওজাতুন নবী (সা.) জিয়ারত করাও হজের ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত।
হজের সুন্নতসমূহ ও বিশেষ নির্দেশনা
হজের সুন্নতগুলোর মধ্যে তাওয়াফে কুদুম বা প্রথম তাওয়াফ করা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা ইফরাদ ও কিরান হজকারীদের জন্য প্রযোজ্য। ফরজ তাওয়াফে পুরুষদের জন্য ইজতিবা করা, অর্থাৎ ডান হাত ও ডান কাঁধ চাদরের বাইরে রাখা। পুরুষদের তাওয়াফের সময় রমল করা এবং সাঈর সময় মিলাইন আখদারাইনের মাঝখানে দ্রুত অতিক্রম করাও সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
৯ জিলহজ আরাফার দিন সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য রোজা রাখা সুন্নত হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে হজ পালনরত হাজিদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা নিষেধ। ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ সব মুসলিমের জন্য রোজা রাখা নিষেধ, বিশেষ করে হজ পালনরত হাজিদের জন্য ১০ জিলহজ ঈদুল আজহার দিন রোজা রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাজিদের জন্য ঈদুল আজহার নামাজও প্রযোজ্য নয় বলে ইসলামী নির্দেশনা রয়েছে।
লেখক: অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম



