প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চরিত্র ছিল অপরিসীম মহানুভবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কোমল আচরণ ও অসীম ক্ষমাশীলতা বহু কঠিন হৃদয়কে গলিয়ে দিয়েছে, আলোকিত করেছে অন্ধকার পথ। তেমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ইহুদি পণ্ডিত যায়েদ ইবনে সানাহর সঙ্গে।
সত্যের সন্ধানে এক পণ্ডিত
যায়েদ ইবনে সানাহ ছিলেন একজন ইহুদি পণ্ডিত। তাঁর অন্তরে সত্যের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল, কিন্তু তিনি তখনও সঠিক পথ খুঁজে পাননি। একদিন তিনি নবী করিম (সা.)-কে কিছু ঋণ দেন। ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় তখনও শেষ হয়নি; বরং আরও তিন দিন বাকি ছিল।
অপ্রত্যাশিত আচরণ
একদিন নবীজি (সা.) হেঁটে যাচ্ছিলেন, সঙ্গে ছিলেন হজরত ওমর (রা.)। পথিমধ্যে হঠাৎ যায়েদ ইবনে সানাহর সঙ্গে দেখা। তিনি অকস্মাৎ নবীজির (সা.) দিকে ধেয়ে আসেন এবং তাঁর কাপড় শক্ত করে ধরে ফেলেন। রুক্ষ কণ্ঠে ও কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, 'তোমরা বনি আবদুল মুত্তালিবের লোকেরা ঋণ পরিশোধে বড় টালবাহানা কর!' এই অসম্মানজনক আচরণ দেখে হজরত ওমর (রা.) ক্রোধে ফেটে পড়েন। তাঁর গর্জন যেন আকাশ কাঁপিয়ে দেয়।
নবীজির মৃদু হাসি ও শিক্ষা
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়! এই উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে নবীজি (সা.)-এর ঠোঁটে ফুটে ওঠে একটি মৃদু হাসি—শান্ত, প্রশান্ত ও আলোকময়। তিনি কোমল কণ্ঠে বলেন, 'হে ওমর! আমি ও সে—আমরা দুজনই তোমার কাছে অন্য কিছুর প্রত্যাশী ছিলাম। তুমি আমাকে বলতে—আমি যেন সুন্দরভাবে ঋণ পরিশোধ করি। আর তাকে বলতে—সে যেন ভদ্রভাবে তার পাওনা চায়।' এই কথার মাধ্যমে নবীজি (সা.) নিজের সাহাবিকেও নরমভাবে শিখিয়ে দিলেন আদব ও শালীনতার পাঠ।
অসীম উদারতা
এরপর নবীজি (সা.) জানান যে ঋণ পরিশোধের এখনও তিন দিন বাকি। তবুও তিনি হজরত ওমর (রা.)-কে নির্দেশ দেন, 'তার পাওনা পরিশোধ করে দাও, আর এই তিন দিনের বিনিময়ে তাকে আরও ত্রিশ সা পরিমাণ বাড়িয়ে দাও।' এই উদারতা যেন দয়ার সাগর থেকে উত্থিত এক বিশাল ঢেউ।
কঠিন হৃদয়ের পরিবর্তন
নবীজির (সা.) এই মহানুভবতা যায়েদ ইবনে সানাহর হৃদয়ের কঠিন আবরণ বিদীর্ণ করে দেয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন, 'আমি অন্যায় করেছি। সময়ের আগেই দাবি করেছি, তাও আবার কেমন রূঢ়ভাবে! একজন সম্মানিত মানুষকে এভাবে কাপড় চেপে ধরা—এ কেমন আচরণ! অথচ তিনি কিছুই বললেন না, বরং উল্টো আমাকে আরও বেশি দিলেন!' এই চিন্তা তাঁকে বিচলিত করে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন, এমন মহানুভব মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
ইসলাম গ্রহণ
নবীজির (সা.) অপার ক্ষমাশীলতা ও মহানুভবতা যায়েদ ইবনে সানাহর অন্ধকার হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে দেয়। সত্য তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি আর দেরি করেন না—ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। এভাবেই এক মহান চরিত্র ও কোমল আচরণ একটি জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দেয়।
এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, কঠোরতা নয়, বরং কোমলতা ও ক্ষমাশীলতাই হৃদয় জয় করতে পারে। নবী করিম (সা.)-এর চরিত্রই ছিল সবচেয়ে বড় দাওয়াত। (সূত্র: মুসতাদরাকে হাকেম ২২৩৭, ৬৫৪৭; মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১৩৮৯৮)



