অর্কিড চাইল্ড: ছোট পরিবর্তনেও অস্বস্তি, জানুন বৈশিষ্ট্য ও করণীয়
অর্কিড চাইল্ড: ছোট পরিবর্তনেও অস্বস্তি, জানুন বৈশিষ্ট্য

অর্কিড চাইল্ড: ছোট পরিবর্তনেও অস্বস্তি, জানুন বৈশিষ্ট্য ও করণীয়

অর্কিড চাইল্ডরা ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সহায়ক পরিবেশ পেলে অসাধারণভাবে বিকশিত হয়। কিন্তু চাপ, অবহেলা বা কঠোর পরিবেশে সহজেই মানসিকভাবে কষ্ট পায়। আর ছোটবেলার সেই ট্রমা বড় হওয়ার পরও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অর্কিড ও ড্যান্ডেলিয়ন শিশুর পার্থক্য

অর্কিড চাইল্ডের বিপরীতে আছে ড্যান্ডেলিয়ন চাইল্ড। যারা ড্যান্ডেলিয়ন ফুলের মতো, প্রায় সব পরিবেশেই টিকে থাকতে পারে, সহজে মানিয়ে নেয়, সামাজিক, তারা ড্যান্ডেলিয়ন শিশু। নিজের অভিজ্ঞতা আমার বড় ভাই ছোটবেলায় ঘর থেকে বের হতেই ভয় পেত। ওকে নিয়ে ঈদে দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি যাওয়া ছিল মুশকিলের ব্যাপার। সারা রাস্তা বাসে চিৎকার করে কাঁদত। বাসায় কেউ বেড়াতে এলে পালিয়ে থাকত। পারতপক্ষে কারও সামনে আসত না। নিজের মনে খেলত। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সে বদলেছে, মানিয়ে নিতে শিখেছে। আর এখন সে অনেকটাই সামাজিক।

আমার ৩ বছরের সন্তানও আরও ছোটবেলায় আমার কোল থেকে নামতেই চাইত না। দাদিবাড়ি বা নানিবাড়ি গেলে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতেই তার প্রায় ৪-৫ দিন লেগে যেত। আমার সন্তান প্রথম প্রথম দাদিবাড়ি বা নানিবাড়ি গিয়ে কিছুই খেতে চাইত না। দুই বা তিন দিন টয়লেটও করত না। ধীরে ধীরে ওকে নিয়ে বিভিন্ন কিডস জোন ও উদ্যানে হাঁটতে যেতাম। অন্যান্য ফ্ল্যাটের শিশুদের বাসায় ডেকে এনে খেলতে বসিয়ে দিতাম, এখনো এসব করি। এভাবে ধীরে ধীরে আমার সন্তান পরিবর্তনের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে শিখছে। এখন সে তার ফুফুর বাসা, দাদিবাড়ি বা নানিবাড়ি গেলে সেখানকার শিশুদের সঙ্গে খেলে। আগের মতো জ্বালাতন করে না মোটেও।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্কিড চাইল্ডের বৈশিষ্ট্য

ছোটবেলায় ভাইয়া বা আমার সন্তানের মধ্যে যে 'অর্কিড চাইল্ড'-এর কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, তা এখন বলা যেতেই পারে। আপনার সন্তানের মধ্যেও এ রকম বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। অর্কিড চাইল্ডের বৈশিষ্ট্য মূলত ৪টি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১. এই শিশুরা পরিবর্তন মোটেও পছন্দ করে না

এই ধরনের শিশুরা ছোট পরিবর্তনেও অস্বস্তি বোধ করে। যেমন নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, রুটিনের বদল ইত্যাদি। তারা নিরাপদ ও পরিচিত পরিবেশে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অপরিচিত পরিবেশে সহজে ক্লান্ত হয়ে যায়। দ্রুত বাড়িতে মায়ের কোলে ফিরতে চায়।

২. খুব সহজেই অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়

জোরে শব্দ হলে, বিদ্যুৎ চমকালে, উজ্জ্বল আলোয়, ভিড়ে এই শিশুরা খুবই বিরক্ত হয়। অস্বস্তিতে বা ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে।

৩. বেছে খায়

এই শিশুরা সাধারণত নির্দিষ্ট খাবারই খেতে চায়। নতুন খাবার এড়িয়ে চলে। কারণ, তারা নতুন কিছুতে অস্বস্তি বোধ করে।

৪. খুব ছোট ও নির্দিষ্ট সামাজিক পরিসর

এই শিশুদের বন্ধুসংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। তবে অল্প কিছু মানুষের সঙ্গে তারা গভীর সম্পর্ক গড়ে। বড় সামাজিক পরিবেশে অস্বস্তি বোধ করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

এটি কোনো সমস্যা বা রোগ নয়। বরং এটি একধরনের বৈশিষ্ট্য বা ব্যক্তিত্বের ধরন। সময়ের সঙ্গে প্রায় সব অর্কিড শিশু তাদের ব্যক্তিত্বের দুর্বল দিকগুলো মোকাবিলা করে, কাটিয়ে ওঠে। বিশেষ করে স্কুলে ভর্তির পর সঠিক পরিবেশ পেলে এই শিশুরা ধীরে ধীরে খোলস থেকে বেরিয়ে নিজেদের মেলে ধরার প্রয়াস পায়।

অর্কিড চাইল্ডের ধারণা

অর্কিড চাইল্ডের ধারণাটি তুলে ধরেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক টমাস বয়েস ও ব্রুস ইলিস। এখানে দুই ধরনের শিশুদের ওপর গবেষণাটি পরিচালিত হয়। কিছু শিশু বেশি সংবেদনশীল, আর কিছু শিশু তুলনামূলকভাবে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে।

অর্কিড শিশুদের ভালো দিক

  • খুব সহানুভূতিশীল
  • সাধারণত সৃজনশীল হয়
  • এরা ভালো পর্যবেক্ষক
  • অন্যদের অনুভূতি ভালো বুঝতে পারে
  • সঠিক পরিবেশ পেলে তারা অসাধারণভাবে সফল হতে পারে

অর্কিড শিশুর অভিভাবকদের করণীয়

১. নিরাপদ ও স্থির পরিবেশ তৈরি করুন

এই শিশুরা হঠাৎ পরিবর্তন পছন্দ করে না। ঘুম, খাওয়া, খেলা, পড়ার নিয়মিত রুটিন বজায় রাখুন। ঘরে শান্ত পরিবেশ রাখার চেষ্টা করুন।

২. আবেগ বুঝুন, অবহেলা নয়

এই শিশুরা ছোট বিষয়েও বেশি কষ্ট পেতে পারে। কোনো কিছু কিছু 'না' বললে মেনে নিতে পারে না। ভীষণ জেদ করে। তাই 'না'-টাকেই ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বুঝিয়ে বলুন।

৩. ধীরে ধীরে নতুন অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত করুন

একবারে বড় পরিবর্তন না এনে ধাপে ধাপে নতুন পরিবেশ বা মানুষের সঙ্গে পরিচয় করান।

৪. অতিরিক্ত চাপ দেবেন না

পড়াশোনা, পারফরম্যান্স, সামাজিক প্রত্যাশা—কোনো কিছু নিয়েই শিশুকে চাপ দেবেন না। বেশি চাপ দিলে তারা ভেঙে পড়তে পারে।

৫. আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করুন

ছোট ছোট সাফল্যের প্রশংসা করুন। ব্যর্থ হলেও উৎসাহ দিন।

৬. নিজেকে প্রকাশ করতে উৎসাহ দিন

ছবি আঁকা, লেখা, গল্প বলা—এসব শিশুদের আবেগ প্রকাশের ভালো উপায়।

৭. নিজের আচরণে উদাহরণ দিন

শিশুরা দেখে শেখে। আপনি শান্ত থাকলে তারাও ধীরে ধীরে শিখবে কীভাবে আবেগ সামলাতে হয়।

প্রয়োজনে শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ বা থেরাপি নিতে পারেন।

সূত্র: প্যারেন্টস ডটকম