ছবি: পেক্সেলস
নবীজি বসে আছেন চাদর মুড়ি দিয়ে। কিছু সময় আগেও ঠকঠক করে কাঁপছিলেন তিনি। যেনবা প্রবল জ্বরে আক্রান্ত। আজ বাইরে থেকে এসে ঘরে প্রবেশ করেন যখন, তখন থেকেই কাঁপছেন তিনি। ঘরে ঢুকেই প্রিয়তমা খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে বলেন—‘আমাকে চাদরে মুড়ে দাও! আমাকে চাদরে মুড়ে দাও!’
এমন সময় ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) এসে বললেন, “হে চাদরাবৃত, উঠুন, মানুষকে সতর্ক করুন। মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন আপনার প্রতিপালকের। আপনার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখুন এবং দূরে থাকুন অপবিত্রতা থেকে।” (সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত: ১-৫)
এই ঘটনার কিছু দিন আগের ঘটনা।
মক্কার আকাশজুড়ে সে–সময় অন্ধকার। মানুষ সব ডুবে আছে প্রতিমার উপাসনায়। একত্ববাদের যে সুরভি মক্কার বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর নবী ইব্রাহিম (আ.), কল্পিত দেবতাদের কদর্য গন্ধে তা আজ বিলীয়মান। মানুষের মধ্যে মানবতা নেই। চারপাশজুড়ে কেবল হানাহানি, গোত্রীয় বিদ্বেষ আর অকারণ রক্তপাত!
মুহাম্মদ প্রত্যহ এমন মন-খারাপ-করা দৃশ্যাবলি দেখে চলেন। চেনামুখ মানুষগুলোর এমন চারিত্রিক অধঃপতন, জাতিগত অবক্ষয় দেখে দেখে তিনি ক্লান্ত বোধ করেন। হৃদয় তাঁর হয়ে ওঠে ব্যথাভার।
মুহাম্মদ প্রত্যহ এমন মন-খারাপ-করা দৃশ্যাবলি দেখে চলেন। চেনামুখ মানুষগুলোর এমন চারিত্রিক অধঃপতন, জাতিগত অবক্ষয় দেখে দেখে তিনি ক্লান্ত বোধ করেন।
তিনি সারাক্ষণ ভাবেন—মানুষগুলোর চারিত্রিক অধঃপতন থেকে উত্তরণ সম্পর্কে। তিনি ভাবেন—একটি জাতিকে কীভাবে উদ্ধার করা যায় এমন বিনাশ ও ক্ষয়ে যাওয়া থেকে। নিজেদেরই হাতে নির্মিত দেব-দেবীর অহেতুক উপাসনা থেকে কী উপায়ে ফেরানো যায় তাঁদের—এমন সব চিন্তায় উদ্বিগ্ন থেকেই কেটে যায় কোরাইশ যুবক মুহাম্মদের দিন-রাত!
এই সময়ে তাঁর ভাবনাতে হাজির হয় নির্জনবাসের কথা। নির্জনে ধ্যানমগ্ন সময় পার করবার জন্য তিনি বেছে নেন মক্কারই অদূরে অবস্থিত নুর পর্বতের একটি গুহাকে। ইতিহাস যেই গুহাটি ‘হেরা’ নামে স্মরণ রেখেছে। নির্জনতা ও নৈঃশব্দ্যে ঠাসা পাথুরে গুহা হেরা। কাছেধারে প্রাণের চিহ্ন নেই।
আরও পড়ুন‘আপনি নাগরিক এই শহরের’২০ জানুয়ারি ২০২৬
গুহার চারপাশ ঘেঁষে কেবল লতাগুল্ম আর কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড়ের জঙ্গল। পানির কোনো উপস্থিতি তো নেইই, এমনকি একটু উঁচু ছায়াদার কোনো বৃক্ষও নেই জাবালে নুর কিংবা হেরা গুহার আশপাশে। এরই মধ্যে স্রষ্টার সঙ্গে ঐকান্তিক আলাপনের সাধনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন মুহাম্মদ। একাকী তিনি আর তাঁর সঙ্গে গহিন-গভীর নিস্পন্দ নীরবতা।
এমনই একদিন। হেরা গুহার নির্জন কোণে ধ্যানমগ্ন মুহাম্মদ। মক্কার কোলাহল, পৌত্তলিকতার কটু গন্ধ, মানুষের অন্তর্বর্তী কলহ-বিদ্বেষ—সব থেকে দূরে এক গভীর নৈঃশব্দ্যের মাঝে ডুবে আছেন পবিত্রতম তন্ময়তায়। তখন সেই অন্ধকারে ভরা গুহায় তিনি কারও কণ্ঠধ্বনি শুনে উঠলেন। অনুভব করে উঠলেন যেন কোনো অচিনলোকের কোনো অচেনা সত্তার উপস্থিতি!
আগন্তুক মানুষ নন। মক্কার বুকেও তাঁকে আজকের পূর্বে দেখেননি কখনো। কণ্ঠে অভাবিত গাম্ভীর্য ঢেলে আগন্তুক বলে উঠলেন, ‘পড়ুন।’ মুহাম্মদ জবাব দেন, ‘আমি পড়তে জানি না।’
এ কথা শোনার পর আগন্তুক মুহাম্মদের সামনে এগিয়ে এলেন। আর তারপর তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে এত জোরে চাপ দিলেন, যেন দম বন্ধ হয়ে এল তাঁর! আগন্তুক ফের বলে উঠলেন, ‘পড়ুন।’ মুহাম্মদ এবারও উত্তর করলেন, ‘আমি পড়তে জানি না।’
যখন মুক্ত হলেন মুহাম্মদ আগন্তুকের বাহুডোর থেকে, তিনি আর উচ্চারণ করলেন না ‘পড়ুন’; বরং নিজেই তিনি পড়তে থাকেন এক মুগ্ধকর বাণী, যা মুহাম্মদ ইতিপূর্বে শোনেননি কখনো।
আগন্তুক দ্বিতীয়বারের মতো মুহাম্মদকে চেপে ধরলেন বুকের সঙ্গে। তেমনই দমবন্ধ অবস্থা! ছেড়ে দিয়ে আগন্তুক তৃতীয়বারের মতো বলে ওঠেন, ‘পড়ুন...’ এবারও মুহাম্মদের জবাব সেই পূর্ববৎ। এবং মুহাম্মদের জবাব শেষ হতেই বুকে জড়িয়ে ধরার চিত্র আবারও চিত্রিত হলো নুর পর্বতের সেই নির্জন গুহাভ্যন্তরে।
তবে এবারের দৃশ্যপটে সামান্য পরিবর্তন এল। তৃতীয়বার যখন মুক্ত হলেন মুহাম্মদ আগন্তুকের বাহুডোর থেকে, তিনি আর উচ্চারণ করলেন না ‘পড়ুন’; বরং নিজেই তিনি পড়তে থাকেন এক মুগ্ধকর বাণী, যা মুহাম্মদ ইতিপূর্বে শোনেননি কখনো।
তিনি বললেন, ‘পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন; আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন; শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১-৫)
মুহাম্মদ ঘরে ফিরে এলেন কম্পিত পায়ে। কেবল পা নয়, কাঁপছে তাঁর সর্বাঙ্গ। নিজের ব্যাপারে তিনি প্রবলভাবে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। উৎকণ্ঠিত তিনি কেবল বলতে থাকেন—‘আমায় চাদরাবৃত করো। ঢেকে দাও আমাকে চাদরে।’
আরও পড়ুনআরবের অন্ধযুগ ও মহানবী স. এর আগমন১৬ অক্টোবর ২০২৫
মুহাম্মদের উৎকণ্ঠা স্পর্শ করে জীবনসঙ্গিনী খাদিজাকেও। দ্রুত তিনি ভারী চাদরে ঢেকে দেন প্রিয়তমের দেহ। কাজ হয় তাতে। ধীরে ধীরে কমে আসে শরীরের কম্পন। স্বাভাবিক স্থিতি ফিরে আসতে থাকে। সন্ত্রস্তভাব একদমই উবে যায় যখন, মুহাম্মদ সব বলতে থাকেন বিশ্বাস ও আস্থার স্থল সঙ্গিনী খাদিজার কাছে। আদ্যোপান্ত সব তাঁকে বলে চলেন। বাদ দেন না শঙ্কার কথাও। প্রিয়তমার কাছে শঙ্কাজড়ানো স্বরে তিনি বলেন—‘নিজের জীবনের ব্যাপারে শঙ্কা হচ্ছে আমার!’
জীবনের চেয়েও প্রিয় মানুষটাকে এমন ঘাবড়ে যেতে দেখে সান্ত্বনা দেন খাদিজা। কণ্ঠে পরম মমতা ঢেলে বলেন, ‘এ হতে পারে না। আল্লাহ আপনাকে কখনোই অপদস্থ করবেন না। আপনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অসহায়ের ভার বহন করেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন রিক্ত-নিঃস্ব ও দীন-দুঃখীদের দিকে। মেহমানকে সম্মান করেন, সহায়তা করেন বিপদগ্রস্ত মানুষের। আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করবেন—তা হতেই পারে না।’
খাদিজা প্রিয় মানুষটির অস্থিরতা দূর করতে কেবল সান্ত্বনাবাক্য আউড়েই বসে থাকলেন না; মুহাম্মদের মনে জেগে ওঠা শঙ্কা একদম দূর করে দিতে তাঁকে নিয়ে রওয়ানা করলেন ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে।
ওয়ারাকা মুহাম্মদের জবানিতে ঘটনা শুনে বলেন, ‘ইনি তো সেই ফেরেশতা, মুসার কাছে যিনি আসমানি বার্তা নিয়ে আসতেন। হায়, যদি আমি শক্ত-সমর্থ যুবক থাকতাম!
ওয়ারাকা ইবনে নওফেল খাদিজার চাচাতো ভাই। তিনি তৎকালে খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। তাঁর দক্ষতা ছিল হিব্রু ভাষায়। তিনি সে ভাষায় অবতীর্ণ ইনজিল থেকে অনুবাদ করতেন। তখন তাঁর পড়ন্ত বয়স। একদমই বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। চোখেও দেখতে পান না ঠিকমতো। অত্যন্ত জ্ঞানী ব্যক্তি বলে খাদিজা মুহাম্মদকে নিয়ে যেতে চাইলেন তাঁর কাছে।
ওয়ারাকা মুহাম্মদের জবানিতে ঘটনার বিস্তার শুনে বলেন, ‘ইনি তো সেই ফেরেশতা, মুসার কাছে যিনি আসমানি বার্তা নিয়ে আসতেন। হায়, আপনার নবুয়তকালে যদি আমি শক্ত-সমর্থ যুবক থাকতাম! হায়, সেই মুহূর্তে যদি আমি জীবিত থাকতাম, যখন আপনার গোত্রের মানুষ আপনাকে দেশান্তর করে ছাড়বে। আপনাকে বের করে দেবে আপনারই জনপদ থেকে।’
ওয়ারাকার কথায় মুহাম্মদ দারুণ বিস্মিত হন। অবাক চোখে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘আমার স্বগোত্রের লোকেরা আমাকেই বের করে দেবে!’ তিনি উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ, অতীত বলে, যে-ই তোমার মতো আসমানি বার্তা নিয়ে এসেছেন, তাঁর সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। তবে সেদিন যদি আমি থাকি, তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব।’
কিন্তু ওয়ারাকার নসিব এতটা সুপ্রসন্ন ছিল না। এই সাক্ষাৎপর্বের অল্প কদিন পরেই মৃত্যুবরণ করেন ভালো মানুষ ওয়ারাকা ইবনে নওফেল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৫৩)
আরও পড়ুনমক্কার অনুর্বর উপত্যকায় বসতি ও ভাষার প্রশ্ন১১ জানুয়ারি ২০২৬
প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
ইসলাম থেকে আরও পড়ুন
নবীজি (সা.)
সিরাত
মহানবী (সা.)
মহানবী (সা.) এর জীবনী
নবুয়তের কাহিনি



