দাড়ি রাখা নবী-রাসুলদের চিরন্তন সুন্নত এবং ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন (শিআরে ইসলাম)। মানবজাতির ইতিহাসের শুরু থেকেই দাড়ি পুরুষত্ব, মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ইসলাম এই স্বাভাবিক ফিতরাতকে সংরক্ষণ করেছে এবং মুসলিম পুরুষদের জন্য দাড়ি রাখাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
দাড়ি শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; বরং এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ, মুসলিম পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ এবং আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক। তাই একজন মুমিনের জন্য দাড়ির বিধান, গুরুত্ব ও সঠিক পদ্ধতি জানা অত্যন্ত প্রয়োজন।
কুরআনের আলোকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ
যদিও পবিত্র কুরআনে দাড়ি রাখার বিষয়ে সরাসরি কোনো আদেশ নেই, তবে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণকে ঈমানের অপরিহার্য দাবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ২১) আরও ইরশাদ হয়েছে—وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا ‘রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ৭)
দাড়ি রাখার ধর্মীয় গুরুত্ব ও হুকুম
ইসলামি ফিকহবিদ ও অধিকাংশ আলেমের মতে, দাড়ি রাখা ওয়াজিব (আবশ্যক)। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় দাড়ি বৃদ্ধি করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—أَعْفُوا اللِّحَى وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ ‘তোমরা দাড়ি বৃদ্ধি করো এবং গোঁফ ছোট করো।’ (বুখারি ৫৮৯২, মুসলিম ২৫৯) আরেক বর্ণনায় এসেছে—خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ، وَفِّرُوا اللِّحَى وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ ‘মুশরিকদের বিরোধিতা কর; দাড়ি বড় কর এবং গোঁফ ছোট কর।’ (বুখারি ৫৮৯২) যেহেতু এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সরাসরি নির্দেশ, তাই অধিকাংশ ফকিহের মতে দাড়ি মুণ্ডন করা বা শরয়ি পরিমাপের নিচে নামিয়ে আনা গুনাহের কাজ।
দাড়ির সুন্নতি বা শরয়ি পরিমাপ কতটুকু?
দাড়ির শরয়ি পরিমাপ সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) যখন হজ বা ওমরাহ করতেন, তখন তিনি নিজের দাড়ি মুঠ করে ধরতেন এবং মুষ্টির অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন।’ (বুখারি ৫৮৯২) এ ছাড়া হজরত ওমর (রা.)-এর কাছ থেকেও এক মুষ্টির অতিরিক্ত দাড়ি ছাঁটার বর্ণনা পাওয়া যায়। এ ভিত্তিতে অধিকাংশ হানাফি, মালেকি ও হাম্বলি আলেমের মত হলো—
- এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা: এক মুষ্টি পরিমাণ দাড়ি রাখা ওয়াজিব।
- এক মুষ্টির কম রাখা: এক মুষ্টির কম রাখা বা সম্পূর্ণ মুণ্ডন করা অধিকাংশ ফকিহের মতে মাকরুহে তাহরিমি বা হারামের পর্যায়ের গুনাহ।
- এক মুষ্টির বেশি হলে: এক মুষ্টির অতিরিক্ত অংশ ছেঁটে ফেলা জায়েজ।
দাড়ির অন্তর্ভুক্ত অংশ কোনগুলো?
ফিকহবিদদের মতে নিম্নোক্ত অংশগুলো দাড়ির অন্তর্ভুক্ত—
- দুই চোয়ালের হাড়ের ওপর গজানো পশম
- কান ও চোখের মধ্যবর্তী স্থানের পশম
- থুতনির নিচের অংশের পশম
- মুখমণ্ডলের স্বাভাবিক দাড়ির অংশসমূহ
এসব অংশকে দাড়ির অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
দাড়ির পরিচর্যা: সুন্নাহর অংশ
দাড়ি রাখা যেমন সুন্নত, তেমনি এর পরিচ্ছন্নতাও সুন্নত। দাড়ির পরিচর্যার কয়েকটি সুন্নত:
- নিয়মিত দাড়ি আঁচড়ানো
- তেল ব্যবহার করা
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা
- অজুর সময় দাড়িতে খিলাল করা
- অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো না রাখা
হজরত ওসমান (রা.) থেকে বর্ণিত— রাসুলুল্লাহ (সা.) অজু করার সময় দাড়ির মধ্যে আঙুল প্রবেশ করিয়ে খিলাল করতেন। (আবু দাউদ ১৪৫, তিরমিজি ৩১)
দাড়ি ও ফিতরাত
দাড়ি রাখা মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি (ফিতরাত)-এর অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—عَشْرٌ مِنَ الْفِطْرَةِ এর মধ্যে তিনি গোঁফ ছোট করা ও দাড়ি রাখা উল্লেখ করেছেন। (মুসলিম ২৬১) ফিতরাতের সুন্নতসমূহ মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যক্তিত্ব রক্ষা করে।
দাড়ি: ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রতীক
দাড়ি রাখা কেবল বাহ্যিক কোনো বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং আনুগত্যের বাস্তব প্রকাশ। যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে সুন্নতকে জীবনে ধারণ করে, সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহব্বতের দাবিদার হওয়ার চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ কর; তবে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৩১)
দাড়ি নিয়ে কয়েকটি প্রচলিত ভুল ধারণা
- দাড়ি শুধু আলেমদের জন্য: ভুল। দাড়ি রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষের জন্য প্রযোজ্য সুন্নাহ ও শরয়ি বিধান।
- দাড়ি রাখলে ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়: বাস্তবে দাড়ি ব্যক্তিত্ব, পরিপক্বতা ও মুসলিম পরিচয়ের প্রতীক।
- দাড়ি রাখলেই মানুষ পরিপূর্ণ ধার্মিক: দাড়ি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ, তবে তাকওয়া, চরিত্র ও আমলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দাড়ি রাখা নবী-রাসুলদের চিরন্তন সুন্নত এবং ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দাড়ি বৃদ্ধি করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম সেই নির্দেশ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করেছেন। অতএব, একজন মুমিন পুরুষের উচিত দাড়িকে কেবল একটি বাহ্যিক রূপ হিসেবে না দেখে আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা। দাড়ি রাখা, পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী এর যত্ন নেওয়া একজন মুসলমানের পরিচয়ের অংশ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে ভালোবাসার সঙ্গে অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন।



