কুরবানির গোশত দিয়ে বিয়ের আপ্যায়ন: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান ইবাদত কুরবানি। এটি কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়; বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এক অনন্য আত্মত্যাগের প্রতীক। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর আনুগত্য, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির স্মৃতিকে ধারণ করেই মুসলমানরা প্রতি বছর কুরবানি আদায় করেন। তবে সমাজে একটি প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়— কুরবানির গোশত দিয়ে কি বিয়ের মেহমানদারি করা যাবে? আবার অনেকে কুরবানির পশু কেনার সময় বলেন— ‘বড় গরু কিনতে হবে, সামনে অনুষ্ঠান আছে।’ এ অবস্থায় জানা জরুরি— ইসলাম কি এ ধরনের আয়োজনকে বৈধ বলেছে? কুরবানির গোশত দিয়ে বিয়ে বা অন্য অনুষ্ঠানে দাওয়াত খাওয়ানো জায়েজ কি না? আর অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে কুরবানি করলে তার বিধান কী?
কুরবানির গোশত দিয়ে বিয়ের দাওয়াত করা কি জায়েজ?
কুরবানি শুধু মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য আদায় করতে হয়। তবে কুরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর সেই গোশত দিয়ে বিয়েসহ মুসলমানদের যেকোনো বৈধ অনুষ্ঠানে মেহমান আপ্যায়ন করা সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে কুরবানির কোনো ক্ষতি হয় না। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত রয়েছে— অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্দেশ্যে কুরবানি করা যাবে না। অর্থাৎ, যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে বিয়ে, ভোজ বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের নিয়তে কুরবানি করে, তাহলে সেই কুরবানি শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হবে না।
কুরআনের ভাষায় কুরবানির আসল উদ্দেশ্য
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন— لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩৭) আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ তাআলা বলেন— كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ ‘এভাবেই তিনি এসব পশুকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের হেদায়াত দিয়েছেন। আর সৎকর্মপরায়ণদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩৭) এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, কুরবানির মূল বিষয় হলো— আন্তরিকতা, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।
কুরবানির গোশত খাওয়া ও অন্যকে খাওয়ানোর বিধান
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করা পশুর গোশত নিজে খাওয়া যেমন বৈধ, তেমনি আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব কিংবা মেহমানদের দাওয়াত করেও খাওয়ানো যাবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ ‘তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রদেরও খাওয়াও।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ২৮) এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, কুরবানির গোশত শুধু নিজের জন্য নয়; বরং অন্যকে খাওয়ানো ও সমাজে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়াও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অনুষ্ঠান উপলক্ষে কুরবানি করলে কি তা সহিহ হবে?
যদি কেউ বিয়ে, ওয়ালিমা, সামাজিক অনুষ্ঠান বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কুরবানি করে, তাহলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে সহিহ হবে না। কারণ কুরবানি একটি ইবাদত, আর সব ইবাদতের ভিত্তি হলো নিয়ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ ‘নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়্যাত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোন নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশে- তবে তার হিজরত সে উদ্দেশেই হবে, যে জন্যে, সে হিজরত করেছে।’ (বুখারি ১) অতএব, কুরবানির নিয়ত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কুরবানি আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাণপ্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইলকে (আ.) কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। সেই আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের স্মৃতিই আজকের কুরবানি। পবিত্র কুরআনে এসেছে— قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু— সবই আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। তার কোনো শরিক নেই।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১৬২-১৬৩) এই আয়াত একজন মুমিনকে শেখায়— ইবাদতের প্রতিটি কাজ হতে হবে নিখাদভাবে আল্লাহর জন্য।
মনে রাখবেন, কুরবানির গোশত দিয়ে বিয়ে, ওয়ালিমা কিংবা যে কোনো বৈধ অনুষ্ঠানে মেহমানদারি করা জায়েজ। কিন্তু অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কুরবানি করা বৈধ নয়। কুরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন এর মাধ্যমে গরিব-অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটে, আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হয় এবং মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পায়।
কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার শিক্ষা। তাই কুরবানির প্রতিটি কাজে নিয়তের বিশুদ্ধতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেন কুরবানিকে সামাজিক প্রতিযোগিতা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে একমাত্র তার সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি আদায় করার তৌফিক দান করুন, গরিব-অসহায়দের হক আদায় করার তৌফিক দিন এবং কুরবানির মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।



