ছায়ানটের নেতৃত্বে সংগীত শিক্ষা প্রসারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সম্মিলিত উদ্যোগ
দেশের সংগীতচর্চাকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ছায়ানটসহ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি বিভাগের শিক্ষক ও সংগীতজ্ঞরা একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছেন। আজ সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত সংস্কৃতি-ভবনের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনকেন্দ্রে ‘সম্মিলিত অভিযাত্রা’ শিরোনামে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় অংশগ্রহণকারীরা সংগীত শিক্ষার পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
মতবিনিময় সভার বিস্তারিত ও ঘোষণা
সভাটি শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি’ এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ গানের মধ্য দিয়ে, যা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। সভাপতিত্ব করেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী, যিনি তাঁর বক্তব্যে সংগীত শিক্ষার গুরুত্ব ও বর্তমান প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংগীত শিক্ষার যাত্রাপথে বিঘ্ন সৃষ্টির নানা রকম চেষ্টা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে সংগীত একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এ জন্য সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন।’
সভায় উপস্থিত ছিলেন ছায়ানটের দুই সহসভাপতি খায়রুল আনাম শাকিল ও পার্থ তানভীর নভেদ, সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিয়াংকা গোপসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। প্রিয়াংকা গোপ একটি লিখিত বক্তব্যে শিশু স্তর থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক সংগীত শিক্ষা চালুর আহ্বান জানান।
আসন্ন সংগীত সম্মেলন ও কর্মপরিকল্পনা
এই মতবিনিময় সভার মাধ্যমে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে:
- সংগীত সম্মেলনের আয়োজন: এ বছরই শীতকালে একটি দিনব্যাপী সংগীত সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা দেশের সংগীতচর্চাকে নতুন মাত্রা দেবে।
- প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান: সংগীত শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
- সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক গঠন: তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে জাতীয় সংগীতের শুদ্ধ সুর, দেশাত্মবোধক গান, এবং ঋতুভিত্তিক বাংলা গান সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
সারওয়ার আলী আরও উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ছায়ানট ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনাগুলো সংগীতচর্চার ওপর বড় আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সভায় বক্তারা এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংগীতের স্বাধীনতা ও শিল্পী সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি তুলেছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণকারী
আয়োজকেরা জানান, এটি একটি প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগ ছিল। আসন্ন সংগীত সম্মেলনের মাধ্যমে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে, যা ভবিষ্যতে দেশের সংগীতচর্চা প্রসারে বিস্তারিত কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজীজুর রহমান তুহিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ঝুমুর আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সভাপতি মিশকাতুল মমতাজ, এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোনিয়া শারমিন খানসহ অনেকে।
এই উদ্যোগটি দেশের সংগীত শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংগীতের মাধ্যমে সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।



