অনেকদিন ধরেই নতুন কোনো গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে আসছেন না আনুশেহ আনাদিল। তাঁর ভক্ত-শ্রোতাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন—কোথায় আছেন তিনি? কেন আগের মতো সংগীতে দেখা যাচ্ছে না? সেই প্রশ্নের একটি বড় উত্তর মিলেছে তাঁর সাম্প্রতিক এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে। দীর্ঘদিন পর অন্তর্জালে ফিরে আনুশেহ ‘অন্ধকারের ভেতর থেকে দেশের প্রতি একটি চিঠি’ শিরোনামে একটি লেখা শেয়ার করেছেন।
সেখানে আনুশেহ লিখেছেন, বাংলাদেশে এমন এক বিশাল জনগোষ্ঠী আছে, যাদের আমরা দেখি না। তারা টেলিভিশনের পর্দায় নেই। তারা রাজনৈতিক মঞ্চে নেই। তারা প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের ছবি প্রকাশ করে না। তবু তারা আছে। তারা কবিতা লেখে। তারা গান বাঁধে। তারা রাত জেগে ছবি আঁকে। তারা পুরোনো নদীর নাম মনে রাখে। তারা হারিয়ে যাওয়া লোকগাথা কুড়িয়ে বেড়ায়। তারা একটি দেশের আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বাস করে আলোয় নয়—অন্ধকারে। এই অন্ধকার কোনো অপরাধের অন্ধকার নয়। এটি অবহেলার অন্ধকার। অশ্রুত থাকার অন্ধকার। নিজের দেশকে ভালোবেসেও সেই ভালোবাসার প্রতিধ্বনি না পাওয়ার অন্ধকার।
অবহেলার অন্ধকারে থাকা শিল্পীদের কথা যেমন লিখলেন তেমনি, তার প্রতিষ্ঠিত লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘যাত্রা’র ফেসবুক পেজ থেকেও জানান দিয়েছেন তার বর্তমান কর্মকাণ্ডের কথা। পোস্টে আনুশেহ নিজেকে আর ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে নয়, ‘যাত্রার মা’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। একইসঙ্গে তুলে ধরেছেন যাত্রার ২৬ বছরের পথচলা, নিজের বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যৎ ভাবনা।
তিনি লিখেছেন, একসময় যাত্রার তিনটি আউটলেট থাকলেও এখন তা একটিতে সীমিত করা হয়েছে। উৎপাদন ও সম্প্রসারণের প্রচলিত ব্যবসায়িক ধারণা থেকে সরে এসে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন পুনর্ব্যবহার, মেরামত, স্থানীয় কারুশিল্প এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহযোগিতাকে। তাঁর ভাষায়, অতিরিক্ত উৎপাদন মানে শুধু বেশি পণ্য তৈরি নয়, পৃথিবীর সম্পদেরও অতিরিক্ত ব্যবহার।
পোস্টে উঠে এসেছে ‘যাত্রা মেলা’ ও ‘সরল বাড়ি’ নিয়ে তাঁর ভাবনাও। জৈব কৃষি, দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, স্থানীয় উৎপাদন এবং কৃষক-কারিগর-শিল্পীদের সমন্বয়ে একটি স্বনির্ভর কমিউনিটি গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা বলেছেন তিনি। তাঁর মতে, যাত্রার পরবর্তী অধ্যায় আরও বিস্তৃত হবে নাকি আরও গভীর—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো তাঁর নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়।
তবে এই ভাবনাগুলোকে তাঁর সাংস্কৃতিক পরিচয় থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একসময় যে শিল্পী লোকসংগীত, বাউল দর্শন ও শিকড়ের সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, আজও সেই সাংস্কৃতিক চর্চাই তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে। পোস্টে তিনি লিখেছেন, “যাত্রা বিরতি শুধু একটি নিরামিষ রেস্তোরাঁ নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিসর। এখানে সংগীত হয়েছে, প্রদর্শনী হয়েছে, মেলা হয়েছে, যোগব্যায়াম হয়েছে, সাউন্ড হিলিং হয়েছে, শিল্পী-সাহিত্যিক-সংগীতশিল্পীদের মিলন হয়েছে।”
একই পোস্টে তিনি যাত্রা বিরতির নীতিগত অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, “আমরা সেখানে প্লাস্টিক ব্যবহার করি না। পানির বোতল বিক্রি করি না। পানি বিনামূল্যে দিই। কোকাকোলা বা সেই ধরনের সফট ড্রিংকসও বিক্রি করি না। অনেক বছর ধরে আমি নিজেও কোকাকোলা পান করি না।” এরপরই তিনি যোগ করেন, “এই কারণেই হয়তো কোক স্টুডিওর মতো উদ্যোগের সঙ্গে নিজেকে কখনো স্বচ্ছন্দভাবে যুক্ত করতে পারিনি।”
আনুশেহর কাছে সংস্কৃতি শুধু গান বা শিল্পচর্চার বিষয় নয়; বরং জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। যাত্রা, যাত্রা বিরতি এবং সরল বাড়ি—এই তিনটি উদ্যোগকে তিনি সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক দর্শনেরই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে, সংগীতশিল্পী কিংবা উদ্যোক্তা উভয় পরিচয়ের বাইরে প্রযোজক হিসেবেও আত্মপ্রকাশের কথা রয়েছে আনুশেহর। গত বছর সরকারি অনুদানে ‘কফিনের ডানা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রটির অগ্রগতি জানতে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, নব্বই দশকের জনপ্রিয় ফোক-ফিউশন ব্যান্ড ‘বাংলা’র প্রধান কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান আনুশেহ আনাদিল। লোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবেও তিনি যাত্রা, যাত্রা বিরতি এবং সরল বাড়ির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সংস্কৃতি, পরিবেশ ও জীবনচর্চাকে এক সূত্রে বাঁধার চেষ্টা করে চলেছেন। আর তাঁর সাম্প্রতিক পোস্টে যেন সেই দীর্ঘ যাত্রারই নতুন পরিচয় উঠে এসেছে—প্রতিষ্ঠাতা নয়, ‘যাত্রার মা’ হিসেবে।



