আজ ১৪ মে, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭—১৪ মে ২০২০) ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। তার সহধর্মিণী সিদ্দিকা জামান লিখেছেন তাদের দীর্ঘ ৫৯ বছরের বিবাহিত জীবনের স্মৃতিকথা।
প্রথম পরিচয় ও ভাষা আন্দোলনের গল্প
আনিসুজ্জামানের সঙ্গে সিদ্দিকা জামানের প্রথম পরিচয় ১৯৫৯ সালে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। পরিচয়ের সাত বছর আগে, ১৯৫২ সালে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার গল্প শুনে সিদ্দিকা জামান চমৎকৃত হয়েছিলেন।
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা
১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে বাধা সৃষ্টি করলে তরুণ শিক্ষক আনিসুজ্জামান প্রবীণ শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতিবাদে মুখর হন। বিয়ের পর সিদ্দিকা জামান দেখেছেন তার ভাষা ও সংস্কৃতির আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সচেতনতা। ১৯৬০-এর দশকে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
স্বাধীনতা ও সংবিধান রচনায় ভূমিকা
স্বাধীনতার সময় আনিসুজ্জামান প্রবাসী সরকারের সঙ্গে, বিশেষ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি সংবিধান রচনার কাজে যুক্ত হন। তিনি দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক আন্দোলনে এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন।
শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে সাফল্য
শিক্ষক ও গবেষক হিসেবেও আনিসুজ্জামান সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৬২ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সবচেয়ে কম বয়সে পিএইচডি অর্জনের কীর্তি।
মানুষের প্রতি ভালোবাসা
সিদ্দিকা জামানের মতে, আনিসুজ্জামানের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা। ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রবাদতুল্য। ১৯৮০-এর দশকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-কর্মচারীরা বাসার সামনে অবস্থান ধর্মঘট করে। এমনকি একজন ছাত্র সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিল।
পারিবারিক জীবন ও চরিত্র
স্ত্রী হিসেবে আনিসুজ্জামানের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অভিযোগ নেই সিদ্দিকা জামানের। দুজনের চাওয়া-পাওয়া এত কম ছিল যে সংসারজীবনে খুব বেশি মনোমালিন্য হয়নি। জীবন তাদের যেখানে যা দিয়েছে, তা নিয়েই শান্তিতে সন্তুষ্ট পারিবারিক জীবন কাটিয়েছেন। আনিসুজ্জামান নিজেকে বা পরিবারকে নিয়ে খুব কম ভাবতেন। মৃত্যুর পর নিজের স্মৃতি সংরক্ষণে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন। অন্যেরা যে সেই কাজটি যত্নের সঙ্গে করে চলেছে, তা দেখে সিদ্দিকা জামানের মন ভরে যায়।



