মৌসুমী মৌ অভিনীত ‘চক্র-২’ ওয়েব সিরিজটি বর্তমানে দর্শকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এটি একাধিক হরর ধারার সমন্বয়ে তৈরি, যেমন সাইকোলজিক্যাল হরর, সুপারন্যাচারাল হরর, প্যারানরমাল হরর, গোথিক হরর, স্লেশার, বডি হরর, কসমিক হরর, ফল্ক হরর ও আরবান লিজেন্ড। পরিচালক ভিকি জাহেদ এই ধারাগুলোকে একত্র করে একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনি উপস্থাপন করেছেন।
কাল্ট সোসাইটির প্রভাব
সিরিজটি বোঝার আগে দুটি কাল্ট সোসাইটির ধারণা জানা জরুরি। প্রথমটি ‘চিলড্রেন অব গড’, যা ১৯৬০-এর দশকের শেষে ডেভিড বার্গ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের ‘ফ্লার্টি ফিশিং’ নামক কৌশল নারী সদস্যদের মাধ্যমে পুরুষদের আকর্ষণ করত। দ্বিতীয়টি ‘হেভেন’স গেট’, যা ১৯৭৪ সালে মার্শাল অ্যাপলহোয়াইট ও বনি নেটলস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৭ সালে ‘হেল-বপ’ ধূমকেতুর সময় ৩৯ সদস্য সম্মিলিত আত্মহত্যা করে, যা ইতিহাসের বৃহত্তম গণ-আত্মহত্যার ঘটনা।
সত্য ঘটনার ভিত্তি
‘চক্র-২’-এর মূল কাহিনি বাংলাদেশের একটি সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে। ২০০৭ সালের ১১ জুলাই ময়মনসিংহের কাশরে নয়জন সদস্য রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঘটনাস্থলে সাতজন নিহত হন, বাকি দুজন আহত অবস্থায় মারা যান। তদন্তে তাদের বাড়ি থেকে ডায়েরি ও প্রতীকী লেখা উদ্ধার হয়, যা ‘আদম ধর্ম’ নামক একটি ধর্মীয় মতবাদ নির্দেশ করে। মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে ‘Shared Psychotic Disorder’ বা দলগত মানসিক বিভ্রম বলে অভিহিত করেন।
‘চক্র-১’ ও ‘চক্র-২’-এর কাহিনি
প্রথম সিজনে পুরান ঢাকার মজিদ পরিবারের গল্প দেখানো হয়। মজিদ, তার স্ত্রী, মেয়ে লুবনা, ছেলে হেলাল ও রাফি, এবং লুবনার শিক্ষক হুমায়ুন ও তার স্ত্রী রুমকির কাহিনি এখানে বর্ণিত। হুমায়ূন আহমেদের ‘যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ’ বইয়ের স্মৃতি জাগায় এই পারিবারিক দ্বন্দ্ব। পরিচালক ‘দ্য ফাইনাল ট্রুথ’ নামক একটি কাল্ট সোসাইটির পরিচয় দেন এবং কাজী ম্যাকের ‘আদম ধর্ম’ বইকে কাহিনিতে যুক্ত করেন। ‘দ্য বুরারি ডেথ’-এর রেফারেন্সও রয়েছে।
দ্বিতীয় সিজনে আহসান হাবীব ও পারভীন দম্পতি, তাদের ছেলে সিরাজ ও মেয়ে এনি ও জেনির গল্প দেখানো হয়। সিরাজের স্ত্রী মিতুর লোভ পরিবারকে মৃত্যুফাঁদে নিয়ে যায়। ভেন্ট্রিলোকুইজম চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। আদম ধর্মের উৎপত্তি, শয়তানের বংশবৃদ্ধি ও হুমায়ুনের আসল পরিচয় প্রকাশ পায়। প্রতিটি পর্ব দর্শককে শেষ না দেখা পর্যন্ত ছাড়তে দেয় না।
দৃশ্য ও প্রতীক
একটি দৃশ্যে জেনি তার বয়ফ্রেন্ড রাহাতের বাড়িতে যায়, যা দর্শককে অবাক করে। খাবারের দৃশ্যগুলো লোমহর্ষক এবং ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর রেফারেন্স বহন করে। মাঝি, দরজা ইত্যাদি প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। সংলাপ, আলোকসজ্জা, পরিবেশ ও সাউন্ড ডিজাইন অসাধারণ। যদি আইস্ক্রিনের পরিবর্তে নেটফ্লিক্স লেখা থাকত, তাও মানানসই হতো।
এই রিভিউতে কাহিনির মাত্র পাঁচ শতাংশ বলা হয়েছে। সম্পূর্ণ সিরিজটি আইস্ক্রিনে উপলব্ধ। এটি আমার দেখা সেরা হরর থ্রিলার ওয়েব সিরিজ। ভিকি জাহেদের কাজ ব্যক্তিগতভাবে প্রশংসনীয়। এখন ‘কালো বরফ’, ‘চক্র-৩’ ও ‘পুলসিরাত’-এর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।



