কিরণ খেরের জন্মদিন: সংগ্রাম, প্রেম ও ক্যানসার জয়ের গল্প
কিরণ খেরের জন্মদিন: সংগ্রাম, প্রেম ও ক্যানসার জয়

আজ জন্মদিন কিরণ খেরের। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের পরিচিত এই মুখকে অনেকে চেনেন তাঁর প্রাণবন্ত হাসি, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব আর মায়ের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য। কিন্তু পর্দার আড়ালের কিরণ খেরের গল্প আরও অনেক বেশি নাটকীয়। সেখানে আছে সংগ্রাম, ব্যর্থতা, নতুন করে শুরু করার সাহস, ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং কলেজজীবনের এক জুনিয়রের সঙ্গে অসমাপ্ত প্রেমের গল্প, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছিল বিয়ের মঞ্চে। জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক কিরণ খেরের দীর্ঘ পথচলা।

প্রেমের গল্প সিনেমার চেয়েও কম নয়

প্রেমের গল্পগুলো সাধারণত সিনেমায় দেখা যায়। কিন্তু কিরণ ও অনুপমের গল্পটিও কোনো চলচ্চিত্রের চেয়ে কম নয়। চণ্ডীগড়ে পড়াশোনার সময় দুজন একে অপরকে চিনতেন। কিন্তু তখন প্রেম হয়নি। জীবন তাঁদের আলাদা পথে নিয়ে যায়। পরে বহু বছর পর আবার দেখা। সেই দেখা থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়। দুজনই তখন জীবনের কঠিন সময় পার করছিলেন। হয়তো সেই কারণেই একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। অবশেষে তাঁরা নিজেদের আগের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮৫ সালে বিয়ে করেন কিরণ ও অনুপম।

চণ্ডীগড়ের মেয়ে থেকে তারকা

১৯৫২ সালের ১৪ জুন ভারতের পাঞ্জাবে জন্ম কিরণ খেরের। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চণ্ডীগড়ে। পড়াশোনা করেছেন চণ্ডীগড়ের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। চণ্ডীগড়ের সেই সময়টাতেই তাঁর পরিচয় হয় এক তরুণের সঙ্গে, যিনি পরে ভারতীয় অভিনয়জগতের অন্যতম বড় নাম হয়ে উঠবেন—অনুপম খের। তবে তখন দুজনের সম্পর্ক ছিল কেবল বন্ধুত্বের। কিরণ ছিলেন সিনিয়র, আর অনুপম ছিলেন তাঁর জুনিয়র। পরে জীবনের মোড় ঘুরে যায় দুজনেরই। তাঁদের পথ আলাদা হয়ে যায়, কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম সংসার, তারপর নতুন সন্ধান

কিরণ খেরের ব্যক্তিগত জীবন কখনোই খুব সহজ ছিল না। তরুণ বয়সে তিনি ব্যবসায়ী গৌতম বেরির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই সংসারে জন্ম হয় ছেলে সিকান্দার খেরের, যিনি পরে অভিনেতা হিসেবেও পরিচিতি পান। কিন্তু বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে থাকে। একসময় সম্পর্ক ভাঙনের দিকে এগোয়। ঠিক সেই সময়েই আবার জীবনে ফিরে আসেন অনুপম খের। মজার বিষয় হলো, অনুপমও তখন নিজের বৈবাহিক জীবনে সুখী ছিলেন না। দীর্ঘদিন পর এক নাট্যদলের সফরে দুজনের দেখা হয়। পুরোনো বন্ধুত্ব আবার নতুন রূপ নিতে শুরু করে। পরে এক সাক্ষাৎকারে অনুপম খের বলেছিলেন, কিরণকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, এ মানুষটির সঙ্গে কথা বললেই যেন মন হালকা হয়ে যায়। অন্যদিকে কিরণও বুঝতে পারেন, দীর্ঘদিন ধরে যাঁকে বন্ধু বলে জানতেন, তাঁর প্রতিই গভীর অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

কলেজের জুনিয়রের সঙ্গে প্রেম

প্রেমের গল্পগুলো সাধারণত সিনেমায় দেখা যায়। কিন্তু কিরণ ও অনুপমের গল্পটিও কোনো চলচ্চিত্রের চেয়ে কম নয়। চণ্ডীগড়ে পড়াশোনার সময় দুজন একে অপরকে চিনতেন। কিন্তু তখন প্রেম হয়নি। জীবন তাঁদের আলাদা পথে নিয়ে যায়। পরে বহু বছর পর আবার দেখা। সেই দেখা থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়। দুজনই তখন জীবনের কঠিন সময় পার করছিলেন। হয়তো সেই কারণেই একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। অবশেষে তাঁরা নিজেদের আগের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮৫ সালে বিয়ে করেন কিরণ ও অনুপম। ভারতীয় বিনোদন অঙ্গনের অন্যতম স্থায়ী ও সফল দম্পতি হিসেবে আজও তাঁদের নাম উচ্চারিত হয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের সম্পর্ক টিকে আছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার ভিত্তিতে।

অভিনয়ে ধীরে ধীরে উত্থান

কিরণ খেরের অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল থিয়েটার দিয়ে। মঞ্চে কাজ করতে করতেই অভিনয়ের ভিত শক্ত হয়। কিন্তু বলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক শিল্পী যেখানে তরুণ বয়সেই সাফল্য পান, সেখানে কিরণের বড় সাফল্য আসে তুলনামূলক পরিণত বয়সে। তাঁর অভিনীত পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র ‘সারদারি বেগম’ তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পেতে শুরু করেন।

‘দেবদাস’ বদলে দিল সবকিছু

২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালি পরিচালিত ‘দেবদাস’ ছবিতে পার্বতীর মা সুমিত্রার চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান কিরণ খের। ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন ও মাধুরী দীক্ষিতের মতো তারকারা। তারকাখচিত সেই ছবিতেও কিরণ নিজের অভিনয়গুণে আলাদা করে নজর কাড়েন। অনেক সমালোচকের মতে, ‘দেবদাস’-এর পর থেকেই তিনি বলিউডে শক্তিশালী চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

মায়ের চরিত্রে এক অনন্য উপস্থিতি

ভারতীয় সিনেমায় ‘মা’ চরিত্রটি অনেক সময় একঘেয়ে হয়ে যায়। কিন্তু কিরণ খের সেই ধারণা বদলে দিয়েছেন। তিনি কখনো আবেগপ্রবণ মা, কখনো কঠোর অভিভাবক, কখনো আবার হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘দোস্তানা’, ‘ম্যায় হু না’, ‘বীর-জারা’, ‘খুবসুরত’সহ বহু ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে ‘দোস্তানা’ ছবিতে তাঁর কমেডি টাইমিং দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। বয়স বাড়লেও অভিনয়ের প্রাণশক্তি যে কমেনি, সেটির প্রমাণ তিনি বারবার দিয়েছেন।

টেলিভিশনের জনপ্রিয় বিচারক

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশনেও কিরণ খের দারুণ জনপ্রিয়। বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাঁর রসবোধ, স্পষ্টভাষিতা এবং প্রতিযোগীদের উৎসাহ দেওয়ার ভঙ্গি দর্শকদের কাছে তাঁকে আরও কাছের মানুষ করে তুলেছে। অনেক তরুণ শিল্পীর কাছে তিনি একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্ব।

রাজনীতিতেও সফল

অভিনয়ের বাইরে কিরণ খের রাজনীতিতেও সক্রিয়। তিনি বিজেপির সংসদ সদস্য হিসেবে ভারতের লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। চণ্ডীগড় থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ সময়। অভিনেত্রী থেকে রাজনীতিক—দুই ক্ষেত্রেই নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠিন লড়াই

কিরণ খেরের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় সম্ভবত শুরু হয় ২০২১ সালে। তাঁর শরীরে ধরা পড়ে মাল্টিপল মায়েলোমা নামের একধরনের রক্তের ক্যানসার। খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর ভক্তরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ক্যানসারের চিকিৎসা সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু কিরণ হার মানেননি। এই কঠিন সময়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়ান অনুপম খের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত স্ত্রীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত খবর জানাতেন তিনি। ভক্তদের কাছে প্রার্থনাও চেয়েছিলেন। পরে কিরণ নিজেই জানান, রোগের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তিনি জীবনের মূল্য নতুন করে উপলব্ধি করেছেন।

মৃত্যুভয়কে জয় করার গল্প

ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিন্তু কিরণ খের চেষ্টা করেছেন ইতিবাচক থাকতে। তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলেছেন, নিয়মিত চিকিৎসা নিয়েছেন এবং কাজের প্রতি আগ্রহ ধরে রেখেছেন। ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। চিকিৎসায় ভালো সাড়া দেন তিনি। এরপর আবার জনসমক্ষে দেখা যেতে শুরু করে তাঁকে। ভক্তদের কাছে এটি ছিল অনুপ্রেরণার গল্প—একজন নারী কীভাবে ভয়ংকর রোগের মুখোমুখি হয়েও মাথা নত করেননি।

আবারও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ

ক্যানসার থেকে সুস্থতার পথে ফিরলেও পরবর্তী বছরগুলোয় তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে মাঝেমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় তাঁকে আগের তুলনায় দুর্বল দেখিয়েছে। ফলে ভক্তদের মধ্যে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে কিরণ বরাবরই বলেছেন, জীবনকে থামিয়ে রাখার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। যত দিন সম্ভব কাজ করে যেতে চান। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অনুপম-কিরণ: বলিউডের স্থায়ী প্রেমকাহিনি

বলিউডে সম্পর্ক ভাঙা-গড়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু অনুপম ও কিরণের সম্পর্ক ব্যতিক্রম। তাঁদের সম্পর্কের ভিত্তি কেবল প্রেম নয়, বন্ধুত্বও। অনুপম বহুবার বলেছেন, কিরণ তাঁর সবচেয়ে বড় সমালোচক এবং সবচেয়ে বড় সমর্থক। অন্যদিকে কিরণও স্বীকার করেছেন, জীবনের কঠিন সময়ে অনুপমের সমর্থন ছাড়া পথচলা অনেক কঠিন হয়ে যেত। ক্যানসারের চিকিৎসাকালেও তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা নতুন করে সামনে আসে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বলিউড হাঙ্গামা ও টাইমস ইন্ডিয়া অবলম্বনে