সালমান শাহর দেহাবশেষ উত্তোলনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ
সালমান শাহর দেহাবশেষ উত্তোলনে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ

চিত্রনায়ক সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ২২ জুন সিলেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করেন। এই অফিস আদেশের একটি অনুলিপি রবিবার (৫ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ডাকযোগে পাঠানো হয় এবং তা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের আদেশ

অফিস আদেশে বলা হয়, গত ২৪ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আদেশ মোতাবেক চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ১৭৬(২) ধারা মোতাবেক কবর থেকে দেহাবশেষ উত্তোলনের সময় উপস্থিত থেকে ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল দায়িত্ব পালনের জন্য সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. পারভেজকে নিয়োগ করা হলো। রমনা থানার প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম এ তথ্য জানান।

আদালতের অনুমতি ও পরবর্তী ঘটনা

গত ২০ মে সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেহাবশেষ উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দেন। গত ২৩ জুন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে মামলার বাদি মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম দেহাবশেষ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। আদালত আবেদনটি নথিভুক্ত করার আদেশ দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মামলার পটভূমি

২০ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ইন্সপেক্টর জিয়াউল মোর্শেদ দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। ২৪ মে একই আদালত আবেদন মঞ্জুর করে দেহাবশেষ উত্তোলনের আদেশ দেয়। তবে বিষয়টি জানাজানি হয় ১০ জুন। একইসঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেহাবশেষ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরিবারের মামলা

আদালতের নির্দেশে সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ২০ অক্টোবর মামলা করা হয়। সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি দায়ের করেন। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান। তার পারিবারিক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে সে সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।

আইনি প্রক্রিয়ার ধারা

ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে– এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার আবেদন করেন তিনি। তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি বলে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।

তবে সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ অগাস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

পরিবারের অব্যাহত প্রচেষ্টা

সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর তার মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে নারাজি দেন। তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, এরা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। মামলাটি এরপর তদন্ত করে র‌্যাব। তখন রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।

এরপর তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানেও বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে, জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনও প্রমাণ মেলেনি।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদন ও পরবর্তী পদক্ষেপ

পিবিআই তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ আর স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নিলুফা চৌধুরী ওরফে নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেই অভিমানী সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি সালমানের মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে তিনি আরও তদন্ত চান আদালতের কাছে।

কিন্তু ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ। এরপর আবার সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে আর রিভিশন শুনানি হয়নি।

সাম্প্রতিক আদালতের নির্দেশ

ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক গত বছর ২০ অক্টোবর সেই রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। এ বিষয়ে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে রমনা মডেল থানা পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাত পলাতক আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ্কে হত্যা করেছে বলে মামলায় অভিযোগ করেন মোহাম্মদ আলমগীর।