নাট্যজন আতাউর রহমানের মৃত্যুর পর হাসপাতালের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর মরদেহ এখন রাখা হয়েছে রাজধানীর মগবাজারের বাসায়। সেখানে স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ভিড় করছেন।
জানাজার সময় ও স্থান
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাদ জোহর বাসার সামনের খোলা মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বেলা তিনটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত সেখানে রাখা হবে তাঁর মরদেহ।
শেষ গন্তব্য বনানী কবরস্থান
শহীদ মিনারে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শেষ গন্তব্য হবে বনানী কবরস্থান। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেখানেই মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে এই নাট্যজনকে। প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আতাউর রহমানের মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান। তিনি জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বাবাকে তাঁর মায়ের কবরেই সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুর আগের অবস্থা
১০ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর সোমবার দিবাগত রাতে মারা গেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান। আগামী জুনে তাঁর ৮৫ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। আতাউর রহমান স্ত্রী শাহিদা রহমান, এক মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান, এক ছেলে শ্বাশত রহমানসহ ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
হাসপাতালে ভর্তি
গতকাল সোমবার দুপুরে শর্মিষ্ঠা রহমান প্রথম আলোকে জানান, ১ মে (শুক্রবার) বাসায় পড়ে যাওয়ার পর আতাউর রহমানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এরপর তাঁকে প্রথমে গুলশানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সাপোর্ট প্রয়োজন। তবে ওই হাসপাতালে আইসিইউ-সুবিধা ওই মুহূর্তে না পাওয়ার কারণে পরে তাঁকে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
লাইফ সাপোর্টে থাকা
শর্মিষ্ঠা রহমান বলেন, ভর্তির পরই আতাউর রহমানকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। গত শনিবার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু আবার অবস্থার অবনতি হলে রোববার তাঁকে আবার লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সোমবার দিবাগত রাত পৌনে একটায় তাঁর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন আতাউর রহমানকে।
আতাউর রহমানের পরিচয়
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী আতাউর রহমান। তিনি একাধারে নাট্যজন, অভিনেতা, মঞ্চ নির্দেশক ও লেখক। ১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্ম নেওয়া এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব স্বাধীনতাযুদ্ধ-পরবর্তী মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর আতাউর রহমান নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তর ‘বুড়সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকটির মাধ্যমে নাট্য নির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি।
নাট্য নির্দেশনা ও রচনা
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এই প্রতিষ্ঠাতা ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্তকরবী’, ‘ক্রয়লাদ ও ক্রেসিদা’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘অপেক্ষমাণ’–এর মতো নাটকগুলোও নির্দেশনা দিয়েছেন। নাগরিকের বাইরে আতাউর রহমান ‘আগল ভাঙার পালা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘নারীগণ’, ‘রুদ্র রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’ নাটকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’, ‘নাটক করতে হলে’, ‘নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা’, ‘লেখনী’সহ নানা বই প্রকাশ করেছেন। অভিনয় করেছেন বেশ কিছু টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে।
সাংগঠনিক ভূমিকা ও পুরস্কার
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের সাবেক সদস্য আতাউর রহমান বাংলাদেশ নাটকের আপিল কমিটি ও চলচ্চিত্র জুরিবোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ শাখার, পরে বিশ্ব শাখার সভাপতিও ছিলেন এই নাট্যব্যক্তিত্ব। দেশের সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আতাউর রহমান পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার।



