তৃষা কৃষ্ণান: সংগ্রাম, বিতর্ক ও প্রত্যাবর্তনের গল্প
তৃষা কৃষ্ণান: সংগ্রাম, বিতর্ক ও প্রত্যাবর্তনের গল্প

শৈশবে তৃষা কৃষ্ণান। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

দুই দশকের পথচলা

দুই দশকের বেশি সময় ধরে তামিল ও তেলেগু সিনেমায় নিজের অবস্থান ধরে রাখা এই অভিনেত্রীর জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়; এতে আছে সংগ্রাম, বিতর্ক, প্রেমের গুঞ্জন, আবার ফিরে আসার এক অনন্য গল্প। এখন অভিনেতা বিজয়ের সঙ্গে নাম জড়িয়ে আলোচনায় থাকা এই অভিনেত্রী আর কেউ নন, তৃষা কৃষ্ণান। আজ ৪ মে অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।

ক্যারিয়ারের উত্থান

২০০০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়টায় তৃষা ছিলেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ। মহেশ বাবু, প্রভাস থেকে বিক্রম—দক্ষিণের প্রায় সব বড় তারকার সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। তৃষার অভিনয়ের শক্তি ছিল পর্দায় সহজ-সরল উপস্থিতি। অতিরিক্ত নাটকীয়তা নয়, বরং স্বাভাবিক অভিনয়ই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল। রোমান্টিক চরিত্রে যেমন সাবলীল, তেমনি আবেগঘন দৃশ্যেও তাঁর দক্ষতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শুরুটা ছিল সাধারণ

১৯৮৩ সালের ৪ মে, চেন্নাইয়ে জন্ম তৃষার। মা উমা কৃষ্ণন ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি মডেলিংয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল। কলেজজীবনে তিনি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং ১৯৯৯ সালে ‘মিস চেন্নাই’ খেতাব জেতেন—এ অর্জনই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মডেলিং থেকে বিজ্ঞাপন, আর সেখান থেকেই চলচ্চিত্রে সুযোগ—এই ছিল তাঁর যাত্রার প্রথম ধাপ। তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম দিকে ছোট ছোট চরিত্রে দেখা গেলেও খুব একটা নজর কাড়তে পারেননি। কিন্তু তৃষা ছিলেন ধৈর্যশীল—তিনি জানতেন, বড় সুযোগ একদিন আসবেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘মৌনম পেসিয়াধে’ দিয়ে আলোচনায়

২০০২ সালে তামিল ছবি ‘মৌনম পেসিয়াধে’ তৃষার ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। এরপর ২০০৩ সালে ‘সামি’ ও ‘ঘিলি’—এ দুই ছবির সাফল্য তাঁকে রাতারাতি তারকায় পরিণত করে। বিশেষ করে বিজয়ের সঙ্গে ‘ঘিলি’ তামিল সিনেমার অন্যতম বড় হিট হয়ে ওঠে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। তামিলের পাশাপাশি তেলেগু সিনেমাতেও তৃষা সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ‘বারশাম’, ‘নুভোসতানানতে’, ‘নেদোড্ডাতানা’ ছবিগুলো তাঁকে দক্ষিণ ভারতের শীর্ষ নায়িকাদের কাতারে তুলে দেয়।

জানা–অজানা তৃষা

ছোটবেলায় অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি তৃষা; বরং ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট হওয়ার ইচ্ছা ছিল। চেন্নাইয়ে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। কলেজে পড়ার সময় মডেলিং শুরু করেন। ১৯৯৯ সালে ‘মিস মাদ্রাজ’ (বর্তমান ‘মিস চেন্নাই’) জেতার পর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সেখান থেকেই চলচ্চিত্রে সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে তামিল ও তেলেগু সিনেমার শীর্ষ নায়িকাদের একজন হয়ে ওঠেন। এখন তিনি দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের একজন—প্রতিটি ছবির জন্য তিন–পাঁচ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নেন বলে জানা যায়।

একসময় তিনি ছিলেন ‘নাম্বার ওয়ান’ নায়িকা

২০০০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়টায় তৃষা ছিলেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ। মহেশ বাবু, প্রভাস থেকে বিক্রম—দক্ষিণের প্রায় সব বড় তারকার সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। তৃষার অভিনয়ের শক্তি ছিল পর্দায় সহজ-সরল উপস্থিতি। অতিরিক্ত নাটকীয়তা নয়, বরং স্বাভাবিক অভিনয়ই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল। রোমান্টিক চরিত্রে যেমন সাবলীল, তেমনি আবেগঘন দৃশ্যেও তাঁর দক্ষতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

তৃষা কৃষ্ণান। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

বলিউডে চেষ্টা, কিন্তু জমেনি

২০০৮ সালে তৃষা বলিউডে পা রাখেন ‘খাট্টা মিঠা’ ছবির মাধ্যমে, যেখানে তাঁর সহ-অভিনেতা ছিলেন অক্ষয় কুমার। কিন্তু ছবিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি। বলিউডে স্থায়ী হতে না পারলেও তৃষা কখনো হতাশ হননি। বরং তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁর আসল শক্তি দক্ষিণের ইন্ডাস্ট্রিতেই।

ক্যারিয়ারের পতন ও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

প্রায় এক দশক শীর্ষে থাকার পর ২০১০-এর পরবর্তী সময়ে তৃষার ক্যারিয়ারে ভাটা পড়ে। নতুন প্রজন্মের নায়িকারা উঠে আসছিলেন আর তাঁকে কম দেখা যাচ্ছিল বড় প্রজেক্টে। অনেকে ভেবেছিলেন, তৃষার সময় শেষ। কিন্তু এখানেই তিনি আলাদা—তিনি হার মানেননি।

শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন

২০১৮ সালে ‘৯৬’ ছবিতে তৃষার অভিনয় যেন নতুন করে সবাইকে চমকে দেয়। বিজয় সেতুপতির সঙ্গে তাঁর রসায়ন দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এই ছবির পর আবারও আলোচনায় চলে আসেন তৃষা। এরপর তৃষা বেছে নিতে শুরু করেন ভিন্নধর্মী চরিত্র—‘রাঙ্গি’ ও ‘পোন্নিইন সেলভান’ সিনেমার দুই কিস্তি। বিশেষ করে মনি রত্নমের ‘পোন্নিইন সেলভান’–এ কুন্দবাই চরিত্রে বুঝিয়ে দেন, এখনো ফুরিয়ে যাননি।

প্রেম, সম্পর্ক ও ভাঙনের গল্প

তৃষার ব্যক্তিগত জীবন সব সময়ই আলোচনায় ছিল। সবচেয়ে আলোচিত সম্পর্ক ছিল রানা দুগ্গবতির সঙ্গে। যদিও দুজনই কখনো প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি, তবে ইন্ডাস্ট্রিতে এই সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন গুঞ্জন ছিল। ২০১৫ সালে ব্যবসায়ী বরুণ মানিয়ানের সঙ্গে বাগদান সারেন তৃষা; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। এই বিচ্ছেদ তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করলেও তিনি দ্রুত নিজের কাজে ফিরে যান।

বিজয়ের সঙ্গে কেন নাম জড়াল

দক্ষিণি তারকা অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ থালাপতি বিজয়ের সঙ্গে ২৭ বছরের দাম্পত্যজীবনের ইতি টানছেন স্ত্রী সংগীতা স্বর্ণালিঙ্গম। বিচ্ছেদের আবেদনে সংগীতা দাবি করেছেন, এক অভিনেত্রীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছেন বিজয়। অভিযোগের তির দক্ষিণি অভিনেত্রী তৃষা কৃষ্ণানের দিকে। বিচ্ছেদের আলোচনার মধ্যে এক বিয়ের আয়োজনে একসঙ্গে দেখা যায় বিজয়-তৃষাকে, যা তাঁদের সম্পর্ককে ঘিরে নতুন গুঞ্জন উসকে দেয়।

বিজয় ও তৃষা প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করেন ২০০৪ সালের ব্লকবাস্টার ছবি ‘ঘিলি’তে। এরপর তাঁরা আরও কয়েকটি ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেন—যেমন ‘থিরুপাচি’, ‘আথি’ ও ‘কুরুভি’। এ সময় থেকেই তাঁদের বন্ধুত্ব নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে দুজনই বারবার জানিয়েছেন, তাঁদের সম্পর্ক কেবল সহকর্মী ও বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

পরবর্তী বছরগুলোতেও মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ঘটনার কারণে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা বাড়ে। ২০২২ সালে তৃষা নিউইয়র্ক ভ্রমণের কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করলে ভক্তরা সেখানে দুটি জুতার ছবি দেখে নানা ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, বিজয়ও নাকি সেই সফরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন। যদিও এসব দাবি কখনোই প্রমাণিত হয়নি।

তৃষা কৃষ্ণান। ইনস্টাগ্রাম থেকে

২০২৩ সালে পরিচালক লোকেশ কঙ্গরাজ পরিচালিত ‘লিও’ ছবিতে আবারও একসঙ্গে অভিনয় করেন বিজয় ও তৃষা। প্রায় ১৪ বছর পর তাঁদের এই পর্দায় ফেরা ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি করে। ছবির প্রচারে তৃষা বলেছিলেন, দীর্ঘদিনের পরিচয়ের কারণে বিজয়ের সঙ্গে কাজ করা তাঁর কাছে অনেকটা ‘বাড়িতে ফেরার মতো’ অনুভূতি দেয়।

তবে নানা জল্পনা হলেও দুই তারকার কেউই এসব গুঞ্জন নিয়ে কখনো কথা বলেননি। কিছুদিন আগে ‘ঠগ লাইফ’ সিনেমার প্রচারে বিয়ে নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে তৃষা বলেন, ‘আমি বিয়েতে বিশ্বাস করি না। এটা হলে ঠিক আছে, না হলেও সমস্যা নেই।’

ইন্ডিয়াডটকম অবলম্বনে