রবার্ট ওপেনহাইমার: পারমাণবিক বোমার জনকের দ্বন্দ্বময় জীবন ও ট্রিনিটি টেস্টের স্মৃতি
১৬ জুলাই, ১৯৪৫ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়োর্নাদা দেল মুয়ের্তো মরুভূমিতে একটি বাঙ্কারে অপেক্ষা করছিলেন এক বিজ্ঞানী। কাউন্টডাউনের প্রতিটি সেকেন্ড যেন অনন্তকাল মনে হচ্ছিল তাঁর কাছে। বাঙ্কার থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা, সাংকেতিক নাম ট্রিনিটি, হতে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীর নাম জুলিয়াস রবার্ট ওপেনহাইমার, যিনি ম্যানহাটন প্রকল্পের প্রধান পরিচালক হিসেবে তিন বছরের পরিশ্রমের পর এই মুহূর্তের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন।
ট্রিনিটি টেস্টের উত্তেজনা ও বিস্ফোরণ
ওপেনহাইমারের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি, কিন্তু কাজের চাপে তাঁর ওজন নেমে এসেছিল মাত্র ৫২ কেজিতে। বিস্ফোরণের আগের রাতে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলেন তিনি, দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে। এক সামরিক কর্মকর্তা স্মরণ করেন, ওপেনহাইমার তখন এত উত্তেজিত ছিলেন যে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। কাউন্টডাউন শেষ হতেই ঘটল বিশাল বিস্ফোরণ—২১ কিলোটন টিএনটি সমৃদ্ধ বোমাটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ, যার শকওয়েভ ১৬০ কিলোমিটার দূর থেকেও অনুভূত হয়েছিল। আকাশে মাশরুম আকৃতির মেঘ দেখে ওপেনহাইমার স্বস্তি পেয়েছিলেন, কিন্তু পরে তাঁর মনে জেগে উঠেছিল গভীর দ্বন্দ্ব।
গীতার শ্লোক ও মানসিক পরিবর্তন
বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট পরে ওপেনহাইমারের মনে পড়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ভগবত গীতার একটি শ্লোক: ‘এখন আমিই মৃত্যু, আমিই বিশ্ব ধ্বংসকারী।’ এই ঘটনা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ২০০৫ সালে ইতিহাসবিদ কা বার্ড ও মার্টিন জে শেরউইনের জীবনীগ্রন্থ আমেরিকান প্রমিথিউস-এ উল্লেখ করা হয়, এই দিনটি ছিল ওপেনহাইমারের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি। বইটি ভিত্তি করেই ২০২৩ সালে মুক্তি পায় ক্রিস্টোফার নোলানের চলচ্চিত্র ওপেনহাইমার।
জাপানের হিরোশিমায় বোমা বিস্ফোরণের পর ওপেনহাইমার বিজয়ী যোদ্ধাদের মতো হাত তুলেছিলেন, কিন্তু পরে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রকে ‘শয়তানের কাজ’ বলে বর্ণনা করেন। ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি টের পাই, আমার হাতে রক্ত লেগে আছে।’ এই অপরাধবোধ তাঁকে হাইড্রোজেন বোমা তৈরির বিরোধিতা করতে বাধ্য করে, যা মার্কিন সরকারের রোষের কারণ হয়।
শৈশব ও ব্যক্তিত্বের রহস্য
১৯০৪ সালে নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন ওপেনহাইমার। ধনী পরিবারে বেড়ে উঠলেও তিনি ছিলেন লাজুক ও দুর্বল। শৈশবে বন্ধুরা তাঁকে দুর্বল বলে উপহাস করত, কিন্তু নয় বছর বয়সেই গ্রিক ও লাতিন ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। খনিজ পদার্থ সংগ্রহে তাঁর আগ্রহ ছিল, খেলাধুলায় নয়। হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়ার সময় পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা তাঁকে সাইকোসিস রোগে আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করেন। সাহিত্য পাঠ করে, বিশেষ করে মার্সেল প্রুস্তের কাজ পড়ে, তিনি এই সমস্যা কাটিয়ে উঠেন।
কর্মজীবন ও রাজনৈতিক ঝামেলা
১৯২৬ সালে গটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনের পর ওপেনহাইমার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে বার্কলির ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৩০-এর দশকে ভগবত গীতা পড়ার জন্য সংস্কৃত শেখেন, যা পরে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে প্রেরণা দেয়। তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জিন ট্যাটলকের প্রেমে পড়েন, যিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন—এই সম্পর্ক পরে তাঁর জন্য সমস্যা তৈরি করে। ১৯৪০ সালে ক্যাথরিন কিটি হ্যারিসনকে বিয়ে করেন তিনি, যিনি ম্যানহাটন প্রকল্পে কাজ করতেন।
ম্যানহাটন প্রকল্পে যোগ দেওয়ার আগে ওপেনহাইমার কমিউনিস্টদের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন করেন, কারণ সরকারের অনুমোদন পেতে এটি প্রয়োজনীয় ছিল। ১৯৫৪ সালে মার্কিন সরকার তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে এবং সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স কেড়ে নেয়, যদিও বিশ্বাসঘাতকতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ১৯৬৩ সালে তাঁকে এনরিকো ফার্মি পুরস্কার দেওয়া হয়, এবং ২০২২ সালে, তাঁর মৃত্যুর ৫৫ বছর পর, সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স ফেরত দেওয়া হয়।
জীবনের শেষ পর্ব ও উত্তরাধিকার
ওপেনহাইমারের শেষ ২০ বছর কাটে প্রিন্সটন ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্স স্টাডির পরিচালক হিসেবে, যেখানে তিনি আইনস্টাইনের সঙ্গে কাজ করেন। তিনি বলতেন, ‘বিজ্ঞানের কাজ নতুন জিনিস শেখা, একই ভুল দুবার করা নয়।’ ধূমপানের কারণে যক্ষা ও গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬৭ সালে ৬৩ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
ওপেনহাইমারকে পারমাণবিক বোমার জনক হিসেবে ইতিহাসে স্মরণ করা হয়, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সাফল্য, অপরাধবোধ ও দ্বন্দ্বের মিশ্রণ। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে তাঁর অবদান অপরিসীম, যদিও এর মন্দ দিক নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।



