মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ভেসে উঠতো টুইশা শর্মার বর্ণিল জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত। অফিসের মিটিং, সিনেমার সেট কিংবা বিমানবন্দরের লাউঞ্জ; কোথাও মডেলিংয়ের অ্যাসাইনমেন্ট, কোথাও করপোরেট প্রেজেন্টেশন, আবার কোথাও সদ্য হওয়া নতুন বিয়ের রঙিন স্বপ্ন। আপাতদৃষ্টিতে এক সফল ও গোছানো জীবন। কিন্তু সেই ঝলমলে পর্দার আড়ালে যে এতটা অন্ধকার লুকিয়ে ছিল, তা হয়তো কেউ ভাবতেও পারেনি।
শৈশব ও ক্যারিয়ারের শুরু
নয়ডায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা টুইশা নিজের ক্যারিয়ারে বারবার বৈচিত্র্য এনেছেন। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে কিশোরী বয়সেই পা রাখেন মডেলিংয়ের জগতে। এক সময় জয় করেন ‘মিস পুনে’র খেতাব। এই স্বীকৃতি তার জন্য বিজ্ঞাপনচিত্র ও আঞ্চলিক সিনেমার দুয়ার খুলে দেয়। বন্ধুরা তাকে ‘চরম সামাজিক ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ হিসেবে স্মরণ করেন। তার লিঙ্কডইন প্রোফাইলও বলছিল তার বহুমুখী প্রতিভার কথা। একাধারে তিনি ছিলেন মার্কেটিং প্রফেশনাল, কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট, অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ডিজিটাল ক্রিয়েটর।
পারিবারিক স্মৃতিচারণ
টুইশার বাবা নবনিধি শর্মা বলেন, ‘সে ছিল অত্যন্ত গতিশীল এক নারী। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে করপোরেট প্রেজেন্টেশন দিয়েছে সে। কাজ করেছে নামী বিজ্ঞাপনে। আজ বলিউড অভিনেতা থেকে শুরু করে সারা দেশ থেকে মানুষ আমাদের শোকবার্তা পাঠাচ্ছেন।’
শিক্ষা ও পেশাগত জীবন
পুনের ইন্দিরা কলেজ থেকে বিবিএ শেষ করার পর সাবিত্রীবাঈ ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন টুইশা। এরপর ২০২৪ সালে এনএমআইএমএস থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। মৃত্যুর আগে তিনি ডিএডিবি জার্মানির দিল্লি অফিসে কমিউনিকেশন অ্যান্ড অনবোর্ডিং ম্যানেজার হিসেবে পুনরায় যোগ দিয়েছিলেন। এর আগে তিনি ফ্লেভার পট ফুডসসহ একাধিক বেসরকারি সংস্থায় বিপণন বিভাগে কাজ করেছেন। করপোরেট চাকরির পাশাপাশি অভিনয়ও চালিয়ে গেছেন তিনি। তেলুগু ছবি ‘মুগুরু মোনাগাল্লু’ এবং হিন্দি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘জারা সামহাল কে’-তে অভিনয় করেছেন তিনি। পাশাপাশি টুইশা ছিলেন একজন সার্টিফাইড যোগা ইনস্ট্রাক্টর এবং বিপাসনা ধ্যানচর্চাকারী।
সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া
‘মুগুরু মোনাগাল্লু’ ছবিতে সহ-অভিনেত্রী ও পডকাস্ট হোস্ট শ্বেতা বর্মা টুইশার মৃত্যুর পর লিখেছেন, ‘যদিও আমাদের যোগাযোগ সংক্ষিপ্ত ছিল, তবে আমাদের মধ্যে দারুণ কিছু খোলামেলা কথা ও হাসাহাসি হয়েছিল। ও এক অদ্ভুত ইতিবাচক শক্তি ছড়িয়ে রাখত চারপাশে।’
ব্র্যান্ড এন্ডরসমেন্ট ও আন্তর্জাতিক কাজ
এক আত্মীয়ের সূত্র ধরে জানা যায়, টুইশা ডাভ এবং লরিয়ালের মতো ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। কোভিড-১৯ মহামারির ঠিক আগে একটি সিনেমার শুটিংয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়াও গিয়েছিলেন। টুইশার কাজিন প্রিয়াঙ্কা শর্মা স্মৃতি চারণ করে বলেন, ‘সে সেট থেকে আমাদের ছবি-ভিডিও পাঠাত এবং সিনেমা মুক্তি পেলে সবাইকে তা প্রচার করতে বলত। লকডাউন শুরু হলে সে চাকরি বদলে একটি বহুজাতিক সংস্থায় মার্কেটিংয়ের কাজ নেয়। কাজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন কলেজে গিয়ে বক্তৃতাও দিত ও। ও ছিল এককথায় পারফেক্ট।’
বিচারের দাবি
আহমেদাবাদের বাসিন্দা প্রিয়াঙ্কা গত ১৪ মে খবর পেয়েই নয়ডায় ছুটে আসেন। সম্প্রতি তিনি এবং তার মা ড. মধু শর্মা গৌরব সিটিতে তাদের বাসভবনের বাইরে টুইশার জন্য বিচারের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান নেন। প্রিয়াঙ্কা আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, ‘টুকটুক সবসময় সবাইকে ভালোবাসত, যত্ন নিত। আমি যখন গর্ভবতী ছিলাম, ও নিজ থেকে আমার জন্য আইসক্রিম অর্ডার করত।’
পরিবারের পটভূমি
উত্তর প্রদেশের হাথরাসের আদি বাসিন্দা টুইশার পরিবার পরে পুনেতে চলে আসে। সেখানেই স্কুল ও গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন টুইশা। এরপর পরিবার নয়ডায় স্থানান্তরিত হলে তিনি মডেলিংয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেই এই পথে পা বাড়ান। প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘সে ছিল অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও সাহসী। গত মার্চে ছোট ভাইয়ের বিয়েতে তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়। তখন তার অনেক ওজন কমে গিয়েছিল। আমি তাকে নিজের যত্ন নিতে বলেছিলাম। গ্রীষ্মের ছুটিগুলো আমরা একসঙ্গে কাটাতাম। সে ভীষণ চঞ্চল ছিল, কিন্তু বিয়ের পর কেমন যেন বদলে গেলো... সে আর আগের মতো ছিল না।’
স্বামী সমর্থ সিংয়ের পরিচয়
টুইশার ঝলমলে করপোরেট ও মিডিয়া জগতের চেয়ে তার স্বামী সমর্থ সিংয়ের পেশাগত জগৎ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। লিঙ্কডইনে সমর্থ নিজেকে একজন স্বাধীন আইনজীবী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি ভোপাল, জবলপুর এবং ইন্দোরে সার্ভিস ডিসপিউট, ফৌজদারি মামলা এবং ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করেন। ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির এই স্নাতক বেলজিয়ামের গেন্ট ইউনিভার্সিটিতে ইরেসমাস মুন্ডুস এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশ সরকারের আইনি উপদেষ্টা হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। সমর্থের পরিবারকে যারা চেনেন, তারা জানেন যে তিনি শিক্ষাগত দিক থেকে অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু ভীষণ অন্তর্মুখী। তার মা গিরিবালা সিং একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ। আদালতে তার সুনাম এবং সামাজিক মর্যাদার কারণে টুইশার মৃত্যুর পর এই মামলাটি আইনি মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিয়ে ও দাম্পত্য কলহ
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে একটি ম্যাট্রিমোনিয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে টুইশার ‘করপোরেট ফেজ’ চলাকালীন দুজনের পরিচয় হয়। কথোপকথন থেকে দেখা-সাক্ষাৎ এবং পরে তা পারিবারিক সম্পর্কে রূপ নেয়। অবশেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে দুই পেশাদারের ধুমধাম করে বিয়ে হয়। একদিকে ছিলেন মিডিয়া ও ব্র্যান্ডিং জগতের উজ্জ্বল মুখ, অন্যদিকে অভিজাত আইনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। কিন্তু পুলিশ রেকর্ড ও পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, বন্ধ দরজার আড়ালে সেই দাম্পত্য জীবন দ্রুত বিষিয়ে উঠতে শুরু করে।
যৌতুক ও গর্ভপাতের অভিযোগ
এফআইআর-এ অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই যৌতুক নিয়ে বারবার কটূক্তি, টুইশার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ এবং সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর তার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। টুইশার বাবা-মায়ের দাবি, টুইশার গর্ভের সন্তানটি অন্য কারও, এমন মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয় এবং স্বামী ও শাশুড়ির তীব্র চাপে শেষ পর্যন্ত তাকে গর্ভপাত করাতে বাধ্য করা হয়। পুলিশ মামলাটিতে টুইশার পরিবারের জমা দেওয়া হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সংযুক্ত করেছে, যেখানে মৃত্যুর আগে টুইশার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
শাশুড়ির পাল্টা দাবি
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন টুইশার শাশুড়ি গিরিবালা সিং। তার পাল্টা দাবি, টুইশা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন বলেও দাবি করেন গিরিবালা। তার দাবি অনুযায়ী, এই মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণেই টুইশা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ঘটনার সত্য উদঘাটনে তদন্ত করছে পুলিশ।



