বটতলার নাটক ‘খনা’র শততম মঞ্চায়ন: নারী ও শ্রেণির প্রশ্নে অনবদ্য আখ্যান
বটতলার ‘খনা’ নাটকের শততম মঞ্চায়ন ১১ এপ্রিল

বটতলার ‘খনা’ নাটকের শততম মঞ্চায়ন: এক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক উৎসব

বাংলাদেশের নাট্যজগতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে আগামী ১১ এপ্রিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বটতলার নন্দিত নাট্য প্রযোজনা ‘খনা’র ১০০তম মঞ্চায়ন। নাটকটির নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দারের পরিচালনায় এই আয়োজন শুধু একটি নাটক প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি ব্যাপক সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।

‘খনা’ নাটক: নারী ও শ্রেণির প্রশ্নে এক প্রাসঙ্গিক আখ্যান

‘খনা’ নাটকটি এমন এক আখ্যানের মঞ্চকৃতি যা নারী ও শ্রেণির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। গল্পটি পনেরশ বছর আগের হলেও আজকের সমাজেও এর প্রাসঙ্গিকতা অটুট। নাটকটি চাষিদের বেগুন ক্ষেত, কলা বাগান মাড়িয়ে ছোট্ট উঠানে এগিয়ে চলে, যেখানে খনা তার জীবনের নানা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে এক অন্য সত্যের মুখে দর্শকদের দাঁড় করান।

নারী প্রশ্নে, সমতার প্রশ্নে, শ্রেণির প্রশ্নে ক্ষমতাকাঠামোর নানান সমীকরণের নিবিড় ও বহুমাত্রিক পাঠের প্রস্তাবনা নিয়ে ‘খনা’ এমনই মঞ্চকৃতি যা এই সময়ের কথাই বলে দূর অতীতের ইশারাসমেত। ২০১০ সালের ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শততম বর্ষপূর্তিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সহস্র সাধারণের সামনে মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে এই নাটকের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ষোল বছরের যাত্রা: দেশে-বিদেশে দর্শক-নন্দিত

দীর্ঘ ষোল বছরে ‘খনা’ নাটক দেশে-বিদেশে দর্শক-নন্দিত হয়েছে এবং নাট‍্যাঙ্গন ও বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডলে আলোচিত থেকেছে। বটতলার কাছে এটি প্রাণ-স্পন্দনের সমার্থক এক সত্তা হয়ে উঠেছে। নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, ‘‘‘খনা’র শততম মঞ্চায়নের প্রহরে অতীত আর বর্তমানকে এক সুতোয় গেঁথে নেয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেই দানা বাঁধছি আবার।’’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুই দিনব্যাপী উৎসব: সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমাহার

আগামী ১০ এবং ১১ এপ্রিল আয়োজিত হতে যাচ্ছে দুই দিনব্যাপী ‘খনার ১০০ তম মঞ্চায়ন উৎসব’। লীলাবতীর প্রকৃতিজ জ্ঞানকাণ্ডের সূত্র ধরে এই আসর সাজানো হয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা নিয়ে। ১০ এপ্রিল সকালে শিল্পী ও অ্যাক্টিভিস্ট অরূপ রাহীর পরিচালনায় ‘উদয়ভানু সঙ্গ’ অধিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।

এরপর থাকবে আমন্ত্রিত শিল্পীদের যন্ত্রসংগীতের (সরোদ, বেহালা) পরিবেশনা ও গান। সকালের অধিবেশনে শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন রয়েছে, যেমন ব্রতচারী নৃত্য, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, গান, আবৃত্তি পরিবেশনা। এছাড়াও থাকবে মৃৎশিল্পী খোকন কারিগরের পরিচালনায় ‘মাটির পাঠশালা’ এবং চিত্রশিল্পী মনজুর রশীদের পরিচালনায় ‘আঁকিবুকিতে বসন্ত’ শীর্ষক আর্ট ক্যাম্প।

লোকজ ঐতিহ্য ও দেশীয় পণ্যের মেলা

দিনের দ্বিতীয়ভাগে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা প্রদর্শন করবেন টাঙ্গাইলে মরহুম কুদরত আলী লাঠি খেলা দল এবং ঐতিহ্যবাহী ধুয়া গান পরিবেশন করবেন কুমার গাতা ওয়াসিম বয়াতি’র দল ও মাহমুদ পুর আজিজুল বয়াতির দল। এই জনপদের লোকজ ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা বিষমুক্ত শাকসবজি ও দেশীয় খাবারের স্বাদও পরখ করতে পারবেন প্রাকৃত সমাজ-এর ব্যবস্থাপনায় আয়োজিতব্য ‘দেশীয় পণ্যের মেলা’য়।

সেখানে কৃষিপণ্যের সাথে থাকবে কারুপণ্য, পোশাক এবং বইপত্রের পসরা। সন্ধ্যায় আরও থাকবে সমগীত, চারকোল, মাভৈ, কুয়াশা মূর্খ, গীতলবঙ্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদসহ আমন্ত্রিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীবৃন্দের পরিবেশনা। মেলা প্রাঙ্গণে থাকবে দর্শকের ক্যামেরায় খনা শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

গবেষণা ও তথ্যচিত্রের আয়োজন

প্রথম দিন সন্ধ্যায় থাকবে আমন্ত্রিত গবেষক, শিক্ষক, শিল্পী ও সমালোচকদের অংশগ্রহণে ‘খনা’র আলাপ। প্রথম দিনের শেষ আয়োজন হিসেবে থাকবে সৌম্য সরকার ও ব্রাত্য আমিন নির্মিত বিশেষ তথ্যচিত্র। ১১ এপ্রিল উৎসবের দ্বিতীয় দিন যথারীতি ‘দেশীয় পণ্যের মেলা’ চলমান থাকবে এবং সন্ধ্যায় প্রদর্শিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত ‘খনা’র শততম মঞ্চায়ন।

উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি

এই সাংস্কৃতিক উৎসবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তাদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মোটকথা, বটতলার ‘খনা’ নাটকের শততম মঞ্চায়ন শুধু একটি নাট্য প্রদর্শন নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা যা নারী, শ্রেণি ও ঐতিহ্যের প্রশ্নে দর্শকদের ভাবনার খোরাক জোগাবে।