রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রথম বর্ষের ১০ শিক্ষার্থী একই বিভাগের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে র্যাগিং, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। গতকাল রোববার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দপ্তরে তাঁরা লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা পেয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের তালিকা
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা হলেন ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের তানভীরুল ইসলাম, আফতাব ইমন, সজীব রহমান, অলি আহমেদ, রিওয় খান, তাসিবুল ফাহাদ, মাহফুজুল ইসলাম ও ফরহাদ রেজা, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের নাফিউল ইসলাম এবং প্রথম বর্ষের নোমায়েত ইসলাম। প্রক্টরিয়াল বডির কাছে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগে প্রথম বর্ষের ১০ জন শিক্ষার্থী স্বাক্ষর করেছেন।
অভিযোগের বিবরণ
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তাঁরা কয়েকজন শিক্ষার্থী বিভাগের একদল সিনিয়র শিক্ষার্থীদের দ্বারা প্রতিনিয়ত হুমকি, ভয়ভীতি, নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। তাঁদের নিয়মিত বিনোদপুর এলাকায় ডেকে নিয়ে ‘ম্যানার শেখানো’র নামে অপমানজনক আচরণ করা হতো। ৫০ থেকে ১০০ বার নিজের পরিচয় দেওয়া, বিকৃত কবিতা আবৃত্তি, গান গাওয়ানো, ব্যক্তিগত কথোপকথন দেখাতে বাধ্য করা, অকারণে গালিগালাজ, মারধরের হুমকি, পরিবার নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং খাতায় একাধিক পৃষ্ঠা ধরে সিনিয়রদের নাম লিখতে বাধ্য করতেন। এ ছাড়া সিনিয়রদের ডাকে সাড়া না দিলে হুমকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আইডি ব্যবহারের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা।
আন্দোলনে জোর করে অংশগ্রহণ
ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে গত বছরের নভেম্বরে এক শিক্ষককে অপসারণের দাবিতে করা আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগে বলা হয়, সে সময় এসব নতুন শিক্ষার্থীকে জোর করে সেই আন্দোলনে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। সেই আন্দোলনে নিরপেক্ষ থাকতে চাইলে তাঁদের পুরো ব্যাচকে ‘বয়কট’ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
সাম্প্রতিক ঘটনা
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, গত শনিবার বিকেলে বিনোদপুর এলাকায় ডেকে নিয়ে এক শিক্ষার্থীকে আবারও নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরবর্তী সময় সহপাঠীদের মাধ্যমে তাঁকে ডাকা হয় এবং সেখানে উপস্থিত না হলে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এরপর গতকাল একটি মিথ্যা নোটিশ দিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ডেকে এনে সিনিয়রদের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। উপস্থিত না হলে বিভাগ ও ব্যাচ থেকে ‘বয়কট’ করার হুমকির কথাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
তবে র্যাগিংয়ের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে অভিযুক্ত অলি আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, গত বুধবার থেকে তিনি বাড়িতে অবস্থান করছেন। তাঁর জানামতে সহপাঠীদের কেউই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। আরেক অভিযুক্ত তাসিবুল ফাহাদ বলেন, ‘আমরা জুনিয়র ও সিনিয়র সবাই একসঙ্গে বসেছিলাম। আমরা কোনো র্যাগ দিইনি। আমরা সিনিয়র হিসেবে তাঁদের নবীনবরণের বিষয়ে আলোচনার জন্য বসেছিলাম। র্যাগিংয়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত তানভীরুল ইসলাম ও রিওয় খানের মুঠোফোনে কল করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।
বিভাগের সভাপতির প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক জাহিদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানোর পর তাঁদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার জন্য বলেছি। ইতিমধ্যে প্রশাসন বিষয়টি আমলে নিয়েছে। বিভাগের কাছে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের নাম-পরিচয় ও আইডি জানানোর জন্য নির্দেশনা পাঠিয়েছে। র্যাগিং কোনোভাবেই কাম্য নয়, এ বিষয়ে বিভাগের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।’
প্রক্টরের বক্তব্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা গতকাল লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। এ ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটি করা হয়নি। বিষয়টি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা উপকমিটিতে পাঠানো হবে। তারপর সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।



