গায়ক ও গীতিকার—উভয় রূপেই দু-তিন দশক ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন বাউলশিল্পী আবদুস সালাম সরকার ওরফে সালাম সরকার। তাঁর ‘জীবন মানেই তো যন্ত্রণা’, ‘কী সুন্দর এক গানের পাখি’, ‘তুই আমার জীবন রে বন্ধু’, ‘আমি পারি না আর পারি না’, ‘প্রেমের মানুষ ঘুমাইলেও দেয় যন্ত্রণা’, ‘তোমার ভালোবাসা পাইলে এত নষ্ট হইতাম না’সহ আরও কিছু গান ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক শ্রোতানন্দিত। এসব গান গেয়ে নতুন শিল্পীরা যেমন প্রশংসায় ভাসছেন, তেমনি লোকগানের শ্রোতারাও পাচ্ছেন অপার মুগ্ধতা। নেত্রকোনা থেকে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত ভাটি অঞ্চলের পাশাপাশি বৃহত্তর ময়মনসিংহের বাউলভক্তরা বলতে গেলে একনামেই চেনেন তাঁকে। তবে তাঁর এই গ্রহণযোগ্যতা নির্দিষ্ট কোনো জনপদে সীমাবদ্ধ নয়, সুরের জাদু দিয়ে তিনি জয় করেছেন সারা বিশ্বের বাংলাভাষী শ্রোতাদের মন। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের গলায়ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাঁর গান।
বর্তমানের নবীন শিল্পীরাও যখন রাজধানীকেন্দ্রিক ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে এসেও বাউল সালাম সরকার পড়ে আছেন শিকড়ের টানে। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার পুরোনো বাসস্ট্যান্ড মোড়ের ছোট্ট এক ডেরাই যেন তাঁর সাধনাক্ষেত্র; যেখান থেকে তিনি নিভৃতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁর সৃষ্টিকর্ম।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সালাম সরকারের গানের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও তিনি নিজে বরাবরই অনুপস্থিত। কারণ, তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রচারবিমুখ। সালাম সরকারকে সশরীর দেখেননি, অথচ তাঁর গানের ভক্ত বনে আছেন, এমন গানপাগল অগণিত। কালেভদ্রে ছাড়া তাঁকে টেলিভিশনে দেখা যায় না। পত্র-পত্রিকায়ও তাঁকে নিয়ে আলোচনা হয় না বললেই চলে। কিন্তু এটি নিরেট সত্য যে সালামের গানের দর্শক-শ্রোতার কোনো অভাব নেই। তাঁর উপস্থিতির আওয়াজ পেলেই বাউলগানের আসর দর্শক-শ্রোতার ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। আয়োজকদের ভিড় সামলানো দায় হয়ে পড়ে।
নিভৃতচারী এই জনপ্রিয় শিল্পীর সান্নিধ্য পেতে এক সন্ধ্যায় হাজির হয়েছিলাম তাঁর ছোট্ট ডেরায়। মুঠোফোনে ভক্তদের সাড়া দেওয়া ছাড়া সেদিন আর কোনো তাড়া ছিল না তাঁর। আড্ডায় আরও উপস্থিত ছিলেন সালামের জীবনসঙ্গিনী শামসুন্নাহার বেগম, কবি ও প্রাবন্ধিক স্বপন নাথ এবং স্থানীয় সাংবাদিক রহমান জীবন। সেই ঘরোয়া আলাপচারিতার চুম্বকাংশ নিয়েই সাজানো হয়েছে এই সাক্ষাৎকার।
জন্ম ও শৈশব
সঞ্জয় সরকার: আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা সম্পর্কে জানতে চাই।
সালাম সরকার: আমার পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনার মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামে। ১৯৭০ সালের কোনো এক রোববার আমার জন্ম। বাবার নাম আবদুল জব্বার। তিনি ছোটখাটো কৃষক ছিলেন। আর মা পরিষ্কারেন্নেছা ছিলেন গৃহিণী। সাত ভাই আর চার বোনের মধ্যে আমি পঞ্চম। আমি এক বছর মোহনগঞ্জ উপজেলার খালুয়া গ্রামের মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছি। পরে মদন উপজেলার হাজরাগাতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও কিছুদিন লেখাপড়া করি। লেখাপড়া বলতে ইশকুলে গেছি আর আসছি। ঠিকমতো লেখাপড়া হয়নি।
কেন্দুয়ায় থিতু হওয়া
সঞ্জয় সরকার: আপনার পৈতৃক নিবাস মদন উপজেলায়। কিন্তু সবাই আপনাকে কেন্দুয়া উপজেলার বাসিন্দা হিসেবেই জানেন। কেন্দুয়ায় থিতু হলেন কবে ও কীভাবে?
সালাম সরকার: আমার ওস্তাদ বাউল আবেদ আলীর সঙ্গে কেন্দুয়া পৌরসভার কান্দিউড়া গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক পৌর মেয়র আবদুল হক সাহেবের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি বাউলগান ভালোবাসতেন। তাই একটা সময়ে এসে তাঁর বাড়িতে থাকতে দিলেন। পরে তাঁর প্রস্তাবে আমি ১৯৯২ সালে ওই গ্রামের শামসুন্নাহার বেগমকে বিয়ে করি এবং শ্বশুরবাড়িতে সংসার পাতি। পরে ২০০২ সালে কেন্দুয়া সদরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জায়গা কিনে তাতে বসবাস শুরু করি।
গানের জগতে আগমন
সঞ্জয় সরকার: গানের জগতে এলেন কীভাবে? কার বা কাদের অনুপ্রেরণায়?
সালাম সরকার: গানটা বোধ হয় সৃষ্টিকর্তাই আমাকে আমার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিলেন। শিশুকাল থেকেই আমি গানপাগল। মাদ্রাসায় যখন পড়তাম, তখন ক্লাস শুরুর আগে বেঞ্চ চাপড়ে গান করতাম। এ জন্য মাদ্রাসা থেকে আমাকে বের করে দেওয়া হয়। পরে যখন হাজরাগাতি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হই—সেখানেও একই অবস্থা। আসলে গান ছাড়া আমার কিছুই ভালো লাগত না। কোথাও গান হবে, এমন খবর শুনলেই পালিয়ে চলে যেতাম। আসরে বসে বসে গান শুনতাম আর তা গুনগুন করে নিজেও গাওয়ার চেষ্টা করতাম। এ কারণে বড় ভাইরা অনেক শাসন করতেন। কিন্তু কোনো বাধাই মানতাম না।
আমার ওস্তাদ আবেদ আলী ও মকবুল হোসেন—দুজনই মালজোড়া বাউলগান করতেন। তখন সমাজে মালজোড়া গানের ব্যাপক চাহিদা ছিল। মালজোড়া গান হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাউলগান। এই গান করতে কমপক্ষে দুজন বাউলশিল্পী লাগে। ওস্তাদ মকবুল হোসেন সাহেবের সঙ্গে যখন মঞ্চে গান করতে যেতাম, তখন তাঁর জুতসই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে আমাকেই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গান গাওয়ার সুযোগ করে দিতেন। মূলত তাঁর সান্নিধ্যেই আমি মালজোড়া বাউলগান আয়ত্ত করেছি।
গুরু-শিষ্য পরম্পরা
সঞ্জয় সরকার: বাউলদের মধ্যে গুরু-শিষ্য পরম্পরা আছে। নিশ্চয়ই আপনিও কোনো না কোনো ওস্তাদ বা গুরুর কাছ থেকে গান শিখেছেন?
সালাম সরকার: অভিভাবকেরা যখন বুঝলেন, আমাকে দিয়ে আর লেখাপড়া হবে না তখন তাঁরা আমার জীবনের একটা বিহিত করার কথা চিন্তা করলেন। বড় ভাই তোফাজ্জল হোসেন আর ভগ্নিপতি আবদুল গণি মেম্বার পরামর্শ করলেন আমাকে গানের জগতে দিয়ে দেওয়ার। তাঁরাই একদিন আমাকে নিয়ে কেন্দুয়া উপজেলার বৈশ্যপাট্টা গ্রামের প্রখ্যাত বাউলসাধক আবেদ আলী সাহেবের কাছে হাজির হলেন। তাঁরা আবেদ সাহেবকে আমার দুইটা গান শুনতে বললেন। ওস্তাদ আমার গান শুনে খুশি হলেন এবং আমাকে তাঁর বাড়িতে রাখলেন। এর পর থেকে আবেদ আলী সাহেবের কাছে গান শিখতে শুরু করি। ওস্তাদ যখন গান করতেন, তখন আমিও তাঁর সঙ্গে গাইতাম। তিনি ভুলত্রুটি ঠিক করে দিতেন। আর অন্যান্য সময় ওস্তাদের সঙ্গে খেতে-খামারে কাজ করতাম। তাঁর কাছে দুই বছর গান শেখার পর আমি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার দড়িজাহাঙ্গীরপুর গ্রামের বাউলসাধক মকবুল হোসেনের কাছে চলে যাই। তাঁকেও ওস্তাদ মানি। তিনি প্রথমে ‘বর্ণবোধ’ ও ‘বাল্যশিক্ষা’ বই পড়ালেন। এতে আমার মধ্যে কিছুটা বর্ণজ্ঞান ঢুকল। এরপর আস্তে আস্তে গানের শিক্ষা দিতে লাগলেন। আমাকে তাঁর গানের ডায়েরি পড়তে দিতেন। তাঁর লেখা গান পড়ে ১৩-১৪ বছর বয়সে আমার মধ্যেও গান লেখার আগ্রহ জাগল। আমিও দু-একটা গান লিখতে আরম্ভ করলাম। মকবুল সাহেবের বাড়িতে আমি প্রায় তিন বছর ছিলাম। আবেদ আলী এবং মকবুল হোসেন—এই দুই ওস্তাদের কাছেই আমি বেহালা, হারমোনিয়াম ও তবলা বাজানো শিখেছি। তাঁরাই প্রথম আমাকে মঞ্চে তুলেছিলেন। আমি তাঁদের সন্তান না হলেও রুহানি সন্তান।
মালজোড়া গান রপ্ত
সঞ্জয় সরকার: নেত্রকোনা জেলা মালজোড়া বাউলগানের জন্য প্রসিদ্ধ। এখান থেকেই মালজোড়া গানের শুরু। আপনি নিজেও মালজোড়া গান করেন। এই মালজোড়া গান রপ্ত করলেন কখন এবং কীভাবে?
সালাম সরকার: আমার ওস্তাদ আবেদ আলী ও মকবুল হোসেন—দুজনই মালজোড়া বাউলগান করতেন। তখন সমাজে মালজোড়া গানের ব্যাপক চাহিদা ছিল। মালজোড়া গান হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাউলগান। এই গান করতে কমপক্ষে দুজন বাউলশিল্পী লাগে। ওস্তাদ মকবুল হোসেন সাহেবের সঙ্গে যখন মঞ্চে গান করতে যেতাম, তখন তাঁর জুতসই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে আমাকেই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গান গাওয়ার সুযোগ করে দিতেন। মূলত তাঁর সান্নিধ্যেই আমি মালজোড়া বাউলগান আয়ত্ত করেছি।
প্রথম ক্যাসেট
সঞ্জয় সরকার: ক্যাসেট প্লেয়ারের যুগে আপনার গানের ক্যাসেটের ব্যাপক কাটতি ছিল। প্রথম ক্যাসেট কখন প্রকাশিত হয়েছিল? কারা প্রকাশ করেছিল?
সালাম সরকার: আমার বয়স যখন ২০-২২ বছর, তখন কিশোরগঞ্জের সুরবিতান নামক একটি রেকর্ডিং স্টুডিও থেকে আমার প্রথম গানের ক্যাসেট প্রকাশ হয়। প্রতিষ্ঠানটি নিজ উদ্যোগেই ক্যাসেটটি বের করেছিল। ক্যাসেটটির নাম ছিল আমারে নি লইবা গো তোমার নায়। সেটিতে মোট আটটি গান ছিল। সব কটিই অন্য বাউলদের লেখা। শ্রোতারা আমার তরুণ কণ্ঠের গানগুলো পছন্দ করেছিলেন।
স্থানীয় রেকর্ডিং
সঞ্জয় সরকার: যত দূর জানি, কেন্দুয়া উপজেলা সদরের একটি রেকর্ডিং সেন্টার থেকেও আপনার গানের অনেকগুলো ক্যাসেট প্রকাশ হয়েছিল এবং বাজারে সেগুলোর ব্যাপক চাহিদা ছিল।
সালাম সরকার: ঠিকই শুনেছেন। কেন্দুয়া বাজারে আমার বন্ধু সৈয়দ আবু রাগেব সাজেদের সাজেদ ইলেকট্রনিকস নামে একটা ক্যাসেট ও রেকর্ডিংয়ের দোকান ছিল। তিনি স্থানীয়ভাবে রেকর্ডিং করে আমার গানের বেশ কিছু ক্যাসেট বাজারজাত করেছিলেন। একটা সময়ে এসে তাঁর মূল ব্যবসাই হয়ে উঠেছিল আমার গানের ক্যাসেট বিক্রি। বিনিময়ে আমাকেও কিছু টাকাপয়সা দিতেন। দুজনেরই লাভ হতো।
ঢাকা ও ময়মনসিংহের স্টুডিও
সঞ্জয় সরকার: ঢাকা ও ময়মনসিংহের অনেক নামীদামি স্টুডিও থেকেও তো আপনার অনেক ক্যাসেট এবং অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে।
সালাম সরকার: ময়মনসিংহে পিয়াস রেকর্ডিং সেন্টার নামে একটা কমার্শিয়াল স্টুডিও ছিল। তারা আমার দুইটা ক্যাসেট প্রকাশ করেছিল। এরপর ঢাকার সিম্ফনি, সাউন্ডটেক, সংগীতা প্রভৃতি বড় স্টুডিও থেকেও আমার বহু ক্যাসেট এবং অ্যালবামের যুগে অ্যালবাম প্রকাশ হয়। এসব ক্যাসেট ও অ্যালবামের বেশির ভাগ গানই আমার নিজের লেখা। এমনও হয়েছে, স্টুডিওর মালিকেরা আমাকে খবর দিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু আমার গান ঠিক করা নেই। তাই রাত জেগে গান লিখছি ও সুর করছি। পরদিন কোনো রকম প্র্যাকটিস ছাড়াই সেসব গান স্টুডিওতে গাইছি। তখনকার সময়ে তারা মমতাজ বেগমকে যে পরিমাণ টাকা দিত, আমাকেও তা–ই দিত।
মোট ক্যাসেট ও অ্যালবাম
সঞ্জয় সরকার: আপনার মোট ক্যাসেট ও অ্যালবামের সংখ্যা কত? এ পর্যন্ত মোট কতগুলো গান লিখেছেন? সব কটি কি আপনার সংগ্রহে আছে?
সালাম সরকার: সঠিক হিসাব বলতে পারব না। ধারণা করি, ক্যাসেট ও অ্যালবামের মোট সংখ্যা মোট ৪০০–এর বেশি হবে। আর নিজের লেখা গানের সংখ্যা হবে দুই সহস্রাধিক। সব ক্যাসেট ও অ্যালবাম যেমন সংগ্রহে নেই, তেমনি আমার লেখা সব গানও আমার সংগ্রহে নেই। তবে আমার ভক্ত ও ভাবশিষ্যদের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আসলে তখন এগুলো সংগ্রহে রাখার প্রয়োজন অনুধাবন করতে পারিনি।
জনপ্রিয় ক্যাসেট ও অ্যালবাম
সঞ্জয় সরকার: আপনার জনপ্রিয় ক্যাসেট ও অ্যালবামগুলোর নাম যদি একটু বলতেন—
সালাম সরকার: একেকজনের কাছে একেকটা প্রিয়। তবে জীবন মানেই যন্ত্রণা, জীবনে কী ভুল করলাম, মানুষ যে কী বেঈমান, প্রেমের মানুষ ঘুমাইলেও দেয় যন্ত্রণা, শান-এ খাজা, শান-এ মদিনা, ও প্রাণ কোকিলারে, ভুলে ভরা জীবন, কী সুন্দর গানের পাখি—এই ক্যাসেট ও অ্যালবামগুলো ব্যাপক হারে বিক্রি হয়েছে।
ভাইরাল গান
সঞ্জয় সরকার: শুধু বাউলশিল্পী হিসেবেই নন, গীতিকার হিসেবেও আপনি জনপ্রিয়। আপনার অনেক গান ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। কোনগুলো সবচেয়ে খুব বেশি জনপ্রিয়?
সালাম সরকার: অনেক গানই তো দর্শক ও শ্রোতারা পছন্দ করেছেন। এর মধ্যে ‘জীবন মানেই তো যন্ত্রণা’, ‘কী সুন্দর এক গানের পাখি’, ‘তুই আমার জীবন রে বন্ধু’, ‘আমি পারি না আর পারি না’, ‘প্রেমের মানুষ ঘুমাইলেও দেয় যন্ত্রণা’, ‘ও প্রাণ কোকিলারে’, ‘কেন হলে দেখা রে’, ‘মরছি মরছি আমি মরছি’, ‘তোমার ভালোবাসা পাইলে এত নষ্ট হইতাম না’, ‘এই কি প্রেমের পাওনা’, ‘বিদেশিরে কেন মন দিলাম’, ‘আওয়ালে আয়না, আখেরে আয়না’, ‘এমন একজন লাইলি আছেন, মজনু নিজে পাক আল্লাহ’, ‘বাবাই আমার কাবারে, মা আমার মদিনা’ প্রভৃতি গান সর্বাধিক জনপ্রিয়।
অনুমতি ও রয়্যালটি
সঞ্জয় সরকার: মঞ্চের পাশাপাশি ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে দেখা যায়, অসংখ্য শিল্পী আপনার লেখা গান গাইছেন। তাঁদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেরও কিছু শিল্পী আছেন। এই শিল্পীরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গান রেকর্ডিং করার আগে আপনার অনুমতি নেন? কোনো রয়্যালটি দেন?
সালাম সরকার: কেউ কেউ অনুমতি নেন। আবার বেশির ভাগই নেন না। এই বাবদ আজ পর্যন্ত কারও কাছ থেকে একটি টাকাও রয়্যালটি পাইনি। তবে যেহেতু তাঁরা আমার নাম দিয়েই গান, সেহেতু আমি কিছু বলি না। কিছু মনেও করি না। তাঁদের যদি ভালো লাগে, তবে গান। অনুমতি নিলে একটু খুশি হই—এই যা।
খ্যাতিমান শিল্পীরা
সঞ্জয় সরকার: কয়েকজন খ্যাতিমান শিল্পীর নাম বলেন, যাঁরা আপনার গান গেয়েছেন।
সালাম সরকার: হাবিব ওয়াহিদ, মমতাজ বেগম, সালমা, কাজী শুভ, ফকির শাহাবুদ্দিন, রিংকু, আঁখি আলমগীর, দুর্জয় ব্রাদার্স, আশিক, কুদ্দুস বয়াতিসহ আরও অনেকেই তো গেয়েছেন। এ মুহূর্তে সবার নাম মনে পড়ছে না।
টেলিভিশনে অনুপস্থিতি
সঞ্জয় সরকার: এত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও টেলিভিশনের পর্দায় আপনাকে খুব একটা দেখা যায় না। এর কারণ কী? টেলিভিশনগুলো কি আপনাকে ডাকে না, নাকি আপনি যান না?
সালাম সরকার: বিভিন্ন সময়ে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোতে বেশ কিছু অনুষ্ঠান করেছি। তবে এখন খুব একটা যাই না। এর কারণ, টেলিভিশনগুলো গান গাওয়ার সময় কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। তাদের মতো করে গাইতে বলে। এটি আমার ভালো লাগে না। তা ছাড়া তারা যে খরচাদি দেয়—তা দিয়েও পোষায় না।
পারিশ্রমিক নিয়ে অভিযোগ
সঞ্জয় সরকার: অনেকে বলেন, আপনি নাকি খুব কমার্শিয়াল শিল্পী। আপনার চাহিদামতো পারিশ্রমিক না দিলে গান করতে যান না। এ কারণে অনেকে আপনাকে নিতে পারেন না। এ অনুযোগ কতটুকু সত্য?
সালাম সরকার: পুরোপুরি সত্য নয়, আবার ডাহা মিথ্যাও নয়। আমি কোথাও গান করতে গেলে সঙ্গে একটা টিম নিয়ে যেতে হয়। গাড়ি ভাড়া লাগে। কাজেই হাজার পঞ্চাশেক টাকার নিচে আমি প্রোগ্রাম করতে পারি না। কারণ, গাড়িভাড়া এবং স্টাফ খরচ দিয়ে নিজের পকেটেও তো কিছু রাখতে হয়। তা ছাড়া এটা করেই তো আমার সংসার চলে। তবে কাছাকাছি জায়গায় হলে অথবা কোনো পীর-আউলিয়ার ওরস উপলক্ষে আয়োজন হলে আমি কম খরচেও গান করি। তখন আর অত ব্যবসার কথা চিন্তা করি না।
পোশাক-আশাক
সঞ্জয় সরকার: বাউলদের মধ্যে বেশভূষা একটু ভিন্ন ধরনের হয়। কিন্তু আপনি ব্যতিক্রম। আপনার পোশাক-আশাক সাধারণ মানুষদের মতো। এর কারণ কী?
সালাম সরকার: আমি মঞ্চে বাউল। গায়ক হিসেবে বাউল। মনেপ্রাণেও একজন বাউল। কিন্তু লম্বা বাবরি রেখে, নোংরা পোশাক-আশাক করে বাউল সাজতে চাই না। নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করি। মোটকথা, আমি লেবাসধারী বাউল নই। স্বভাবগতভাবে বাউল। তাই আমি আমার মতো করেই চলি। আল্লাহ ও পীর ছাড়া কারও আদেশ-নির্দেশ মানি না। কাউকে অনুসরণও করি না।
পীরের মুরিদ
সঞ্জয় সরকার: এ অঞ্চলের বাউলশিল্পীদের মধ্যে কোনো না কোনো পীরের মুরিদ হওয়ার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। আপনিও কি কোনো পীরের মুরিদ?
সালাম সরকার: আমি ১২-১৩ বছর বয়স থেকে পীরের মুরিদ। আমার পীরের নাম সৈয়দ শিবলী আকবরী সাহেব। তিনি গাউছে হাওলাই চট্টগ্রামের পীর। তাঁর আদেশ-নির্দেশাবলি মেনে চলার চেষ্টা করি।
অন্যের গান
সঞ্জয় সরকার: মঞ্চে সাধারণত আপনার নিজের লেখা গান গেয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যে কি অন্যদের গানও করেন?
সালাম সরকার: দর্শকদের চাহিদার কারণে ইদানীং আমাকে আমার লেখা গানই বেশি গাইতে হয়। তবে পাশাপাশি বাউলগুরু লালন সাঁইজি, দ্বিজ দাস, বিজয় সরকার ও আমাদের অঞ্চলের রশিদ উদ্দিন, জালাল উদ্দীন খাঁ, উকিল মুন্সী, আবেদ আলী ও মকবুল হোসেন সাহেবের গানও করি। আবার উপযুক্ত শ্রোতা পেলে কখনো কখনো নজরুলগীতি, শ্যামাসংগীত, রামপ্রসাদী—এমনকি মান্না দের আধুনিক গানও গাওয়ার চেষ্টা করি। এটি অনেকাংশে নির্ভর করে দর্শক-শ্রোতাদের পছন্দ-অপছন্দের ওপর।
মাজার ও গানবাজনা
সঞ্জয় সরকার: পীর-আউলিয়াদের মাজারে বার্ষিক ওরস উপলক্ষে বাউলগানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু একটি মহল মাজার-সংস্কৃতির বিরোধিতা করে আসছে। কিছু হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। আবার সরাসরি গানবাজনারও বিরোধিতা করছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সালাম সরকার: প্রকৃত অলি-আউলিয়ার মাজার ভাঙার ক্ষমতা কারও নেই। কিন্তু কিছু ভক্ত নামধারী অথবা কিছু ভণ্ড নিজেরাই পীর সেজে মাজার তৈরি করছে। সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপ করা হচ্ছে। সমাজের মানুষ এগুলো ভালোভাবে গ্রহণ করছে না। আরেকটা কথা হচ্ছে, গান দুই ধরনের। কিছু গান ইবাদত বা প্রার্থনার শামিল। ওই ধরনের গান করলে কেউ বিরোধিতা করতে আসবে না। আবার এমন কিছু গান আছে, যা মানুষকে কুপথগামী করে তোলে। সে ধরনের গান গাইলে মানুষ তো অপছন্দ করবেই। আর কিছু মানুষ আছে, যারা ভালোভাবে না জেনে বা না বুঝেই গানবাজনার বিরুদ্ধে লাগে। অলি-আউলিয়াদের মাজার নিয়ে কুকথা বলে। আসলে এরা চোখ থাকতেও অন্ধ।
নতুন শিল্পীদের প্রতি পরামর্শ
সঞ্জয় সরকার: তাহলে নতুন বাউলশিল্পীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
সালাম সরকার: নতুনদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, বাউলশিল্পী হওয়ার জন্য তাঁদেরকে অবশ্যই কঠিন সাধনা করতে হবে। বাউলদর্শনটা ভালো করে জানতে ও বুঝতে হবে। ওস্তাদ বা গুরুর সান্নিধ্যে থেকে নিবিষ্টচিত্তে চর্চা করতে হবে। প্রকৃত বাউলেরা হচ্ছেন বায়ু নিয়ন্ত্রণকারী। যে বায়ু দিয়ে আমরা বেঁচে আছি। লালন সাঁইজি বলেছেন, ‘ধরো চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে’। বাউল হতে হলে ‘হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে’ সেই চোরকে ধরতে হবে। সেই মালিকের দর্শনপ্রাপ্ত হতে হবে। সর্বদা স্রষ্টার প্রেমে নিমগ্ন থাকতে হবে। এই প্রেম এমন এক প্রেম, যা তাঁর অতি আপনজন পর্যন্ত জানবেন না; অর্থাৎ আমি কী নিয়ে ঘুরছি, তা শুধু আমি জানি আর আমার স্রষ্টা জানেন। শুধু লেবাস ধারণ করে বাউল হওয়া যাবে না। আর তাঁর মধ্যে কোনো আমিত্ব বা অহংকার থাকতে পারবে না। তা যদি থাকে, স্রষ্টার ভালোবাসা পাবেন না।
মালজোড়া গানের অবনতি
সঞ্জয় সরকার: একটু আগে মালজোড়া বাউলগানের কথা বলছিলাম। আপনি খুব ভালো মালজোড়া গান করতেন। একসময় এ অঞ্চলে এর ব্যাপক কদর ছিল। কিন্তু এখন আর মালজোড়া গানের আয়োজন খুব একটা দেখা যায় না। এর কারণ কী?
সালাম সরকার: মালজোড়া গান হলো গানের পাশাপাশি বিতর্কমূলক প্রশ্নোত্তরের পালা। এই গান করতে গেলে একজন বাউলশিল্পীকে গানের পাশাপাশি হাদিস, কোরআনসহ বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান রাখতে হয়। কিন্তু আজকাল অনেকে জানতে বুঝতে চান না। দেখা যায়, একজন প্রশ্ন করল এক জায়গা থেকে, আরেকজন উত্তর দিলেন অন্য জায়গা থেকে। দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে যাঁরা একটু জ্ঞানী-গুণী, তাঁরা এসব প্রশ্ন ও উত্তর সহজে মেনে নিতে পারেন না। এ কারণে মজাও পান না। আর এসব কারণে মালজোড়া গান আর আগের মতো জমে না।
সহশিল্পী
সঞ্জয় সরকার: আপনার সুদীর্ঘ সংগীতজীবনে অনেক বড় শিল্পীদের সঙ্গে গান করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম শুনতে চাই।
সালাম সরকার: অনেকের সঙ্গেই তো গান করেছি। তাঁদের মধ্যে মমতাজ বেগম, শাহ আলম সরকার, শেফালী সরকার, মুক্তা সরকার, আবুল সরকার, তানিয়া ও লাল মিয়া—এঁদের নাম মনে পড়ছে। আরেকটু চিন্তা করার সময় পেলে আরও অনেকেরই নাম মনে আসবে।
বিদেশে গান
সঞ্জয় সরকার: শুনেছি, প্রবাসীদের আমন্ত্রণে আপনি একাধিকবার বিদেশে গিয়েও গান করেছেন। কোন কোন দেশে যাওয়া হয়েছে?
সালাম সরকার: ২০১০ সালের দিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আমন্ত্রণে লন্ডন (যুক্তরাজ্য) এবং কাতারে গিয়ে গান করেছি। এরপর আরও কয়েকবার বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছি, কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
শিষ্য ও সন্তান
সঞ্জয় সরকার: বাউলরা শিষ্য ও ভাবশিষ্যদের মাধ্যমে তাঁদের সংগীত-ঐতিহ্যকে ধরে রাখেন। নিশ্চয়ই আপনার অনেক শিষ্য-সামন্ত আছে। আপনার সন্তানসন্ততিদের কেউ কি গানবাজনা করেন?
সালাম সরকার: আমার জেলার ১৫-২০ জন আছে, যারা আমার সরাসরি শিষ্য। তবে এর বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অন্তত এক শ-দেড় শ ভাবশিষ্য আছে, যারা আমাকে ওস্তাদ হিসেবে মানে এবং অনুসরণ করে। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, আমার পরিবারের কেউ গান করে না। চার ছেলেসন্তানের একজনেরও গানের প্রতি আগ্রহ জন্মেনি। আমিও জোর করে শেখাইনি। আসলে গানটা নিজের ভেতর থেকে আসতে হয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সঞ্জয় সরকার: আপনি দীর্ঘ ৪৫ বছরের এক বর্ণাঢ্য সংগীতজীবন পার করেছেন। অগণিত মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। সংগীত নিয়ে আর কিছু করার ইচ্ছা আছে কি?
সালাম সরকার: আমি তো মনে করি, আমার জীবন এখনো এলোমেলো। কিন্তু কেন যে এত এলোমেলো, এর উত্তর খুঁজে পাই না। একটা গানেও আমি এই কথা বলেছি, ‘কত জায়গায় গান গাইলে তুই/ নিজের গান তো গাইলে নারে/ নিজের গান তো গাইলে না/ সালাম রে তুই মানুষ হইলে না...’। আসলে আমি বোধ হয় এখনো পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারিনি। তাই এখনো অনেক কিছুই করতে পারিনি। এই যে দুই হাজারের বেশি গান লিখলাম, এত গান গাইলাম, একটা বইও তো বের করা হয়নি। গানগুলোও ঠিকমতো সংগ্রহ বা সংরক্ষণও করা হয়নি। ইচ্ছা আছে, গানগুলো সংগ্রহ করে অন্তত দুই-একটা বই বের করার। যাতে গানগুলো অবিকৃতভাবে টিকে থাকে।
সঞ্জয় সরকার: দীর্ঘ সময় ধরে আলাপচারিতা হলো। অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে সময় দিলেন। অনেক প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিলেন। আপনার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।
সালাম সরকার: আপনার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমাদের বাউল-অঙ্গনের ঐতিহ্যটাকে ধরে রাখার জন্য আপনারা কিছু করেন। আপনারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে আউল-বাউলদের জন্য কিছু করলেই আমরা খুশি।



