কুরবানির ঈদে শৈশবের স্মৃতি ও বিষাদ
কুরবানির ঈদে শৈশবের স্মৃতি ও বিষাদ

শৈশবের কুরবানি: আনন্দ আর বেদনার মিশেল

আমার শৈশবে কুরবানির ঈদ কখনো ঈদুল ফিতরের মতো আনন্দের মনে হতো না। তিনটি কারণ ছিল এর পেছনে। প্রথমত, ঈদুল ফিতরের মতো কুরবানির ঈদে 'চাঁদ রাত' থাকত না। দ্বিতীয়ত, আমাদের পরিবারে কুরবানির ঈদে ফিতরের মতো নতুন জামাকাপড় দেওয়ার রীতি ছিল না। তৃতীয়ত, কুরবানির আগে বাড়িতে আনা নীরব পশুটির চোখে আমি বিষাদ আর কষ্ট দেখতে পেতাম।

গরু কেনার উত্তেজনা

শৈশবে কুরবানির সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল কোরবানির পশু কেনা। ঈদের দুই সপ্তাহ আগে আমরা বাবাকে গরুর হাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতাম। বাবা হাসতেন আর বলতেন, 'বাজার আগে স্থির হোক।' এখন বুঝি, মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবার বাড়তি ঈদ বোনাসের অপেক্ষা করতে হতো।

পশুর চোখের ভাষা

গরু কিনতে যেতে ইচ্ছে করলেও হাটটা আমার ভালো লাগত না। ভিড়, চিৎকার, ধাক্কাধাক্কি, কাদা আর পশুর আর্তনাদ সবই অস্বস্তিকর ছিল। সবচেয়ে খারাপ লাগত পশুর চোখের দিকে তাকালে। তাদের বড় কালো চোখে আমি বিষাদ, ভয় আর বিচ্ছেদের বেদনা দেখতে পেতাম।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একবার এক গরু কেনার পর যেতে চাইছিল না। বৃদ্ধ কৃষক বললেন, 'এই গরুটা আমি বাছুর থেকে পালন করেছি। আমার প্রতি তার খুব মায়া। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।' তার চোখে জল এসে গেল। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বললেন, 'যতক্ষণ আমি এখানে থাকব, এটা আপনার সাথে যাবে না। আমাকে কিছুক্ষণ এর চোখের আড়াল হতে দিন।'

বাড়িতে পশু এলো

গরু কেনার পর বাড়ির পিছনের উঠানে তার জন্য জায়গা করে দেওয়া হতো। আমরা ভাইবোনেরা গরুটিকে স্বাগত জানাতে গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমার মা গরুটির পিঠে হাত বুলিয়ে বলতেন, 'তোমরা খুব ভালো একটা কিনেছ।' বাবার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠত।

আমার ছোট ভাই গরুটির নাম রাখতে চাইলে মা চুপি চুপি বলতেন, 'না, মায়া বাড়বে। মায়া বাড়ানোর কোনো দরকার নেই।' তখন তার কথা খুব নিষ্ঠুর মনে হলেও আজ বুঝি তিনি কতটা সংবেদনশীল ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৈষম্যের প্রথম শিক্ষা

প্রতিবেশী বন্ধু নওশাদ এসে আমাদের গরু দেখে বলত, 'তোমাদের গরু আকারে ছোট! আমাদেরটা দেখো, অনেক বড়।' তার কথায় আমি খুব কষ্ট পেতাম। তার গরুর দাম শুনে আমি হতবাক হয়ে যেতাম। কুরবানির ঈদেই আমার প্রথম বৈষম্যের পাঠ নেওয়া।

ঈদের আগের রাত

ঈদের আগের রাতে সন্ধ্যার আবছা আলোয় আমি পশুটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমার চোখে জল আসত। আমার মা এসে নিজের হাতে পশুটিকে খাওয়াতেন। পরদিন সকালে পশুটিকে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি দূরে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে থাকতাম। ফিরে এসে ছোট ভাই বলত, 'দাদা, ওকে নিয়ে যাওয়ার সময় ওর চোখ থেকে পানি পড়ছিল।' আমি আকাশের দিকে চোখ তুলে চুপ করে থাকতাম।

ড. সেলিম জাহান নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অফিস ও দারিদ্র্য বিভাগের সাবেক পরিচালক।