বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি) এখন ৭০ বছর বয়সী এক জরাজীর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একসময় যেখানে তারকাদের পদভারে গমগম করত, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা। অন্যদিকে, রাজধানীর গুলশানের আবাসিক এলাকা নিকেতন এখন সিনেমা, নাটক ও বিজ্ঞাপনসহ সব ধরনের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
এফডিসির পতনের সূচনা
২০০৮ সালে চিত্রনায়ক মান্নার মৃত্যুর পর থেকেই সিনেমা শিল্পে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। শাকিব খান এককভাবে ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে চলে আসেন, তার পারিশ্রমিক ১০ লাখ টাকা থেকে কয়েক লাফে ৩৫ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। তিনি বছরে ১৫-১৬টি ছবিতে অভিনয় করতেন এবং ঈদে তার কমপক্ষে ৪টি ছবি মুক্তি পেত। তার ছবি ৩০০ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেত এবং পুরনো ছবি আরও ৩০০ প্রেক্ষাগৃহে চলত। এই একচেটিয়া রাজত্ব দর্শকদের একঘেয়েমিতে ভোগাতে শুরু করে এবং ২০১১-১২ সালের দিকে তার ছবির ব্যবসা আগের মতো আর হয় না।
২০১৩ সালের দিকে এসে শাকিব খানকে নিয়ে ছবি বানানো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো পাততাড়ি গোটাতে শুরু করে। জননী কথাচিত্র, সন্ধানী কথাচিত্র, আশা প্রডাকশন্স, তুষার কথাচিত্র, তিতাস কথাচিত্র, বন্ধন বাণীচিত্র, লিবার্টি কথাচিত্র, দিগন্ত চলচ্চিত্র, ঋদ্ধি টকিজ, কিষাণ চলচ্চিত্র, মডার্ন ফিল্মস, মেরিনা মুভিজ, তন্ময় কথাচিত্র, অপূর্ব চলচ্চিত্র—এসব প্রতিষ্ঠিত ব্যানার নিজেদের গুটিয়ে নেয় চলচ্চিত্র ব্যবসা থেকে। ২০১৪ সালে শাকিব অভিনীত ছবি মুক্তি পায় ১০টি, ২০১৫ সালে ৫টি, ২০১৬ সালে ৮টি, ২০১৭ সালে ৫টি, ২০১৮ সালে ৮টি এবং ২০১৯ সালে মাত্র ৩টি।
নতুন নির্মাতাদের উত্থান
২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া 'মনপুরা' ছবিটি ছিল টার্নিং পয়েন্ট। নাটকের নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিমের এই ছবি ৩৫ লাখ টাকা পারিশ্রমিকের শাকিব খানের ছবিকেও পেছনে ফেলে দিয়ে বছরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি হয়। এরপর ধীরে ধীরে নাটকের নির্মাতারা সিনেমায় পা ফেলতে থাকেন। ২০১৩ সালে ডিজিটাল প্রদর্শনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ছোটপর্দার নির্মাতাদের ছবি বানানোর হিড়িক পড়ে যায়। ফিল্ম বাতিল হওয়ায় নির্মাণব্যয় কমে আসে, ফলে নতুন মুখ এফডিসিতে ফ্লোর ভাড়া নিতে আসতে থাকে।
২০১৬ সালে 'আয়নাবাজি' সুপারহিট হলে এফডিসি আরও শক্তি হারায়। এই ছবির নির্মাতা অমিতাভ রেজার স্কুলিং ছিল না এফডিসির, তার ছবির পুঁজিদাতাদের সঙ্গেও ছিল না কাকরাইলের সম্পৃক্ততা। ২০১৮ সালে অনম বিশ্বাসের 'দেবী' মুক্তি পাওয়ার পর এফডিসির ভাঙন আরও তীব্র হয়। এই ছবিতে চঞ্চল চৌধুরী ও জয়া আহসান অভিনয় করেন এবং বক্স অফিসে সাফল্য পান।
নিকেতনের উত্থান
এফডিসি যখন নির্বাচন আর পিকনিক নিয়ে ব্যস্ত, তখন নিকেতনে জেগে উঠছে সিনেমার নতুন ভূমি। আবাসিক এলাকা হলেও নিকেতনের ফ্ল্যাটে ফ্লাটে নির্মাতা, প্রযোজকদের অফিস, এডিটিং প্যানেল, সাউন্ড স্টুডিওতে নতুন নতুন সৃষ্টির আমেজ। নতুন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যেমন আলফা-আই, ভার্সেটাইল মিডিয়া, রিয়েল এনার্জি, বুড়িগঙ্গা টকিজ, সান মোশন পিকচার্স, অ্যাকশন কাট এন্টারটেইনমেন্ট—এরা এক বা দুটি ছবি প্রযোজনা করে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে।
২০২২ সালে 'পরাণ' ও 'হাওয়া' দিয়ে সূচনা হয় সিনেমার যুগবদলের। রায়হান রাফী ও মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণকৌশলে কাত হয় ঢালিউড। মাল্টিপ্লেক্সে আঘাত করে বাংলা ছবির নতুন ঢেউ। পরের বছর রায়হান রাফীর 'সুড়ঙ্গ' আর হিমেল আশরাফের 'প্রিয়তমা' সেই ঢেউকে পরিণত করে সুনামিতে। ইংরেজি সিনেমাকে হারিয়ে বাংলা সিনেমার জয়ধ্বনি ওঠে মাল্টিপ্লেক্সে। এরপর যোগ হয় 'তুফান', 'বরবাদ', 'উৎসব', 'তাণ্ডব', 'বনলতা এক্সপ্রেস'-এর মতো ছবি।
নতুন পুঁজির আগমন
চলচ্চিত্রে এখন প্রবাহিত হচ্ছে নতুন পুঁজি। পুরনো পুঁজি আর এখানে খাটছে না। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের মতো গুটিকয় প্রতিষ্ঠান এখনও কর্মক্ষম, কিন্তু বাজারের জন্য ছবি না বানিয়ে বছর-বছর নির্মাতা পয়দা করাই যেন এই সংস্থার উদ্দেশ্য। জাজ মাল্টিমিডিয়াও বিতর্কে জড়িয়ে আগের মতো সবল নেই। ফলে সিনেমা শিল্পের চাকা সচল রাখতে ভরসা করতে হচ্ছে নতুন জ্বালানির ওপর, যা সরবরাহ করছে নিকেতনের আনকোরা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
লেখক: সাংবাদিক, সমালোচক



