কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর ৮৬তম জন্মদিন উপলক্ষে চ্যানেল আইয়ের বিশেষ অনুষ্ঠান 'গল্প আছে এখানে...'তে নিজের জীবন ও সংগীতজীবনের নানা দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন শাইখ সিরাজ।
আগের তথ্যচিত্রের অভিজ্ঞতা
সৈয়দ আব্দুল হাদী জানান, এর আগে বাংলা ঢোল তার জীবন নিয়ে এক ঘণ্টার বেশি দৈর্ঘ্যের একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিল, যা তরুণ লেখক সাদাত হোসাইন বানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, 'আমার কাছে খুব ভালো লেগেছিল। লেখক মানুষ তো, সৃজনশীলতা ছিল। তার উপস্থাপন এবং নির্মাণটাও খুব সুন্দর ছিল। আর শাইখ সিরাজ তো টেলিভিশনের মানুষ, দীর্ঘ সময়ের কাজের অভিজ্ঞতা। এখনো এটি দেখিনি। আশা করি ভালোই হবে।'
আবেগাপ্লুত হওয়ার স্মৃতি
নিজের জীবনের গল্প পর্দায় দেখলে সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত করে পিতা-মাতার কথা ও শৈশবের স্মৃতি। তিনি বলেন, 'ছোটবেলার কথা, একেবারে শৈশবের কথা, আগরতলার দিনগুলোর কথা যখন মনে পড়ে, তখনো আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। সংগীতজীবনেরও অনেক ঘটনা আছে—আমি ভাগ্যবান যে এই সমস্ত ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত করে মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়। ভালোবাসার সঙ্গে শ্রদ্ধা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। যে ভালোবাসায় শ্রদ্ধা নেই, সে ভালোবাসা আমার কাছে অর্থহীন।'
গানের সংখ্যা ও শিল্পচেতনা
গানের সংখ্যা নিয়ে তিনি বলেন, 'একজীবনে আমার গাওয়া গানের সংখ্যা কত, এটার উত্তর আমি কখনোই দিই না। এমনও দেখি, কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে দেয়—১০ হাজার, ১২ হাজার বা ২০ হাজারের বেশি গান গেয়েছি। কিন্তু ১০ হাজার, ১২ হাজার বা ২০ হাজার গান চাট্টিখানি কথা না। আমি নিজেকে এতটা ভাগ্যবান মনে করি না। আমি নিজেকে বলি, আমার গাওয়া গান পাঁচ শও হতে পারে, পাঁচ হাজারও। তবে কোনো গান গাইবার সময় কখনোই কিছুই ভাবিনি। নিজের সাধ্যের মধ্যে শিল্পসম্মত করে গান গাইবার চেষ্টা করেছি।'
বর্তমান সময় কাটে কীভাবে
পেশাগত গানের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকলেও তিনি প্রতিদিনই গান গান। তিনি বলেন, 'মজার ব্যাপার হচ্ছে, পেশাদারভাবে গাই না বলে এখন প্রতিদিনই গান গাই। অর্থাৎ ভেতরে তো তৃষ্ণা রয়েছে গেছে, এই জীবনে তো এই তৃষ্ণা যাবে না। সেই শৈশবকাল থেকেই তো গানের সঙ্গে আমার প্রেম।' তিনি আরও জানান, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সুরের ধারণা তার মধ্যে আসে এবং সারাক্ষণ সুরের তোলপাড় হয়, যদিও উচ্চারিত হয় না।
সুরকার হিসেবে অভিজ্ঞতা
একসময় তিনি প্রচুর গানের সুর করেছেন এবং অনেক জনপ্রিয় গান তার সুরে হয়েছে। তিনি বলেন, 'ওই সব গানও কোনো পরিকল্পনা করে করিনি। আমি সুর করেছি মনের আনন্দে। সুরকার হিসেবে গান বানাতে হবে, সেটা ভেবে করিনি। আমার মন যখন বলেছে, তখনই সুর করেছি, গান বেঁধেছি।' সম্প্রতি তার মাথায় বনি এমের 'রাসপুটিন' গানটি ভর করেছে বলে জানান তিনি।
জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
সংগ্রামের দিনগুলো থেকে আজকের এই সময় পর্যন্ত যাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হিসেবে তিনি আব্দুল লতিফের একটি উপদেশের কথা স্মরণ করেন। আব্দুল লতিফ তাকে বলেছিলেন, 'দেখ, কোনো দিন খ্যাতির পেছনে ছুটবি না, একদিন দেখবি খ্যাতিই তোর পেছনে ছুটবে।' সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, 'কথাটা তখনই আমার মনে গেঁথেছিল। জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরিকল্পনা করে কিছু করিনি। স্বাভাবিকভাবে আমার কাছে যা এসেছে, সেটা সাদরে গ্রহণ করেছি। শিল্পী হিসেবে আমি গান গেয়ে গেছি—আমার সাধ্যমতো, ক্ষমতা অনুযায়ী সব সময় সেরাটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছি।'
তরুণ সৈয়দ আব্দুল হাদীকে পরামর্শ
যদি ২৫ বছরের তরুণ সৈয়দ আব্দুল হাদীর সঙ্গে দেখা হতো, তাহলে তাকে কী পরামর্শ দিতেন? তিনি বলেন, 'ওই যে বললাম, আমার জীবনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। উঠেপড়ে লাগা যেটা, সেটা করিনি। এটা আসলে এখন আমার মনে হয়, ভুল ছিল। মানুষের আকাঙ্ক্ষা থাকতে হয়। আকাঙ্ক্ষা ছাড়া মানুষের অর্জন হয় না। তাই জীবনের যত ভুল ছিল, সব সংশোধন করে নেওয়ার কথা বলতাম।'
ভুল নিয়ে আফসোস নেই
ভুল নিয়ে তিনি কোনো আফসোস করেন না। তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের লাইন উদ্ধৃত করে বলেন, 'ওগো, যা পেয়েছি/ সেইটুকুতেই খুশি আমার মন/ কেন একলা বসে হিসেবে কষে/ নিজেরে আর কাঁদাই অকারণ।' তিনি বলেন, 'তাই বলি, যা পেয়েছি এটাই বা কম কী। তাই কখনো আফসোস করি না।'
জীবনের অর্থ
জীবনের অর্থ সম্পর্কে তিনি শেক্সপিয়ারের একটি উক্তি উল্লেখ করেন, 'লাইফ ইজ আ টেল টোল্ড বাই অ্যান ইডিয়ট, ফুল অব সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরি, সিগনিফাইয়িং নাথিং।' তিনি মনে করেন, এটাই জীবনের আসল রূপ।



