জার্মানিতে তাপপ্রবাহ: পানিতে ডুবে ৩০ জনের বেশি মৃত্যু
জার্মানিতে তাপপ্রবাহে পানিতে ডুবে ৩০ জনের বেশি মৃত্যু

জার্মানিতে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে পানিতে ডুবে ৩০ জনের বেশি মারা গেছেন। তাঁদের বেশির ভাগই তাপপ্রবাহের মধ্যে নদী ও হ্রদে সাঁতার কাটতে যান; যদিও জার্মানিতে এ ধরনের ঘটনা বিরল। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই পুরুষ। রয়েছে কয়েকজন কিশোরও।

ডিএলআরজির তথ্যে ২৬ জনের মৃত্যু

জার্মানির জীবন রক্ষা সংস্থার (ডিএলআরজি) তথ্য অনুযায়ী, তাপপ্রবাহের মধ্যে প্রচণ্ড গরমে গত শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত গোসল বা সাঁতার কাটতে গিয়ে অন্তত ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার অন্তত সাতটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ার আগেই ডিএলআরজি বাসিন্দাদের সতর্ক করে প্রচণ্ড গরমে সাঁতার কাটা বা গোসল করতে যাওয়ার ঝুঁকিকে হালকাভাবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছিল।

কিশোরসহ নিখোঁজ ও মৃত্যু

গত রোববার সন্ধ্যায় নিডারজ্যাক্সেন রাজ্যের পাইনে শহরের আইক্সার হ্রদ থেকে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে শুক্রবার নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের ড্যুরেন জেলার এখৎস হ্রদে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর নৌকা থেকে পানিতে পড়ে নিখোঁজ হয়েছিল। রোববার তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিখোঁজদের হিসাবের বাইরে

ডিএলআরজির পরিসংখ্যানে শুধু পরিচয় জানা গেছে এমন ব্যক্তিদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাঁদের এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাঁদের এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে এলবে নদীতে এখনো এক সাঁতারু ও স্যাক্সনির পোহল জলাধারে এক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া বাডেন-ভুর্টেমবার্গ রাজ্যের কেল শহরের কাছে একটি খনির হ্রদে ২৮ বছর বয়সী এক যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোববার একাধিকবার পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার পর হঠাৎ তিনি তলিয়ে যান এবং আর ভেসে ওঠেননি। তাঁর একজন বন্ধু তাঁকে টেনে তুলে পানির ওপর ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করেও সফল হননি। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরাও তাঁকে খুঁজে পাননি। দুর্ঘটনাস্থলে হ্রদের গভীরতা ছিল ৩০ থেকে ৪০ মিটার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নেফেল হ্রদে আরেক নিখোঁজ

নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ার জুলপিশ শহরের নেফেল হ্রদে ৩৯ বছর বয়সী আরেকজন নিখোঁজ রয়েছেন। রোববার সন্ধ্যায় তীর থেকে প্রায় ১৫০ মিটার দূরে সাঁতার কাটার সময় বিপদে পড়েন তিনি। তখন সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, অন্য এক সাঁতারু তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলেও অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে উদ্ধারকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

অন্যান্য ঘটনা

কোলনের ফ্যুলিঙ্গার হ্রদে সোমবার পর্যন্ত ২১ বছর বয়সী এক সাঁতারু নিখোঁজ ছিলেন। ভেসেলল জেলায় ডুবে যাওয়া একটি রাবার বোটের আরোহীরও খোঁজ চলছিল। একই সময়ে বাল্টিক সাগরের শারবয়ৎস উপকূলের কাছে দূরপাল্লার এক সাঁতারু পানিতে তলিয়ে যান।

পুরুষদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা

জার্মানিতে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ সহ্য করতে না পেরে অনেকেই শরীর জুড়াতে জলাশয়ের সান্নিধ্য খুঁজছেন। এ বিষয়ে ডিএলআরজির সভাপতি উটে ফগ্ট বলেছেন, ‘আমরা বারবার দেখছি, বিশেষ করে পুরুষেরা নিজেদের সক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করেন এবং এমন ঝুঁকি নেন, যা সহজেই এড়ানো সম্ভব।’

তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও আবার বাড়বে

জার্মানির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, প্রায় চার দিন ধরে তীব্র তাপপ্রবাহের পর তাপমাত্রা কিছুটা কমে সাময়িক স্বস্তি মিলেছে। ১০ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত তাপমাত্রা আবার অনেকটা বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ইউরোপীয় আঞ্চলিক পরিচালক হান্স ক্লুগে বলেছেন, বর্তমান তাপপ্রবাহ আসলে ভবিষ্যতের জন্য একটি শিক্ষা মাত্র। টানা কয়েক দিনের চরম তাপপ্রবাহে ইউরোপ যেন পুড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা, এটি শুধু শুরু। সামনের গ্রীষ্মগুলো আরও কঠিন ও অসহনীয় হবে। অথচ ইউরোপের অনেক দেশ এখনো এর জন্য প্রস্তুত নয়।

তাপপ্রবাহ এখন বারবার ফিরে আসা সংকট

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কথায়, তাপপ্রবাহ এখন আর এককালীন কোনো চরম আবহাওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটি বারবার ফিরে আসা সংকটে পরিণত হয়েছে। আগের তুলনায় এটি এখন বেশি ঘন ঘন, আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। হান্স ক্লুগে বলেন, ‘ইউরোপের অর্ধেকের বেশি দেশের এখনো এ ধরনের তাপপ্রবাহ মোকাবিলার কোনো পরিকল্পনা নেই।’

প্রস্তুতির উদাহরণ

এ ধরনের পরিকল্পনার পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তা বহু প্রাণ বাঁচাতে পারে। কয়েকটি দেশ ও শহর এরই মধ্যে এ নিয়ে ভালো দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। বার্সেলোনা ৫০০টির বেশি স্থানে তাদের জলবায়ু-সুরক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রন্থাগার, পার্ক ও ফার্মেসি। প্যারিস ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার বিশেষ টেলিফোনব্যবস্থা চালু করেছে এবং তাপপ্রবাহের সময় মদ বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। ক্লুগে বলেন, ‘এসবই বাস্তবসম্মত এবং সহজে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপের কয়েকটি উদাহরণ। ইউরোপের প্রতিটি শহরেরই এ ধরনের প্রস্তুতি থাকা উচিত।’

ইউরোপে অতিরিক্ত মৃত্যু

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের সময় ইউরোপে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। গত রোববার ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশটিতে গত বুধবার থেকে অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, এসব অতিরিক্ত মৃত্যুর একটি বড় অংশই ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ। নিজ বাড়িতে মানুষের মৃত্যুর হার ৪০ শতাংশ বেড়েছে।