অলংকরণ: আরাফাত করিম
শরৎ শেষ হয়ে আসছে। বাতাসে হেমন্তের আগমনী বার্তা। উঠানের কোণে শিউলিগাছটার নিচে হলুদ বোঁটার সাদা ফুল জমে আছে। দেখতে ভীষণ ভালো লাগছে।
এখন ভোরে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস হয়ে গেছে। মনে হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটা রপ্ত হয়ে যায়। আজও উঠেছি। বাঁশবাগান থেকে ভেসে আসছে নাম না জানা হরেক পাখির ডাক। জানালার পাশে বসে চা খেতে খেতে হঠাৎ বহু বছরের পুরোনো একটা মুখ মনে পড়ে গেল— জয়ন্তী।
জীবনে প্রথম যে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর কেমন করে উঠেছিল, সে জয়ন্তী।
কামারহাট আমাদের গ্রাম। পদ্মা নদীর ধারে। বর্ষায় নদী ভরে যেত। কূল উপচে পানি আশপাশের গ্রামে ঢুকে পড়ত। শীতে আবার পাড়জুড়ে কাশফুলের মেলা বসত।
তখন কলেজে উঠেছি। আর জয়ন্তী পাশের উদয়পুর স্কুলে পড়ত।
প্রথম তার চোখে চোখ পড়েছিল সরস্বতীপূজার দিন। জয়ন্তীর পরনে ছিল সাদা-হলুদ তাঁতের শাড়ি। চুলগুলো খোঁপা করা, কপালে ছোট্ট টিপ। ওকে দেখে মনে হয়েছিল, গ্রামের মাটির রঙের মধ্যেও কেউ যেন আলাদা করে আলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমাদের আলাপ হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। ও বলেছিল, আপনি তো কবিতা লেখেন।
আমি লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম—না, তেমন কিছু না। লেখার চেষ্টা করি মাত্র।
ও হেসে বলেছিল—চেষ্টা করতে থাকেন। একদিন বড় কবি হবেন।
সেই শুরু।
কোনো কোনো দিন স্কুলের মাঠে, কোনো কোনো দিন নদীর পাড়ে দেখা হতো। কুশলাদি বিনিময়ের পরে লেখাপড়ার খোঁজখবর নিতাম। বই পড়তে ও খুব ভালোবাসত। বিশেষ করে বিভূতিভূষণ আর জীবনানন্দ। প্রায়ই বলত—একদিন শহরে গিয়ে বাংলা নিয়ে পড়ব। শিক্ষক হব।
তখন স্বপ্ন দেখতে শিখেছি। ভাবতাম, একদিন অনেক কবিতা লিখব। জয়ন্তী স্কুল থেকে ফিরে আমার লেখা পড়বে। বলবে—এখানে একটা লাইন বদলালে কেমন হয়; কিংবা মনের মতো কোনো শব্দ দিয়ে বলবে—এই শব্দটা ব্যবহার করা যায় কি না, ভেবে দেখো।
ওর মতো করে সংশোধন করে প্রথমে ওকে শোনাব। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখব ওর প্রতিক্রিয়া কেমন হয়। ও হবে আমার প্রথম পাঠক। প্রথম শ্রোতা। সেরা পরামর্শক।
একদিন ওদের বাড়িতে গেলাম। ওর মা মুড়ি আর নারকেল খেতে দিলেন। বাড়িটা সুন্দর। টিনের ঘর। চারপাশে টিনের বেড়া। উঠানে তুলসীগাছ। পাশেই একটা পেয়ারা আর লিচুগাছ। ঘরের পেছনে বড় বড় আমগাছ। ফেরার সময় জয়ন্তী আমাকে একটা বই দিল। ভেতরে ছোট্ট করে লেখা, ‘ফুল যদি গভীর বনেও ফোটে তার সুবাস লোকালয়ে ঠিকই ছড়িয়ে পড়ে। হয়তো দুই দিন আগে বা পরে।’ সবুজ কালি দিয়ে শেষ পাতায় লেখা ছিল, ‘ভালো লেখা মানুষকে একা থাকতে দেয় না।’
তারপর জীবন একটু বদলাতে শুরু করল।
ওকে নিয়ে একদিন পাশের গ্রামে ঘুরতে গেলাম। উদ্দেশ্য, বিলের জলে নৌকায় করে ঘোরা। একটা ডিঙি জোগাড় করে দুজন উঠলাম। অনেকক্ষণ ভেসে বেড়ালাম। ও কয়েকটা ঢ্যাপের ফুল তুলল। মেঘলা আকাশ। ঝিরিঝিরি বাতাস। দারুণ উপভোগ করছিলাম। ও একটা কবিতা শোনার আবদার করল। তাৎক্ষণিকভাবে বললাম, ‘এ হাতের সঙ্গে বাঁধলাম হাত, মমতার জাল দিয়ে/ জড়িয়ে রেখো সারাটি জীবন আদর সোহাগ নিয়ে।’
গ্রামে মানুষের চোখ থাকে বেশি। কথা আরও বেশি। বিশেষ করে ব্যাঙের ছাতার মতো মোড়ে মোড়ে গজিয়ে ওঠা চায়ের দোকানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু নিয়েই আলোচনা হয়। কার সঙ্গে কে কথা বলল, কার বাড়ি কে গেল—সব হিসাব রাখা হয়।
আরও পড়ুনযাওয়ার জায়গা নেই১২ জুন ২০২৬চৈত্রসংক্রান্তির সন্ন্যাসী নাচের দিন আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নাচ উপভোগ করছিলাম। টুকটাক কথা হচ্ছিল। ও বলল—বিকেলে পদ্মার চরে যাওয়ার খুব ইচ্ছা।
পরদিন বিকেলে আমরা চরে গিয়ে অনেকটা পথ হাঁটলাম। বালুমাটি। খোলা মাঠ। অবারিত বাতাস। পথের দুধারে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। স্বর্গীয় এক আবেশ।
কয়েক দিন পর এক সন্ধ্যায় বাজার থেকে ফেরার পথে জয়ন্তীর ছোট কাকা আমাদের একসঙ্গে দেখে ফেলল।
পরদিন বাড়িতে এসে আব্বাকে বলল—ছেলেমানুষ। বুঝিয়ে বলবেন। গ্রামে আমাদের একটা মানসম্মান আছে।
সেদিন আব্বার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিছু বলতে পারিনি।
তারপর ধীরে ধীরে জয়ন্তী দূরে সরে যেতে থাকল। দেখা খুব কম হতো। কথা আরও কম। চোখে কেমন একটা ভয়।
মাস তিনেক পরে শুনলাম, ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে সরকারি চাকুরে। শহরে থাকবে।
বিয়ের দিন আমি যাইনি। সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, শীতের কুয়াশার ভেতর কেউ যেন আমার অর্ধেকটা নিয়ে চলে যাচ্ছে।
তারপর বহু বছর কেটে গেছে।
আমি এখন গ্রামেরই একটা স্কুলে বাংলা পড়াই। কবিতা লিখি। মাঝেমধ্যে পত্রিকায় বের হয়। বইও হয়েছে কয়েকটা। মানুষ কবি বলে সম্মান করে।
মানুষ যত বড় হয়, শূন্যতা তত গভীরে বাসা বাঁধে।
গত সপ্তাহে রাজধানীতে স্কুলের স্কাউট নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রোগ্রাম ছিল। আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে আমি অংশগ্রহণ করলাম। প্রথম সারিতেই বসেছি। প্রধান অতিথির জন্য অপেক্ষা করছি।
কিছুক্ষণ পরে প্রধান অতিথি এলেন। গাড়ি থেকে নামলেন। মঞ্চে এসে বসতেই বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠল।
অনুষ্ঠান শেষে নিজেই এসে বলল—চিনতে পেরেছ?
আমি থমকে গেলাম।
জয়ন্তী!
চোখের কোণে বয়সের ছাপ, তবু সেই মায়া আছে।
অনেকক্ষণ কথা হলো। জানলাম, সংসার ছেলেমেয়ে সব আছে।
হঠাৎ বলল—তুমি কবি হয়েছ, শুনেছি। খুব ভালো লেগেছে।
আমি হেসে বললাম—তুমি তো বলেছিলে হব।
ও একটু চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—সব স্বপ্ন নিজের হয় না। কিছু স্বপ্নপূরণ দূর থেকে দেখলেও ভালো লাগে।
ফেরার সময় ও গাড়িতে উঠছিল। হঠাৎ ব্যাগ থেকে পুরোনো একটা বই বের করে দিল। অবাক হয়ে দেখলাম—সেই বই, যা একদিন ও আমাকে দিয়েছিল। ভেতরে নতুন করে লেখা—‘ভালো লেখা মানুষকে একা থাকতে দেয় না—এখনো বিশ্বাস করি।’
গাড়ি চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ পথের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
পরদিন ভোরে শিউলিগাছের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হলো, জীবনে সব চাওয়া পূরণ হয় না। কিছু মানুষ হারিয়ে যায়; কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া আলো হারায় না। হয়তো এটাই প্রথম ভালোবাসার সবচেয়ে বড় সত্য—যা কাছে না থাকলেও মানুষের ভেতর নরম হয়ে বেঁচে থাকে।
ঢাকা
বন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুন
গল্পবন্ধুসভা গল্প



