সিনেমার মূল তথ্য
সিনেমা: ‘ডিসক্লোজার ডে’
ধরন: সায়েন্স ফিকশন, থ্রিলার
পরিচালনা: স্টিভেন স্পিলবার্গ
অভিনয়: এমিলি ব্লান্ট, জশ ও’কনর, কলিন ফার্থ, কোলম্যান ডোমিঙ্গো
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট
ইউএফও ফাইল প্রকাশের সময়োপযোগীতা
‘ডিসক্লোজার ডে’র জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বিশাল এক উপকার করেছে। গত মাসেই তারা ইউএফও অথবা সরকারি ভাষায় ইউএপি-ফাইলের বড় একটি অংশ প্রকাশ করে। ঘটনাটি নিছক কাকতালীয় হলেও সময়টা ছিল একেবারে নিখুঁত। কারণ, স্টিভেন স্পিলবার্গের নতুন সিনেমার মূল বিষয়ই হলো মার্কিন সরকারের কাছে থাকা ভিনগ্রহের প্রাণীর উপস্থিতির প্রমাণ ফাঁস করার এক বিদ্রোহী প্রচেষ্টা!
তবে ফাইলগুলো ‘ডিসক্লোজার ডে’-কে যতটা সাহায্য করার কথা ছিল, ততটা করেনি। কারণ, ইউএপি ফাইলগুলোতে এমন অনেক কিছুই আছে, যা আমরা আগেও দেখেছি—২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত মার্কিন সামরিক নজরদারি ভিডিওতে আর কয়েক দশক ধরে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য অপেশাদার ইউএফও ফুটেজে।
স্পিলবার্গের এলিয়েন উত্তরাধিকার
১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় স্পিলবার্গের ‘ক্লোজ এনকাউন্টারস অব দ্য থার্ড কাইন্ড’। ‘জস’-এর মাত্র দুই বছর পর নির্মিত সেই ছবি স্পিলবার্গকে আক্ষরিক অর্থেই প্রধান ‘এলিয়েন’ নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। আজও যেসব মানুষ দাবি করেন তাঁরা এলিয়েন দেখেছেন কিংবা তথাকথিত তথ্যচিত্রে যেসব ভিনগ্রহবাসীর ছবি দেখা যায়; সেগুলোর চেহারা কমবেশি ক্লোজ এনকাউন্টারস-এর শেষের সেই এলিয়েনটির মতোই।
তখন স্পিলবার্গের কল্পনা পপ কালচারকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। কিন্তু এবার স্পিলবার্গ যেন নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে অনুসরণ করছেন—গত ৪৯ বছরে গড়ে ওঠা সেই সব পুরাণ, কিংবদন্তি এবং কখনো কখনো আজগুবি ধারণাকে, যেগুলো তৈরিতে তাঁর আগের ছবির ভূমিকা ছিল।
ছবির গল্প ও কাঠামো
‘ডিসক্লোজার ডে’তে এত কিছু ঘটছে যে ডেভিড কোপের চিত্রনাট্য কখনো কখনো খেই হারিয়ে ফেলে। কিন্তু প্রতিবারই স্পিলবার্গ, তাঁর অভিনয়শিল্পীদের দল ও দুর্দান্ত কারিগরি টিম ছবিটিকে আবারও দাঁড় করিয়ে দেন।
অন্য অনেক ছবিতে যা প্রথম অঙ্কের শেষ হতো, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় ‘ডিসক্লোজার ডে’। শুরুতেই দর্শককে খানিকটা দিশাহারা করে দিয়ে ছবিটি বাধ্য করে আরও মনোযোগী হতে। ড্যানিয়েল কেলনারকে (জশ ও’কনর) তাড়া করছে ওয়ারডেক্স নামের ‘মেন ইন ব্ল্যাক’-ধাঁচের এক গোপন সংস্থা। এর প্রধান কৌশলী নোয়া স্ক্যানলন (কলিন ফার্থ)। নোয়ার লোকেরা ড্যানিয়েলের প্রেমিকা জেনকে (ইভ হিউসন) জিম্মি করেছে। তারা জেনের বিনিময়ে ফেরত চায় এমন একটি বস্তু, যা ড্যানিয়েল তাদের কাছ থেকে চুরি করেছে।
কোপ ও স্পিলবার্গ ইচ্ছাকৃতভাবেই বাদ দিয়েছেন সেই অংশ, যা কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মূল আকর্ষণ ছিল—ভিনগ্রহের প্রাণীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। সিনেমায় আমরা সেই ঘটনার পরের পৃথিবীতে প্রবেশ করি। ড্যানিয়েল ইতিমধ্যে আবিষ্কার করেছে—ভিনগ্রহের প্রাণের অস্তিত্বই কেবল সত্য নয়, পৃথিবীতে এমন শক্তিশালী গোষ্ঠীও রয়েছে, যারা এই সত্যকে মানুষের কাছে গোপন রাখতে মরিয়া।
ড্যানিয়েল এখন ওয়ারডেক্স থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কাজ করছে। তাদের নেতা হুগো ওয়েকফিল্ড (কোলম্যান ডোমিঙ্গো)। পৃথিবীর সামনে সত্য প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। তাদের কাছে রয়েছে ভিনগ্রহের প্রাণীর সঙ্গে সাক্ষাতের ভিডিও, নির্মম জিজ্ঞাসাবাদের ফুটেজসহ নানা প্রমাণ। শুধু একটি সংকেতের অপেক্ষা। সংকেত পেলেই শুরু হবে পরিকল্পনার শেষ ধাপ—ভিনগ্রহের প্রাণীসংক্রান্ত সব রেকর্ড একযোগে সবার সামনে প্রকাশ। সেই দিনটির নামই ‘ডিসক্লোজার ডে’।
চারটি সমান্তরাল গল্প
সেই সংকেত আসে মার্গারেট ফেয়ারচাইল্ডকে (এমিলি ব্লান্ট) ঘিরে। কানসাস সিটির এই আবহাওয়া উপস্থাপক হঠাৎ করেই অবিশ্বাস্য সব ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। প্রেমিক জ্যাকসনের (ওয়ায়াট রাসেল) সঙ্গে হঠাৎ সাবলীল রুশ ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন; অচেনা মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের জীবনের গল্প পড়ে ফেলতে পারেন। এক পুলিশ কর্মকর্তা যখন তাঁকে থামান, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যান, লোকটির সেদিন সকালে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। পরে লাইভ সম্প্রচারে গিয়ে এমন এক ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন, যা মানুষের অবোধ্য। সেই ভাষা বোঝার ক্ষমতা শুধু ড্যানিয়েলের আছে।
‘ডিসক্লোজার ডে’ মূলত চারটি সমান্তরাল গল্পের ওপর এগোয়—ড্যানিয়েল, মার্গারেট, হুগো এবং নোয়া। শেষ পর্যন্ত এই চারটি গল্প এক জায়গায় এসে মিলে যায়। এটি মূলত দীর্ঘ চেজ সিনেমা। নোয়া এবং তার নামহীন সৈন্য দল মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে, যাতে ড্যানিয়েল ও মার্গারেট একত্র হয়ে হুগোর কাছে পৌঁছাতে না পারে।
কারিগরি দিক ও অভিনয়
এই গতি ধরে রাখতে আবারও দীর্ঘদিনের সহযোগী চিত্রগ্রাহক ইয়ানুশ কামিনস্কিকে পাশে পেয়েছেন স্পিলবার্গ। ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ ও ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’-এর জন্য অস্কারজয়ী এই চিত্রগ্রাহক এখানে অসাধারণ কাজ করেছেন। তাঁর চঞ্চল ক্যামেরাই যেন ছবির প্রধান জ্বালানি। এই সিনেমায় ক্যামেরা প্রায় সব সময়ই চলমান। কখনো চরিত্রদের ঘিরে ঘুরছে, কখনো প্রচলিত অ্যাকশনের ধারণা ভেঙে দিচ্ছে, আবার কখনো দর্শককে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থির করে তুলছে।
বিশেষ করে একটি খামারবাড়ির দিকে ড্যানিয়েলের এগিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ এক শট কিংবা গাড়ি ও ট্রেনের সংঘর্ষ ঘিরে নির্মিত দুর্দান্ত অ্যাকশন দৃশ্যটি মনে রাখার মতো। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জন উইলিয়ামসের আবহসংগীত, যা ছবির রোমাঞ্চ ও মানবিক আবেগকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যায়।
অভিনয়ের ক্ষেত্রেও ছবিটি শক্তিশালী। পার্শ্বচরিত্রে ইভ হিউসন ও ওয়ায়েট রাসেল দারুণ কাজ করেছেন। তবে ছবির প্রাণ চার কেন্দ্রীয় চরিত্র। জশ ও’কনর ও এমিলি ব্লান্ট তাঁদের চরিত্রে এমন অনিশ্চয়তা ও অস্বস্তির ছাপ রেখেছেন, যা তাঁদের প্রচলিত নায়ক থেকে আলাদা করে তোলে। বিশেষ করে এমিলি ব্লান্ট অসাধারণ। ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনের মুখপাত্র হয়ে ওঠা এবং একই সঙ্গে পুরো পৃথিবীর আবেগের বাহক হয়ে ওঠার ভেতরকার টানাপোড়েন তিনি অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
স্পিলবার্গের দ্বিধা
তবে সিনেমাটি স্পিলবার্গের আগের সব নির্মাণকে ছাড়াতে পারেনি। দেখতে দেখতে মনে হয়, স্পিলবার্গ নিজেই দ্বিধায় ভুগছেন। শুরুটা সেই তীক্ষ্ণ, আত্মবিশ্বাসী কিন্তু ছবিটি যত এগোতে থাকে, ততই স্পিলবার্গ-নস্টালজিয়া ভর করে। পুরোনো গ্রীষ্মকালীন ব্লকবাস্টারের স্মৃতি জাগানো ‘ডিসক্লোজার ডে’ সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নই কুয়াশাচ্ছন্ন। কোরিয়া থেকে আসা হুমকিটা আসলে কী? সেই ধাতব যন্ত্রটি কাজ করে কীভাবে? ছবির শেষ এক ঘণ্টা এতটাই শক্তিহীন হয়ে পড়ে যে মনে হয় স্পিলবার্গের সিনেমাগ্রাফির অনেক কিছু মনে থাকলেও ডিজক্লোজার ডে হয়তো থাকবে না।



