চট্টগ্রাম বন্ধুসভার ‘বর্ষার আবাহনে নব দিগন্ত’ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত
বর্ষার আবাহনে নব দিগন্ত: চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সাংস্কৃতিক আয়োজন

চলছে আষাঢ় মাস, প্রকৃতিজুড়ে বর্ষার আবাহন। ঋতুরাজ্যের এ জলছন্দকে স্বাগত জানাতে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা আয়োজন করেছে ‘বর্ষার আবাহনে নব দিগন্ত’ শিরোনামে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ৩ জুলাই বিকেলে জেলা শিল্পকলা একাডেমির আর্ট গ্যালারি মিলনায়তন বন্ধুদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে।

জাতীয় সংগীত ও স্বাগত বক্তব্য

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সমস্বরে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে। বন্ধু কামরান চৌধুরী ও সাজিয়া আফরিনের মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় শুরু হয় মূল আয়োজন। গান নিয়ে মঞ্চে হাজির হয় ছোট্ট বন্ধু সান্নিধ্যা কর্মকার, গেয়ে শোনায় ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ গানটি।

স্বাগত বক্তব্য দেন সহসভাপতি নুরুজ্জামান খান। এরপর ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’ গানের সঙ্গে চমৎকার দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন বন্ধু প্রান্তিকা ভৌমিক, অতন্দ্রিলা রিয়া ও তাজরিয়া রশিদ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গান, নাচ, কবিতা ও জাদু

শিপন কর্মকার গেয়ে শোনান ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ গানটি। শুভ দাশের লেখা কবিতা ‘মেঘ বলল’-এর দ্বৈত আবৃত্তি করেন ইষ্টি পাল ও তাফসিরুল ইসলাম। দর্শকদের ভিন্ন কিছু উপহার দিতে মঞ্চে জাদু পরিবেশন করেন বন্ধু ফয়সাল হাওলাদার।

এরপর অঙ্কিতা আচার্য্য পরিবেশন করেন গান ‘আজ বিকালের ডাকে’। ‘রুম ঝুম’ ও ‘বুলবুলি’ গানের রিমিক্সে দ্বৈত নৃত্য পরিবেশন করেন বন্ধু প্রান্তিকা ভৌমিক ও অতন্দ্রিলা রিয়া। সবশেষে অর্পিতা দেবী দোলার কণ্ঠে ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’ গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব।

‘অন্তর কথন’ পর্ব

দ্বিতীয় পর্বে ছিল উপদেষ্টাদের নিয়ে বিশেষ আয়োজন ‘অন্তর কথন’। এ পর্বে সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন সভাপতি রুমিলা বড়ুয়া। ফুলেল শুভেচ্ছার মাধ্যমে অভিবাদন জানানো হয় উপদেষ্টা বিশ্বজিৎ চৌধুরী, সঞ্জয় বিশ্বাস, শিহাব জিশান, তাহমিনা সানজিদা, জাকিয়া কবির, জসিম আহমেদ ও নাজিম উদ্দিনকে। আলোচনার শুরুতেই প্রয়াত উপদেষ্টা মিনহাজ হোসাইনকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুক্ত আলোচনায় উপস্থাপিকার প্রথম প্রশ্ন ছিল, বন্ধুসভা সমাজে কী প্রভাব ফেলছে? এর উত্তরে উপদেষ্টা বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘প্রথম আলোর প্রাণভোমরা হলো বন্ধুসভা; সেই প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এটি তরুণদের উজ্জীবিত করছে যাতে তারা সমাজ, দেশ ও নিজেদের উন্নতির জন্য কিছু করতে পারে। মাদকের বিরুদ্ধে ক্রমাগত কাজ করে গেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। অ্যাসিডদগ্ধদের পাশে দাঁড়ানোর যে পদক্ষেপ প্রথম আলো নিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করেছে বন্ধুসভা। বিভিন্ন দুর্যোগে, বিপদে–আপদে সবার আগে ছুটে গেছে বন্ধুসভা। সর্বোপুরি বন্ধুসভার সাফল্য অনেক এবং বহু বিস্তৃত।’

উদ্যোক্তা ও নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা

দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ‘আমাদের বন্ধুদের উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হতে কী পরামর্শ দেবেন?’ এর উত্তরে উপদেষ্টা জসিম আহমেদ বলেন, ‘রিস্ক বা ঝুঁকি নেওয়ার সাহস থাকতে হবে; একজন উদ্যোক্তা প্রতিনিয়ত ব্যর্থতার সম্মুখীন হন। তাই আগে নিজের সংস্থান নিশ্চিত করে, তারপর চিন্তা করতে হবে কর্মসংস্থানের। আপনি যা উপভোগ করেন, তা করুন; সেটা ব্যবসা হোক বা চাকরি বা অন্য কিছু। ভালো আইডিয়া ও মূলধনের পাশাপাশি ভালো ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। তাই ম্যানেজমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই যে বন্ধুসভা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, এর মাধ্যমে মূলত বন্ধুদের টিম লিড করা ও ব্যবস্থাপনার অনুশীলন করা যায়।’

তারপর উপস্থাপক রুমিলা বড়ুয়ার প্রশ্নের জবাবে সঞ্জয় বিশ্বাস বলেন, ‘সত্যি বলতে সহধর্মিণীর সঙ্গে বন্ধুসভা নিয়ে খুব কম কথা হয়। আমরা আমাদের ব্যস্ত জীবনে বন্ধুসভায় আসি একটু মন খুলে বাঁচতে এবং চাপের পেশাগত জীবনে শান্তির উদ্দেশ্যেই আসি। হয়তো সব অনুষ্ঠানে আসা হয় না; কিন্তু যখনই আসি, কিছু সুন্দর ইতিবাচক স্মৃতি নিয়ে যাই। আমি ও আমার পরিবার বন্ধুসভাকে সঙ্গে নিয়ে খুব আনন্দে আছি।’

বন্ধুসভার নেতৃত্ব ও নারীনেতৃত্ব

তারপর উপস্থাপক প্রশ্ন করেন, ‘এই যে এত বছর ধরে বন্ধুসভায় নেতৃত্ব দেওয়াকালীন বন্ধুদের এত বকাঝকা করলেন, ঝাড়ি দিলেন, বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?’ জবাবে শিহাব জিশান বলেন, ‘আমি যা–ই বলি, মূলত ভালোবাসা থেকেই বলি। একটা কাজ সম্পন্ন করার জন্য কিছু কিছু জায়গায় কঠোর হতে হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা সবাই একত্র হয়ে যাই সব মনোমালিন্য ভুলে। আমরা বিশ্বাস করি, বন্ধুসভা একটা পরিবার। পরিবারে আদর-ভালোবাসার সঙ্গে হালকা কঠোরতা থাকবেই; তবে এটা মোটেও অহংকার থেকে নয়। আমি জানি, আমার ছোট ভাইবোনেরা তা বোঝে, পরে আমার থেকে ট্রিটও আদায় করে নেয়।’

তারপর রুমিলা বড়ুয়ার প্রশ্ন ছিল, ‘নারীনেতৃত্ব তৈরি করতে কীভাবে বন্ধুসভা অবদান রাখছে?’ এর উত্তরে জাকিয়া কবির বলেন, ‘আমি এখন যে পর্যায়ে আছি, সেখানে বন্ধুসভার অবদান খুবই মূল্যবান। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত থাকলেও টিম হিসেবে কাজ করার মূল অভিজ্ঞতা পেয়েছি বন্ধুসভা থেকে। অনেকবার এমন হয়েছে যে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে ত্রাণ বিতরণের জন্য; কিন্তু আমার পরিবারের একটা ভরসার জায়গা ছিল বন্ধুসভা। তারা নিশ্চিত জানত যে মেয়ে হিসেবে যতক্ষণ বন্ধুসভায় আছি, আমি নিরাপদ। মূলত বন্ধুসভা একটা শেখার জায়গা, আনন্দের জায়গা। অনুরোধ, এই জায়গা আপনারা কখনো হারাবেন না। নিজের আগ্রহ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে।’

শিক্ষা ও উন্নয়নে বন্ধুসভা

ষষ্ঠ প্রশ্ন ছিল, ‘নেতৃত্বের জায়গা থেকে বন্ধুসভা কীভাবে কাজ করে?’ এর জবাবে তাহমিনা সানজিদা বলেন, ‘আমি বন্ধুসভায় ফরম পূরণ করি ২০১১ সালে। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত হই ২০১৪ থেকে এবং সেই যাত্রা আর থামেনি। প্রথমে সাধারণ বন্ধু থাকলেও কাজ করতে করতে ২০১৭ থেকে কমিটির বিভিন্ন পদে কাজ করতে শুরু করি। আমার শিক্ষকতা জীবনে অনেক বিষয় আমি বন্ধুসভা থেকে শিখেছি। ২০২০ সালে কোভিডের সময় প্রথম বন্ধুদের একত্র করার জন্য চট্টগ্রাম বন্ধুসভার পেজটা খুলি এবং ওই বছর আমি ২৭টি পাঠচক্র করি। তো এই যে সাহস করে কোনো কাজ করা, এগিয়ে যাওয়া, এটা আমি শিখেছি চট্টগ্রাম বন্ধুসভা থেকে। কীভাবে কোনো সাধারণ মানুষ সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উদ্যম নিয়ে দলনেতা হয়ে কাজ করতে পারেন, তা শিখিয়েছে বন্ধুসভা।’

উপস্থাপকের শেষ প্রশ্ন ছিল, ‘উপদেষ্টা হিসেবে বন্ধুসভায় যুক্ত হওয়ার জন্য যখন প্রস্তাব পেলেন, আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?’ জবাবে নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমান যান্ত্রিক সময়ে তরুণ প্রজন্ম এবং সব মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে বন্ধুসভা। নিজেকে উন্নত করার জন্যই যুক্ত হয়েছি বন্ধুসভায়। প্রথম আলো বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ, বাংলার সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বৃক্ষরোপণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। এখানে যুক্ত হতে পেরে আমার মনে হয়েছে, এটি বিরাট এক সুযোগ।’

সেরা বন্ধু পুরস্কার ও সমাপ্তি

উপদেষ্টাদের অন্তর কথন পর্ব শেষে চট্টগ্রাম বন্ধুসভার কার্যকরী কমিটি ২০২৬–এর পক্ষ থেকে উপদেষ্টাদের হাতে বিশেষ উপহার তুলে দেওয়া হয়। উপহার তুলে দেন সাধারণ সম্পাদক ইরফাতুর রহমান। এরপর ২০২৫ সালের সদ্য বিদায়ী কমিটির সদস্যদের হাতে সনদ তুলে দেওয়া হয় এবং ২০২৬ সালের কমিটিকে অভিবাদন জানানো হয়।

তারপর ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম চমক। বন্ধুদের অনবদ্য পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে সেরা বন্ধু পুরস্কার। মাসে দুজন করে জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত মোট ১২ জন নির্বাচিত বন্ধুকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন সাবেক সহসভাপতি আকতার উজ জামান। বিজয়ী বন্ধুরা হলেন জানুয়ারি মাসে জয় চক্রবর্ত্তী ও আশরাফ আরাবী, ফেব্রুয়ারি মাসে বহ্নি শিখা পর্ণা ও ওয়াসিম আকরাম, মার্চ মাসে সাকিব জিশান ও সাজিয়া আফরিন, এপ্রিল মাসে তাজরিয়া রশিদ ও মাহফুজ রহমান, মে মাসে কামরান চৌধুরী ও তাফসিরুল ইসলাম এবং জুন মাসে মারুফ উল হক ও শান্ত বড়ুয়া।

অনুষ্ঠান শেষে বন্ধুদের জন্য ছিল হালকা নাশতা ও চায়ের আয়োজন। বন্ধুদের সমবেত ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে সফল সমাপ্তি ঘটে ‘বর্ষার আবাহনে নব দিগন্ত’ আয়োজনের। এ অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী হিসেবে ছিলেন বন্ধু মাসুদ রানা, ফয়সাল হাওলাদার, জয় চক্রবর্ত্তী, ইনজামাম ইসলাম ও প্রান্তিকা ভৌমিক।