সত্যজিৎ রায়ের নানামাত্রিক সৃষ্টির আড়ালে এমন একটি পরিচয় প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায়, যা তার শিল্পীসত্তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। তিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত গ্রাফিক ডিজাইনার, ইলাস্ট্রেটর এবং টাইপোগ্রাফার। চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি হওয়ার অনেক আগে থেকেই তাঁর পেশাগত জীবনের শুরু হয়েছিল বাণিজ্যিক শিল্পের আঙিনায়। তার এই সৃজনশীল যাত্রাই পরবর্তীকালে তার চলচ্চিত্র নির্মাণের শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিল। বিখ্যাত গবেষক অ্যান্ড্রু রবিনসনের লেখা 'সত্যজিৎ রায়: দ্য ইনার আই' জীবনী গ্রন্থে বলেন, ক্যামেরার লেন্স ধরার আগে সত্যজিৎ রায়ের প্রধান হাতিয়ার ছিল তুলি এবং কালি।
বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও সিগনেট প্রেসের যুগ
১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা চলছে। তখন ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থা 'ডি. জে. কিমার'-এ জুনিয়র ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় তার কর্মজীবন শুরু করেন। প্রখ্যাত শিল্পী অন্নদা মুন্সীর অধীনে কাজ করার সময় তিনি দেশীয় লোকশিল্পের সঙ্গে ইউরোপীয় আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটাতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ডি. কে. গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত 'সিগনেট প্রেস' এর সঙ্গে যুক্ত হন। বলা যায়, বাংলা প্রকাশনা শিল্পে প্রচ্ছদ ও অলংকরণের ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় রীতিমতো এক নীরব বিপ্লব নিয়ে এসেছিলেন। তার আগে বাংলা বইয়ের মলাট ছিল অনেকটাই গতানুগতিক এবং একঘেয়ে। সিগনেট প্রেসের হয়ে তিনি জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন', জওহরলাল নেহরুর 'ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া' কিংবা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আম আঁটির ভেঁপু' বইগুলোর প্রচ্ছদ সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ডিজাইন করেন। বিশেষ করে 'আম আঁটির ভেঁপু'র অলংকরণ করার সময়ই তার মাথায় 'পথের পাঁচালী'র চরিত্রগুলো ভিজ্যুয়ালি আকার পেতে শুরু করে। বইয়ের মূল সুরটিকে একটিমাত্র শক্তিশালী ইমেজের মাধ্যমে মলাটে তুলে ধরার যে আধুনিক রীতি, তা বাংলা সাহিত্যে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে।
টাইপোগ্রাফিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
সত্যজিৎ রায় সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক যিনি আন্তর্জাতিক স্তরে ফন্ট বা টাইপফেস ডিজাইনের জন্যও পুরস্কৃত হয়েছেন। 'এআইজিএ আই অন ডিজাইন' (AIGA Eye on Design) এর মতো আন্তর্জাতিক ডিজাইন সাময়িকীতেও তাকে নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। ডিজাইনের প্রতি তার এই ঝোঁক কেবল বাংলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭০ সালে তিনি ইংরেজি ভাষার জন্য চারটি ভিন্নধর্মী এবং দৃষ্টিনন্দন ফন্ট ডিজাইন করেন। এই ফন্টগুলো হলো: রে রোমান (Ray Roman), রে বিজার (Ray Bizarre), ড্যাফনিস (Daphnis) এবং হলিডে স্ক্রিপ্ট (Holiday Script)। এর মধ্যে ১৯৭১ সালে তার তৈরি 'রে রোমান' ফন্টটি আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত 'টাইপ ডিরেক্টরস ক্লাব' থেকে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করে। একটি অক্ষর দেখতে কেমন হবে, তার বক্ররেখা কতটা তীক্ষ্ণ হবে এবং পড়ার সময় পাঠকের চোখে তা কতটা আরামদায়ক হবে, এই সবকিছু নিয়ে তার জ্যামিতিক ভাবনা ছিল বিশ্বমানের। টাইপোগ্রাফির ইতিহাসে তার এই অনবদ্য অবদান তাকে বৈশ্বিক ডিজাইনারে পরিণত করেছে।
'সন্দেশ' পত্রিকা
বাংলা হস্তলিপি বা ক্যালিগ্রাফিকে সত্যজিৎ রায় এক অনন্য শৈল্পিক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার এই প্রতিভার সবচেয়ে বড় ক্যানভাস ছিল 'সন্দেশ' পত্রিকা। ১৯৬১ সালে তিনি যখন তার পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী কিশোর পত্রিকা পুনরায় চালু করেন, তখন থেকে পত্রিকার প্রচ্ছদ ও ভেতরের অলংকরণের মূল দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধেই তুলে নেন। সন্দেশ পত্রিকার পুরোনো সংখ্যাগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রতিটি উৎসব, ঋতু বা বিশেষ সংখ্যার মেজাজ অনুযায়ী 'সন্দেশ' লেখাটির ক্যালিগ্রাফিক শৈলী বদলে যেত। কখনো অক্ষরগুলো যেন মানুষের মতো হাসছে, কখনো ভৌতিক রূপ নিচ্ছে, আবার কখনো বাংলার চিরচেনা লোকজ মোটিফে সেজে উঠছে। পাশাপাশি তার সিনেমার টাইটেল কার্ডগুলোতেও ক্যালিগ্রাফির অসাধারণ প্রয়োগ দেখা যায়। 'গুপি গাইন বাঘা বাইন' ছবির 'ভূতের রাজা দিল বর' গানের দৃশ্যে পর্দায় ফুটে ওঠা একেকটি অক্ষর যেন নিজেরাই একেকটি জীবন্ত চরিত্র হয়ে দর্শকদের সাথে কথা বলে।
সিনেমার পোস্টারে রঙ, রেখা ও কল্পনা
বর্তমান সময়ে সিনেমার পোস্টার মানেই হলো নায়ক-নায়িকাদের বিশাল মাপের ছবি আর প্রযুক্তির চাকচিক্য। কিন্তু সত্যজিৎ রায় তার সিনেমার পোস্টারগুলো নিজ হাতে নিখুঁতভাবে যত্ন নিয়ে ডিজাইন করতেন। সেখানে ফটোগ্রাফির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেত ইলাস্ট্রেশন বা রেখাচিত্র এবং তার নিজের হাতে লেখা মানানসই টাইপোগ্রাফি। 'সত্যজিৎ রায় ডট অর্গ' এর আর্কাইভে সংরক্ষিত তার কাজগুলো দেখলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তিনি কীভাবে সিনেমার মূল মনস্তাত্ত্বিক থিমটিকে একটিমাত্র পোস্টারে ফুটিয়ে তুলতেন। তার 'দেবী' সিনেমার পোস্টারটির কথা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়। পোস্টারটিতে অর্ধেক দেবীমূর্তি এবং অর্ধেক মানবীমুখের যে ইলাস্ট্রেশন তিনি করেছিলেন, তা পুরো সিনেমার মূল দ্বন্দ্বকে এক পলকে বুঝিয়ে দেয়। একইভাবে 'চারুলতা', 'নায়ক' বা 'মহানগর' সিনেমার পোস্টারগুলো একেকটি স্বাধীন শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। ডি. জে. কিমার এ কাজ করার সময় তিনি যে স্টোরিবোর্ড বা দৃশ্যপট তৈরি করা শিখেছিলেন, তা তিনি নিজের সিনেমাতে নিপুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। শ্যুটিংয়ে যাওয়ার আগেই পুরো সিনেমার দৃশ্যপট তিনি খাতায় স্কেচ করে নিতেন। তার সিনেমার ফ্রেমগুলো যে এত নিখুঁত ছবির মতো দেখতে হতো, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এই গ্রাফিক ডিজাইনার সত্তাটির। আজকের দিনে যখন আমরা গ্রাফিক ডিজাইন, ইলাস্ট্রেশন বা ক্যালিগ্রাফি নিয়ে কথা বলি, তখন কম্পিউটার বা ডিজিটাল টুলসের সাহায্য ছাড়া এসব প্রায় ভাবাই যায় না। কিন্তু সত্যজিৎ রায় শুধু সাধারণ কলম, তুলি, কালি আর কাগজের সাহায্যে যে জাদুকরী নান্দনিকতার জন্ম দিয়েছিলেন, তা আজও যেকোনো আধুনিক ডিজাইনারের কাছে পরম বিস্ময়কর।
জন্মদিনে এই কালজয়ী স্রষ্টার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। সত্যজিৎ রায় কেবল সেলুলয়েডের জাদুকর ছিলেন না, তিনি ছিলেন আদ্যোপান্ত এক পরিপূর্ণ শিল্পী, যার ভাবনার ক্যানভাসের প্রতিটি রেখা ও অক্ষরের মাঝে লুকিয়ে ছিল নিখুঁত সৌন্দর্যের অনুসন্ধান।



