তানিম নূরের ‘উৎসব’ এবং ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যনির্ভর চিত্রনাট্যের অনন্য সংযোজন। এই সাফল্যের নেপথ্যের কারিগরদের মধ্যে অন্যতম চিত্রনাট্যকার সামিউল ভূঁইয়া। উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার অভিজ্ঞতা ও ভাবনা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন হেমায়েত উল্লাহ ইমন।
চিত্রনাট্য লেখার শুরু কীভাবে?
সামিউল ভূঁইয়া বলেন, ছোটোবেলা থেকেই লেখালেখি তার নেশা। স্কুল জীবন থেকে ব্যক্তিগত ব্লগে ছোটোগল্প ও ইতিহাস, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব নিয়ে আর্টিকেল লিখতেন। তবে চিত্রনাট্য লেখার শুরুটা কাকতালীয়। ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পরিবার সরকারি চাকরি বা ব্যাংকিং ক্যারিয়ার চাইলেও মন সায় দেয়নি। একটি টেক কোম্পানিতে কিছুদিন চাকরি করে ছেড়ে দেন। প্রায় পাঁচ মাস শিক্ষিত বেকার থাকেন, কিন্তু লেখার নেশা ছাড়েননি। একদিন বন্ধু মোন্তাসির কল করে জানান, একজন পরিচালক নতুন লেখক খুঁজছেন। পরিচালক আবু শাহেদ ইমনের সঙ্গে দেখা করে তার আইডিয়া শেয়ার করেন। এক সপ্তাহে গল্পের গঠন দাঁড় করান, যা দেখে পরিচালক মুগ্ধ হন। ছয় মাস লিখে তৈরি করেন ওয়েব সিরিজ ‘মারকিউলিস’। সিরিজটি দর্শকের মনে জায়গা করতে না পারলেও নিজের লেখা পর্দায় দেখে অদ্ভুত তৃপ্তি পান। সেদিন বুঝতে পারেন, এটাই তার স্বপ্ন।
অর্থনীতি থেকে বড়পর্দায় ট্রানজিশন
সামিউল বলেন, সাহিত্য-সিনেমার পোকা ছিলেন বাচ্চাকাল থেকেই। নানাবাড়িতে প্রতি শুক্রবার দুপুরে টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখা, পরে ভিসিআর, সিডি, ডিভিডি ও ইন্টারনেটে সিনেমা দেখা। বংশে কেউ বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও নানার লেখালেখি দেখে অনুপ্রাণিত হন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সুযোগ তার জীবন বদলে দেয়। আনু মুহাম্মদ স্যার ও আসরার চৌধুরী স্যার ছিলেন প্রিয় শিক্ষক। নবীনবরণের দিন ডিপার্টমেন্ট চেয়ারম্যান স্যারের কথা—‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুমি সংস্কৃতিমনা, সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ হতে পারো’—মনে গেঁথে যায়। ক্লাস শেষে প্রকৃতি চষে বেড়াতেন, বন্ধুদের সঙ্গে সারা বাংলাদেশ ঘুরেছেন। ভ্রমণ ও বন্ধুরা তাকে পৃথিবী চিনিয়েছে, মানসিকতা বদলে দিয়েছে। পড়াশোনা শেষে লেখক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে জেদ ধরে নামেন। ভয় ও সংশয় ছিল, কিন্তু বড় ভাই শাম্সের আস্থা ও সমর্থন তাকে চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
‘উৎসব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ সিনেম্যাটিক কৌশল
সামিউল বলেন, দুই সিনেমায় নতুন ন্যারেটিভ স্টাইল তৈরি করেছেন। সাহিত্য শব্দের মাধ্যমে চরিত্রের ভেতরের জগৎ খুলে দেয়, কিন্তু সিনেমায় দৃশ্য, শব্দ ও নীরবতা দিয়ে বোঝাতে হয়। ‘উৎসব’-এ চরিত্রের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন দেখাতে ভিজ্যুয়াল কনট্রাস্ট ব্যবহার করেছেন—আলো-আঁধারি, ফ্রেমে একাকিত্ব, সময়ের পরিবর্তনে ট্রানজিশন। অতীত প্রেক্ষাপটে ন্যারেশন বা ভয়েস ওভার ব্যবহার করেছেন। চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে পরিবেশ মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ সময় ও স্মৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ন্যারেটিভ লিনিয়ার না রেখে ভাঙা কাঠামোয় রাখা হয়েছে, যাতে দর্শক টুকরো টুকরো অংশ জোড়া দিয়ে গল্প অনুভব করে। ট্রেন যাত্রা বাহ্যিক ভ্রমণের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা। দুই কাজেই সংলাপ ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের ভারসাম্য রেখেছেন—ভালো সিনেমা সব কিছু বলে না, কিছু জায়গা ফাঁকা রাখে।
হুমায়ূন আহমেদের উইট ও হিউমারের ভারসাম্য
হুমায়ূন আহমেদের উইট ও হিউমার খুব সূক্ষ্ম। সামিউল বলেন, স্ক্রিপ্টে এই টোন ধরে রাখতে তার লেখার ‘সরলতা’ বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। সংলাপ কখনো অতিরিক্ত চটকদার বা নাটকীয় করেননি; দৈনন্দিন কথোপকথনের ভেতরেই হিউমার খুঁজেছেন। ‘পজ’ বা নীরবতার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ—অপ্রত্যাশিত বিরতি বা চরিত্রের রিঅ্যাকশন হাস্যরস তৈরি করে। চরিত্র নির্মাণে গুরুত্ব দিয়েছেন—প্রতিটি চরিত্রের নিজস্ব ছন্দ, আচরণ ও কথা বলার ধরন মিলিয়ে হিউমার তৈরি হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ওভার এক্সপ্লেইন’ এড়িয়ে গেছেন, যাতে দর্শক নিজে বুঝে নেয়।
চরিত্রে পরিবর্তনের কারণ
সামিউল বলেন, চরিত্রে পরিবর্তন একাধিক বাস্তব ও সৃজনশীল প্রয়োজনের সমন্বয়। সাহিত্য থেকে সিনেমায় রূপান্তরের সময় গল্প বলার ভাষা বদলে যায়—লিখে বোঝানো জিনিস পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করতে চরিত্রে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়। সিনেমা ভিজ্যুয়াল ও সময়সীমাবদ্ধ মাধ্যম, তাই ন্যারেটিভকে সংক্ষিপ্ত ও গতিশীল রাখতে কিছু চরিত্র সরল করা বা বৈশিষ্ট্য কমানো-বাড়ানো হয়েছে। সেন্সর বা নির্দিষ্ট দর্শকের বিষয়ও এড়ানো যায় না। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় সৃজনশীল প্রয়োজন—গল্পের আবেগ, থিম ও চরিত্রের যাত্রা আরও স্পষ্ট ও প্রভাবশালী করতে পরিবর্তন। উদাহরণ হিসেবে, ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসের মওলানা চরিত্র বদলে আজিজ নামের একজন সাধারণ রক্ষণশীল ব্যক্তি করা হয়েছে। কারণ, শুধু ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা মানুষই রক্ষণশীল নয়—রক্ষণশীলতা সমাজের সব শ্রেণি-পেশায় আছে। বড় পর্দায় বিষয়টিকে ইউনিভার্সাল রূপ দিতে মওলানা চরিত্র বদলানো হয়।
মূল টেক্সটের প্রতি বিশ্বস্ততা ও সৃজনশীল স্বাধীনতা
সামিউলের কাছে ‘বিশ্বস্ততা’ মানে হুবহু ঘটনাক্রম বা সংলাপ ধরে রাখা নয়, বরং মূল টেক্সটের আবেগ, থিম ও চরিত্রের আত্মা অক্ষুণ্ন রাখা। সিনেমা আলাদা মাধ্যম, তাই চিত্রনাট্যে প্রয়োজনে সৃজনশীল স্বাধীনতা নিয়েছেন—ন্যারেটিভের গতি ঠিক রাখা, দৃশ্যমানতা বাড়ানো, চরিত্রের আর্ক পরিষ্কার করা। পরিবর্তনগুলো যেন মূল গল্পের উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত না করে, বরং শক্তিশালী করে। দর্শক যেন গল্প নতুনভাবে অনুভব করতে পারে, কিন্তু ভেতরের সত্তা একই থাকে। তিনি মনে করেন, বিশ্বস্ততা ও সৃজনশীলতার মধ্যে ব্যালান্স তৈরি করতে পেরেছেন—গল্পের আত্মা রেখে সিনেমার ভাষায় নতুন করে বলা হয়েছে।
ক্রিয়েটিভ বোঝাপড়া (আয়মান আসিব স্বাধীন)
সামিউল ও স্বাধীন দুজনই চিন্তার দিক থেকে এক ঘরানার মানুষ, চলচ্চিত্র দর্শন কাছাকাছি। শুরু থেকেই গল্পের প্রতি সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন, ইগো বাইরে রাখার অঘোষিত নিয়ম ছিল। আইডিয়া নিয়ে দ্বিমত খুব কম হয়েছে; যেখানে হয়েছে, যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে গল্পের জন্য ভালো সেটাই গ্রহণ করেছেন। ‘ওপেন কমিউনিকেশন’ গুরুত্বপূর্ণ ছিল—একে অপরের লেখা খোলামেলাভাবে ক্রিটিক করেছেন, প্রয়োজনে আইডিয়া ডেভেলপ করেছেন। পারস্পরিক আস্থা থেকে বোঝাপড়া শক্ত হয়েছে।
পরিচালক তানিম নূরের সঙ্গে কাজ
তানিম নূরের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা চমৎকার। তিনি স্ক্রিপ্টের সম্ভাবনা বুঝতে পারেন, লম্বা সময় আলোচনা করেন, দৃশ্যের ভিজ্যুয়াল কল্পনা করেন এবং স্বাধীনতা দেন। ‘উৎসব’ লেখার সময় একটি সিন সামিউলের ভালো লাগছিল না, তিনি ডিলিট করে দেন। কিন্তু স্বাধীন সেটা খুঁজে বের করে ফাইনাল ড্রাফটে জুড়ে দেয়; সিনেমা মুক্তির পর সেই সিনটাই সবার খুব ভালো লেগেছে। চ্যালেঞ্জিং দিক ছিল সময়সীমা—ডেডলাইনের মধ্যে কোয়ালিটি ধরে রাখা কঠিন, কিন্তু সেই চাপ ফোকাসড হতে সাহায্য করেছে। পারস্পরিক সম্মান, খোলামেলা আলোচনা ও গল্পকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা—এই তিন জিনিস ক্রিয়েটিভ বোঝাপড়ার ভিত্তি।
অ্যাডাপ্টেশনে প্রিয় অংশ বাদ দেওয়া
হ্যাঁ, কিছু মুহূর্ত সাহিত্যিকভাবে শক্তিশালী ছিল, কিন্তু পর্দায় একই ইমপ্যাক্ট তৈরি করছিল না বা ন্যারেটিভের গতি ধীর করে দিচ্ছিল। সিনেমার সময় সীমাবদ্ধতার কারণে প্রিয় অংশগুলো বাদ দিতে হয়েছে গল্পকে টাইট ও ফোকাসড রাখতে। সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না, কারণ লেখক হিসেবে ওই দৃশ্যের সঙ্গে আবেগ তৈরি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনে করাতে হয়েছে—এটা ব্যক্তিগত ভালো লাগার জায়গা না, পুরো গল্পের স্বার্থের প্রশ্ন। যেটা গল্পকে এগিয়ে নেয় না, তাকে ছেড়ে দিতেই হয়। কঠিন হলেও প্রয়োজনীয়—ভালো সিনেমা বানাতে কখনো নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে হয়।
বর্তমান কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমানে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে শাকিব খানের ‘রকস্টার’ সিনেমার সংলাপ লিখছেন। তানিম নূরের সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন কিছু প্রজেক্টের প্রস্তাব এসেছে; তিনি নিজেকে নির্দিষ্ট জনরায় সীমাবদ্ধ রাখতে চান না—ভালো গল্প, দক্ষ পরিচালক ও শক্ত টিম পেলেই কাজ করতে আগ্রহী। সিনেমার পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ লেখায় মনোযোগ দিচ্ছেন। তবে সংখ্যার চেয়ে গুণগত মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ—কম কাজ করলেও ভালো কাজ করতে চান।
ড্রিম প্রজেক্ট
শুরুটা ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছিল। কিন্তু কাজ করতে করতেই বড় পর্দার জগতে ঢুকে পড়েছেন। উপন্যাস লেখার ইচ্ছা এখনো আছে—এই বছরই সেই কাজে হাত দিতে চান। ব্যক্তিগতভাবে আগামী তিন বছর সিনেমা লেখা ও ফিল্মমেকিংয়ের প্রতিটি ধাপ শিখতে চান। এই সময়কে প্রস্তুতির সময় হিসেবে দেখছেন। এরপর নিজেকে যথেষ্ট প্রস্তুত মনে হলে পরিচালনায় আসার ইচ্ছা আছে, না হলে লেখালেখিই চালিয়ে যাবেন। নিজের লেখা একটি ড্রামা জনরার মৌলিক গল্প আছে, যাকে একদিন বড় পর্দায় রূপ দিতে চান। এখন শেখা ও লেখার সময়—ভবিষ্যতে সুযোগ ও প্রস্তুতি মিললে পরিচালনায় আসা, আর নিজের গল্পকে পর্দায় দেখা—এইটাই ড্রিম।



