অরহান পামুকের সাক্ষাৎকার: মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স ও সাহিত্যের রাজনীতি
মূল সাক্ষাৎকারটি লুইজিয়ানা মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের প্রযোজনায় লুইজিয়ানা ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৬ সালে প্রকাশিত হয়। এতে অরহান পামুক তাঁর উপন্যাস ‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ এবং উপন্যাসটিকে কেন্দ্র করে ইস্তাম্বুলে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘর নিয়ে কথা বলেছেন।
‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ একই সঙ্গে একটি উপন্যাস এবং একটি জাদুঘর। দুটিই আমার সৃষ্টি। উপন্যাসটি এমন এক ব্যক্তির গল্প বলে যে তার দূর-সম্পর্কের এক চাচাতো বোনকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। কিন্তু গল্পটির সমাপ্তি সুখের হয় না। তাই সে তার ভালোবাসার মানুষটি যেসব জিনিস স্পর্শ করেছে, যেসব বস্তু তাকে প্রিয়সীর কথা মনে করিয়ে দেয় এবং তাদের সুখের সময়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুই সে সংগ্রহ করতে শুরু করে। পরে সে নারী একদিন হারিয়ে যায়। ৩৫ বছর ধরে সংগ্রহ করা সমস্ত বস্তুই সে একটি জাদুঘরে সংরক্ষণ করে।
জাদুঘরের বাস্তবতা ও উপন্যাসের সম্পর্ক
মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স একটি বাস্তব জাদুঘর। আমি এটি ইস্তাম্বুলে প্রতিষ্ঠা করি। ২০১১ সালে এর উদ্বোধন হয়। আসলে, উপন্যাসটির প্রকাশের দিনই আমার মনে জাদুঘর তৈরির ধারণাটি আসে। উপন্যাস ও জাদুঘরের সম্পর্কটা ঠিক কেমন হবে, তা নিয়ে আমার ভাবনা ছিল—উপন্যাসটি জাদুঘরের এক ধরনের ব্যাখ্যাসমৃদ্ধ ক্যাটালগ হিসেবে কাজ করবে। সেই ব্যাখ্যাগুলো কালক্রমে সাজানো থাকবে, যাতে পাঠক একই সঙ্গে উপন্যাস হিসেবেও একে উপভোগ করতে পারেন।
জীবনে যেমন হয়, আমিও আমার স্বাভাবিক ধীরগতিতে উপন্যাসটি লিখেছি। আমার কাছে পর্যাপ্ত সংগ্রহ প্রস্তুত ছিল। তার প্রিয় মানুষটির কথা মনে করিয়ে দেয় এমন সবকিছুই আমার কাছে ছিল। কিন্তু কাঠমিস্ত্রি সময়মতো আসে না, রংমিস্ত্রি দেরি করে। ফলে জাদুঘরটি খুলতে আরও চার বছর সময় লেগে যায়।
ঘটনাটিকে এমন ভাবার সুযোগ নেই যে আমি প্রথমে একটি সফল উপন্যাস লিখেছি এবং পরে জাদুঘর খুলেছি। আমার মাথায় পুরো প্রকল্পটিকে একসঙ্গে কাজ করছিল। উপন্যাস ও জাদুঘর কখনোই একে অপরের গল্প করবে না, উভয়ই বস্তু ও বর্ণনার মাধ্যমে একটা গল্পই বলবে। এই ধারণা জাদুঘর বাস্তবায়নের প্রায় বিশ বছর আগে থেকেই আমার মাথায় ছিল।
জাদুঘরের অর্থায়ন ও জনপ্রিয়তা
প্রতিষ্ঠার বারো বছরের মধ্যে আমি গত দশ বছর ধরে এতে কোনো অর্থ ঢালছি না। কোনো সরকার, প্রতিষ্ঠান বা ফাউন্ডেশন আমাদের অর্থ দেয় না। জাদুঘরটি শুধু টিকিট বিক্রির টাকায় পরিচালিত হয়। এতে আমি খুব খুশি। ভবিষ্যতে কী হবে দেখা যাবে। আশা করি এভাবেই চলবে। জাদুঘরটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সম্ভবত এই খ্যাতির কারণেই আমাকে জাদুঘরটির একটি ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী আয়োজনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। জাদুঘরটিতে ৮২টি প্রদর্শনী উইন্ড্রো বা শিল্পকর্ম রয়েছে। প্রতিটি উইন্ড্রো বইয়ের একটি অধ্যায়কে প্রতিনিধিত্ব করে। উপন্যাসের চরিত্ররা যেসব বস্তু ব্যবহার করে বা যেগুলোর কথা বলে, সেগুলো সেই প্রদর্শনী উইন্ড্রোগুলোতে রাখা আছে।
এই প্রদর্শনী উইন্ড্রোগুলোর মধ্যে ৪০টি ২০২৩ সালে ড্রেসডেনের আল্টে মাইস্টার গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়। এরপর এই প্রদর্শনী মিউনিখের লেনবাখহাউসে যাবে, তারপর প্রাগে যাবে। সম্ভবত প্যারিসের পিকাসো মিউজিয়ামেও যাবে। সেই বিষয়ে আলোচনা অনেকদূর এগিয়েছে।
লেখকজীবনের শুরু ও রাজনীতির প্রভাব
পঞ্চাশ বছর আগে যখন উপন্যাসটি লেখা শুরু করি, তখন লক্ষ্য ছিল একজন পুরোনো ধাঁচের রোমান্টিক ঔপন্যাসিক হওয়া। কখনো রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাইনি। নিজস্ব মেজাজ ও কল্পনাকে অনুসরণ করতে চেয়েছিলাম।
একান্ন বছর আগে ভেবেছিলাম, লে করবুসিয়ের মতো একজন স্থপতি এবং চিত্রশিল্পী হব। তিনিই ছিলেন আমার জীবনের আদর্শ। কিন্তু হঠাৎ করেই স্থাপত্য পড়া ও ছবি আঁকা ছেড়ে দিই। এমনকি মনে হয়েছিল, আমার ভেতরের চিত্রশিল্পীটিকে আমি মেরে ফেলেছি। তারপর একজন রোমান্টিক চিত্রশিল্পীর উৎসাহ নিয়ে উপন্যাস লেখা শুরু করি।
আমার লেখকজীবনের প্রথম বিশ বছর শুধু লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। শুরুতে কেবল তুর্কি পাঠকদের জন্য লিখতাম। কিন্তু পঁচিশ বছর লেখালেখির পর হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে উঠি। তখন আমার রোমান্টিক কল্পনা ও স্বপ্নের জগৎ তুরস্কের কঠোর রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাহত হয়।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ার পর সবাই আমাকে তুরস্কের রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করতে বলত। এতে ব্যাপক সমস্যায় পড়ি। আদালত পর্যন্ত যেতে হয়েছে। এখনো দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করি। আমি কি এসবের জন্য অনুতপ্ত? অন্যদের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকার জন্য দিনশেষে কি কেউ অনুতপ্ত হয়? এসব এক ধরনের নৈতিক চাপও বটে। দুর্ভাগ্যবশত, এই দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলতে হয়।
তবে আরও যুক্তিসংগত প্রশ্ন হলো, এসব কি আমার লেখার ধরন বদলে দিয়েছে? পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি কি বদলেছে? গল্প বলার পদ্ধতি কি বদলেছে?
আসলে আমার উপন্যাস ‘স্নো’ সেসব প্রশ্নেরই উত্তর। আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ার পর যখন সবাই রাজনৈতিক প্রশ্ন করতে শুরু করল, নিজেকে বললাম, “আমি কেন একটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখি না?” সাংবাদিকদের সব রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর হয়তো তাতে দেওয়া যাবে।
লেখার আগেই এসব কথা ভেবেছিলাম। উপন্যাসটি কিছু সময়ের জন্য আমার সবচেয়ে বিখ্যাত বই হয়ে ওঠে। দুর্ভাগ্যবশত, এর ফলে মানুষ আমাকে একজন রাজনৈতিক লেখক হিসেবে দেখতে শুরু করে।
‘নাইটস অফ প্লেগ’ও আংশিকভাবে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। বইটি শেষ করার পর নিজেকে বলেছিলাম, আর কখনো রাজনৈতিক উপন্যাস লিখব না। কিন্তু আবারও সাংবাদিকেরা মনে করলেন, আমি এসব কারণে অনেক কষ্ট পেয়েছি।
আসলে কষ্টের বিষয় নয়। কষ্ট পাইনি। অনেক মানুষ কষ্ট পায়। কারাগারে যায়। তুরস্কে আমার সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে তুলনা করলে আমার সমস্যাগুলো খুবই ছোট।
‘নাইটস অফ প্লেগ’-এ আমি আবার রাজনীতিতে ফিরে এসেছি। তবে তুরস্কের চলমান রাজনীতি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করার বদলে এতে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে আমার ভাবনাগুলো লিখতে চেয়েছিলাম।
উপন্যাসটি জাতীয়তাবাদ ধারণার একপ্রকার বিশ্বকোষীয় বিশ্লেষণ। সেখানে একটি কাল্পনিক ছোট ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ সৃষ্টি করেছি। দ্বীপটির নিজস্ব অদ্ভুত ভাষা রয়েছে। সেই ভাষার ভিত্তিতেই এর জাতীয় পরিচয় এবং জাতিসত্তার ধারণা গড়ে উঠেছে। আমরা সময় ও বস্তুর কথা বলছি। এই দুটি শব্দ উচ্চারণ করলেই স্বাভাবিকভাবে জাদুঘরের কথা মনে আসে।
জাদুঘর ও বস্তুর অর্থ
আমার আগ্রহের বিষয় হলো, দুর্ভাগ্যবশত মানুষ জাদুঘর ও বস্তু নিয়ে কথা বলার সময় সাধারণত মূল্যবান ও দামি জিনিসের কথাই ভাবে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর ‘ক্যাবিনেট অব কিউরিওসিটিজ’-এর কথা মনে করে, যেখান থেকে আধুনিক জাদুঘরের ধারণার সূচনা হয়েছিল। কিন্তু মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স দেখায় সস্তা ও সাধারণ বস্তুর জাদুঘরও সম্ভব। যেগুলোকে আমরা সাধারণত গুরুত্ব দিই না।
বস্তুগুলোর দাম জাদুঘরকে আকর্ষণীয় করে তোলে না। একটি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ, একটি টিকিট কিংবা একটি সাধারণ টিস্যুও যদি সঠিকভাবে প্রদর্শিত হয়, কাচের ভেতরে যত্নসহকারে অন্য বস্তুর পাশে রাখা হয়, আলো ও নাটকীয়তা ঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি হঠাৎই নতুন অর্থময়তা দেয়।
মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স আমাকে বস্তুর আভা সম্পর্কে শিখিয়েছে। আমরা যখন বস্তুগুলোর প্রতি মনোযোগ দেই, বিশেষভাবে সাজাই—তখন তারা নিজেরাই একটি গল্প বলতে শুরু করে। এই জাদুঘরের নির্মাণ ও বিন্যাস সেই ধারণারই প্রকাশ। একই সঙ্গে এটি বস্তুর কালোত্তীর্ণ অনুভূতিও তুলে ধরে।
সময় ও জাদুঘর
জাদুঘরে আমরা কালোত্তীর্ণতার একটি অনুভূতি লাভ করি। আসলে আমি এখানে দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের দুটি মৌলিক ধারণার কথা বলি। জাদুঘরে সময় স্থানরূপে রূপান্তরিত হয়। জাদুঘরে হাঁটার সময় ‘সময়’ সম্পর্কে এক নতুন ও কৃত্রিম অনুভূতি তৈরি হয়। শরীর বস্তুগুলোর মধ্য দিয়ে চলতে চলতে সেই অনুভূতিকে আবিষ্কার করে।
কোনো বস্তুর মূল্য তার দাম কিংবা তার বিশেষ সৌন্দর্য তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো সামগ্রিক বিন্যাস এবং সম্পূর্ণতা।
এই অর্থে জাদুঘর অনেকটাই উপন্যাসের মতো। আমরা সেখানে হারিয়ে যাই। ছোট ছোট বিবরণের মুখোমুখি হই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামগ্রিক গঠন ও সমগ্র অভিজ্ঞতার অনুভূতি।



