সুনীল দত্ত ও অমিতাভ বচ্চন। অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, সমাজসেবক ও পরবর্তীকালে রাজনীতিক—অনেক পরিচয়েই চেনানো যায় সুনীল দত্তকে। তবে সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। আর সেই স্বপ্নই একসময় তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল প্রায় দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ১৯৭১ সালে নির্মিত সুনীলের স্বপ্নের ছবি ‘রেশমা অউর শেরা’ আজ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু ছবিটির পেছনের গল্প আরও নাটকীয়। এই একটি সিনেমা বানাতে গিয়ে সুনীল দত্তকে বন্ধক রাখতে হয়েছিল নিজের বাড়ি, বিক্রি করতে হয়েছিল গাড়ি, এমনকি সংসারের দৈনন্দিন খরচ চালানোও হয়ে উঠেছিল কঠিন।
একজন তারকা, একজন পরিবারের কর্তা
১৯৫৫ সালে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন সুনীল দত্ত। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি বিয়ে করেন অভিনেত্রী নার্গিসকে। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় ছেলে সঞ্জয় দত্ত। বিয়ের পর নার্গিস প্রায় অভিনয় ছেড়ে দেন এবং পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের বড় অংশ এসে পড়ে সুনীলের কাঁধে। অভিনয়ের পাশাপাশি সুনীল প্রযোজনাতেও নামেন। কিন্তু ব্যবসায়িক লাভের চেয়ে শিল্পমানকে বেশি গুরুত্ব দিতেন তিনি। ফলে প্রযোজক হিসেবে তাঁর ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠত।
মরুভূমিতে এক অসম্ভব স্বপ্ন
‘রেশমা অউর শেরা’ ছিল রাজস্থানের পটভূমিতে নির্মিত এক ট্র্যাজিক প্রেমের গল্প। পারিবারিক শত্রুতা, প্রতিশোধ ও প্রেমকে ঘিরে নির্মিত এই ছবিকে সুনীল দত্ত সাধারণ বাণিজ্যিক সিনেমার গণ্ডির বাইরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। প্রথম পরিকল্পনা ছিল মাত্র ১৫ দিনে শুটিং শেষ করা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। রাজস্থানের প্রত্যন্ত পোচিনা গ্রামে শতাধিক সদস্যের ইউনিট নিয়ে শুরু হয় শুটিং। দিন গড়াতে গড়াতে ১৫ দিনের কাজ পৌঁছে যায় দুই মাসের বেশি সময়ে। খরচ বাড়তে থাকে লাগামহীনভাবে।
নিখুঁত দৃশ্যের জন্য অবিশ্বাস্য জেদ
সুনীল দত্ত ছিলেন পরিপূর্ণতাবাদী। তাঁর মেয়ে নর্মতা দত্ত পরে স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, এক দৃশ্যের জন্য পরিচালক ১০০টি উট চেয়েছিলেন। কিন্তু ৯৯টি উট পাওয়া গেলে তিনি শুটিং শুরুই করেননি। অভিনেত্রী রাখী গুলজার স্মরণ করেছিলেন, শুটিংয়ের প্রথম কয়েক দিন তাঁকে অভিনয় করতেই দেওয়া হয়নি। স্থানীয় মানুষদের পর্যবেক্ষণ করে চরিত্রের ভেতরে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছিলেন সুনীল। এ ধরনের শিল্পসুলভ সিদ্ধান্ত ছবির মান বাড়ালেও প্রযোজনার ব্যয়কে আকাশছোঁয়া করে তোলে।
অমিতাভকে নিয়ে সংশয়
এ ছবিতেই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। তখন তিনি বলিউডে প্রতিষ্ঠিত নন। জনশ্রুতি আছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং অমিতাভের পরিবারঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্রেই ছবিতে তাঁর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। মজার বিষয় হলো, চরিত্রটি ছিল বোবা। পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানা যায়, সেই সময় অমিতাভের কণ্ঠস্বর নিয়ে অনেকেরই সন্দেহ ছিল। কেউ কেউ মনে করতেন, তাঁর গলা রেডিও ঘোষকের মতো শোনায়। পরবর্তীকালে সেই কণ্ঠস্বরই ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে পরিচিত ও শক্তিশালী কণ্ঠগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
বাড়ি বন্ধক, সবকিছু বাজি
শুটিং দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় অবস্থিত নিজের বাংলো বন্ধক রাখতে বাধ্য হন সুনীল দত্ত। শুধু তা–ই নয়, অন্য ছবিতে অভিনয় করে যে পারিশ্রমিক পেতেন, তার প্রায় সবটাই ঢেলে দিতেন ‘রেশমা অউর শেরা’র নির্মাণে। এ যেন একজন নির্মাতার নিজের স্বপ্নের ওপর সর্বস্ব বাজি রাখার গল্প।
মুক্তির পর ধাক্কা
১৯৭১ সালে মুক্তির পর ছবিটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। যদিও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছিল। ছবিটি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতে এবং ভারতের পক্ষ থেকে অস্কারের জন্যও মনোনীত হয়। কিন্তু শিল্পগত সাফল্য আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারেনি। একসময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে সুনীল দত্তকে একের পর এক গাড়ি বিক্রি করতে হয়। পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে তিনি দ্রুত কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
সংসারের নীরব সংগ্রাম
এই সংকটকালে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন নার্গিস। মেয়ে নর্মতা দত্ত লিখেছেন, এমন দিনও এসেছে, যখন নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য ছিল না। তখন নার্গিস পুরোনো স্কুল ইউনিফর্ম ও মোজা সেলাই করে ব্যবহার করতেন। সুনীল দত্ত পরে বলেছিলেন, কঠিন সময়েও স্ত্রীকে কখনো অভিযোগ করতে দেখেননি। হতাশা নয়; বরং ধৈর্য ও ইতিবাচক মনোভাব দিয়ে তিনি পুরো পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন। আরও হৃদয়স্পর্শী একটি ঘটনার কথা জানা যায়। নার্গিসের অভ্যাস ছিল একটি বাক্সে খুচরা পয়সা জমিয়ে রাখা। একসময় যখন সংসারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোরও টাকা ছিল না, তখন তিনি সেই বাক্স ভেঙে সব কয়েন গুনেছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর দেখা গেল, সেই টাকায় অন্তত এক মাসের সংসার চালানো সম্ভব। একটি পরিবারকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছিল সেই সঞ্চয় এবং তার চেয়েও বেশি, একজন নারীর অদম্য আশাবাদ।
বন্ধুরা এগিয়ে এলেন
সেই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিনোদ খান্না। তাঁর প্রথম বড় সুযোগ এসেছিল সুনীল দত্তর প্রযোজিত ছবি ‘মন কা মিত’-এ। দত্ত পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা জেনে তিনি সুনীলকে নতুন ছবি শুরু করার পরামর্শ দেন। সে উদ্যোগ থেকেই পরে তৈরি হয় ‘নীলে পে ডেলা’, যা পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করে। ‘রেশমা অউর শেরা’ সুনীল দত্তকে আর্থিকভাবে বিধ্বস্ত করেছিল, কিন্তু তাঁর স্বপ্নকে হত্যা করতে পারেনি। বহু বছর ধরে অভিনয় করে, নতুন নতুন কাজ নিয়ে ধীরে ধীরে ঋণ শোধ করে তিনি আবার ঘুরে দাঁড়ান।



