সৈয়দ রিয়াজুর রশীদের গল্প সংকলন ‘সব চরিত্র অলীক বাস্তব মানবীয়’
সৈয়দ রিয়াজুর রশীদের গল্প সংকলন প্রকাশ

সৈয়দ রিয়াজুর রশীদের বাছাই গল্পের সংকলন “সব চরিত্র অলীক বাস্তব মানবীয়” প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশ করেছে পানকৌড়ি প্রকাশন। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন সোহেল আনাম। মূল্য ৪০০ টাকা।

গল্পের ক্যানভাস ও বিষয়বস্তু

সৈয়দ রিয়াজুর রশীদের নির্বাচিত এই গল্পগুলোর ক্যানভাস সমগ্র বাংলাদেশ ঘিরে বিস্তৃত; উঠে এসেছে এ জনপদের মানুষ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, মিথ-পুরাণ-লোকায়ত পেশি; প্রতিফলিত হয়েছে সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও মানুষের মানচিত্র। তাঁর গল্পের ভাষা ও বিষয়বস্তু প্রক্ষেপণ সমাজবাস্তবতাকে অন্য এক নন্দনতত্ত্বের মাপকাঠিতে নিয়ে আসে। বাংলা গল্পের একটি নিজস্ব ও মৌলিক বিন্যাস তাঁর লেখায় উপস্থিত।

মানুষের অস্তিত্বের বিপন্নতা

মূলত মানুষের অস্তিত্বের বিপন্নতা ও বিচিত্র নানাবিধ অনুষঙ্গ চিত্রিত হয়েছে তাঁর কথাসাহিত্যে। তাঁর লেখায় এক প্রকার চিত্রকল্পধর্মীতার পরিচয় পাওয়া যায়, এ কারণে একজন চিত্রকরের জন্যও তাঁর ভাষার নানান উপাদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই গ্রন্থে বক্ষ্যমাণ হয়ে আছে গল্প ভাষা ও সমান্তরাল সচিত্রীকরণ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দ্বান্দ্বিকতা ও চিত্রকল্প

তাঁর লেখায় দ্বান্দ্বিকতা, সংকল্প, অন্তরীপ দর্শন, শ্রেণি-চেতনা এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্ববিরোধিতা সবই আমাদের সমাজের উপাদান। নিঃসন্দেহে তিনি চিত্রকাল্পিক এবং তা সামগ্রিকতায় বিকশিত। ভাষা এবং এর উপস্থাপনায় তিনি বিশেষভাবে মনোযোগী এবং সংবেদনশীল। সুতরাং ভাষার ব্যাকরণ তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্ববহ। যা মূলত একজন কবির বৈশিষ্ট্য। এ কারণে কখনো কখনো তাঁর উপস্থাপনা হয়ে ওঠে কাব্যিক।

শব্দ ভেঙে শব্দ, বাক্য ভেঙে বাক্য নির্মাণে সিদ্ধহস্ত সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ একজন কুশলী গল্পকার এবং গল্পের কুশীলব। তাঁর লেখায় শিল্পীসত্তার উপস্থাপন ও বিকাশে একধরনের খোলস খুলে বেরিয়ে আসার বিবর্তনমুখী প্রয়াসধর্মীতা স্পষ্ট।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রন্থের সম্ভাব্য গ্রহণযোগ্যতা

এই গ্রন্থ পাঠক আদৃত হবে নিশ্চয়। গল্পপাঠে নস্টালজিক হয়ে পড়বেন পাঠক। সংকলন থেকে একটি গল্প প্রকাশ করা হলো।

বালকের ইতিহাস

ঠিক দুপুরে তালপুকুরে ঢিল পড়ে; তখন মনটা কেমন জানি করে; ভিতর হতে মনটা তখন ভীষণ বেজে ওঠে। নিঝুম দুপুরটা নূপুর হয়ে ঝুমঝুমি তৎক্ষণাৎ। দুপুর : একটা গল্প তৈরি হয়—যে গল্প প্রতিদিন একটু-একটু করে রঙময় ভাষা হয়: ছবি হয়—ছবিতে রঙের আলো আর বিভা। কোথা হতে যেন একটা সুরেলা ধ্বনিস্বর নিংড়ে, কেড়ে নেয় এই দুপুরে, এই সূর্যের তাপ ও রুক্ষতা; বিলীয়মান হয় দুপুরের দাপট এইবার। দুপুরের পর গড়িয়ে গড়িয়ে যে বিকেলের দিকে তন্ময় একপ্রকার যাত্রা–হাঁটি-হাঁটি পা—এক দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য আরেক দরজা দিয়ে, খিড়কি খুলে অবারিত অজানা বেলা।

এমতো এক দুপুরে মানে জ্বর ওঠা : ভেজা ভেজা বাতাসে বাতাসে কপাট বন্ধ : একতাল, তিনতাল, ঝাঁপতাল। দুপুর মানে ঝিমিয়ে পড়া, নির্জনতা একাকিত্ব। দুপুর মানে—ঘুম পাড়ি দিয়ে সোনালি বিকাল দেখার আকাঙ্ক্ষা মাত্র। রাস্তায়, বাইরে দুপুর ক্লান্ত পথিক, ঝিমমারা কাক। দুপুর : শান্ত... দুপুরচিত্র অনেকানেকরকম। দিনের পর দিন, ঋতুতে ঋতুতে, একেকটা দুপুর একটু-একটু পালাবদলে শুধু পরিবর্তন, অবিরত বদলে যাওয়া, নতুন-নতুন অথচ কখনও একরকম নয়, ভিন্ন প্রকৃতির এবং চেহারা ও মেজাজে রূপময় রূপকথা–অনাবিল, নিটোল।

যে দুপুর গল্পের বিকালের আরও পরে সন্ধ্যার রাতের, ঐ সময়ের প্রাক্কালে দুপুরবেলায় ছেলেটা পালিয়ে যায়, হারিয়ে যায় অচেনায়। দুপুরবেলায় যে অন্যরকম আলোর প্রক্ষেপ, বিসহ আলোর গান একধরনের অসহ ছটফটানি এই দুপুরে তখন ওই আলোয় আলোয় বাতাসে ও নিশ্বাসে নিজের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, আদান-প্রদান ও ভাব সম্প্রসারণ। শরীরের ভেতর একটা তাপ কেঁপে কেঁপে ওঠে, মস্তিষ্কের কোষে কোষে নিমজ্জন…পাখির ডাক অথচ চঞ্চল একটা সুতীব্র ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের পরে ঢেউ ওঠা, ভাসিয়ে নিয়ে চলা : ক্রমাগত নিমজ্জন আর ভাসান।

একটা কৈশোরক মানুষ, মনের মধ্যে জাফরি কাটা রৌদ্র ছায়া; একটা দুপুর তখন—যখন হত্যাবেলায় অন্য খেলা। ঝিমমারা দুপুরটা আস্তে আস্তে, তালে তালে শরীর খুঁচিয়ে জাগিয়ে তোলে জাগরণ ও শিহরন। দুপুরটা কাঁপতে কাঁপতে তাক লাগিয়ে ঘোর জাগিয়ে নিজস্ব বলয়ে তোমার ভেতর কিশোর এবার দুই হাত দাপিয়ে লুটপাট করে, গল্প করে রক্তে রক্তে মিশে। দুপুর তখন শরীরে—কম্পনে অনাবিল। দুপুর যেন বুকের ভেতর জাগে এবং কিশোর যেন এক অর্ধনারীশ্বর।

দুপুরের আছে একটা অন্যরকম রং। ওই রং-এর মধ্যখানে দুপুরটা চুবিয়ে রাখা হয় যেন। ফুরসত দেখা পাওয়া শুধুমাত্র আর তারপর যেন এই দুপুরটা টুক করে এক লম্বা দৌড়ে কৈশোরক শরীরটাতে করে ঘূর্ণাবর্ত। উজ্জ্বল এক অবর্ণনীয় বর্ণের চকিত প্রকাশ—মর্মমূলে প্লাবন। দুপুর—সৃজনচৈতন্যে অপরূপ! চোরাগোপ্তা আলোর বিচ্ছুরণ! ছায়া-ছায়া মায়া, জাদুর বিস্তার। দুপুরের আকার এমতো যেন, বৃত্ত অথবা ত্রিভুজ অথবা চৌকোনা কিংবা অজানা; নয় তো, দুপুর যেন চৌকোণ গড়নের চেয়ে ত্রিভুজের তির্যক রেখা ও কৌণিক আঁকিবুঁকি টানা সময়।

দুপুর হচ্ছে একটা রেখা, রং ও বিন্দুর বুননে এক ভাষার বর্ণমালা ব্যাকরণ, ধোঁয়ার মতো সাদা উদ্‌গিরণের ভেতর কৈশোরক ক্যানভাসে একটি নব আবিষ্কার ভেঙে এলোমেলো হয়ে গড়ে ওঠে তারপর। প্রতিদিন দুপুরে প্রতিবার, বারংবার। দুপুর হচ্ছে এক দ্বৈরথ। বেলা অবেলা কালবেলায় কৈশোরক শরীরের ভেতর দুপুরটা একটু-একটু করে পৌঁছে শেষপর্যন্ত সিংহাসনে আসীন উষ্ণীষ সজ্জিত যখন একটা আঘ্রাণের ঘ্রাণজ আবেশ বিলি কাটে এবার তারপর। কিশোর আর একলা থাকে না। কথা না-বলা তবু—এক অস্ফুট শাব্দিক টপ্পা অথবা ঠুমরী।

দুপুর এক ঝিমমারা নেশার বিউগল এতজোরে বেজে ওঠে, চিৎকার করে সরব শরীর যেন শিহরিতো কেঁপে-কেঁপে উঠে করতালি দিতে শুরু করে। দুপুরের বালক, বালকের দুপুর একটি বিড়াল, দুধ চায়, নিঃশব্দ পা ফেলে ঘোরাফেরা করে আঙিনায় সারাটা দুপুর বিড়ালের নিঃশব্দ পদসঞ্চার চলাচল, যাতায়াত, এদিক-ওদিক ইতিউতি চাহনি বিড়ালটার তখন এই দুপুরে, একটি বিড়াল চলে পা-পা করে ঘরে-উঠানে, সর্বত্র পদধ্বনি মৃদু দুপুরবেলাটায় বিড়াল দুধ-ভাত, মাছের কাঁটা কুড়ানি আর কিশোর তখন একলা বিড়াল দর্শক একবার মিউ- মিউ করে বিড়াল তবুও আর কিশোর বালক বড় চুপচাপ যদিবা—স্তব্ধতা, পিনপতন সর্বব্যাপী, এইক্ষণে ঘরের আঙিনায় একটা কুয়াভর্তি স্থির হয়ে আছে নিস্তরঙ্গ জল বালকের মুখ জলে ভেসে ওঠে বালকের ওষ্ঠ নড়ে, ওষ্ঠাধারে কম্পন অথচ শব্দহীন বালক ভাষা পায় নাই—আজন্ম ভাষাহীন বালক কেবল আকার-ইঙ্গিতে হয় এ-যাবৎ এই বালকের ভাষা প্রকাশ—বিনিময়–যোগাযোগ বালকটি কখনও গান গায় নাই, শিষ দিয়ে ওঠে নাই কথা বলে নাই, মুখে বোল ওঠে না... বালকের অভিব্যক্তি কথায় গাঁথা নয়, কেবলমাত্র অস্ফুট শব্দের আভাস; শব্দের উচ্চারণে ব্যর্থ রিক্ত বালক অতঃপর, বরাবর—অখণ্ড নীরবতা শুধুমাত্র দীর্ঘতর তাই বালকটির জবান এক দৈত্যের মুঠোয় অনন্ত বন্দী বালকের ভেতরে পাখির, ঝটপটানি অবিরাম, অবিশ্রান্ত বা কোনও নিদান নাই কথা বলে উঠবে বলে নাই কোনও তাবিজ নাই কবিরাজ নাই–শুধু নাই বালকটি একা একা দৈত্যের মতো বারংবার মেতে ওঠে লড়াইয়ে, সংগ্রামে—তবুও আফসোস এই যে, বালকের ভূমিকায় কোনও শব্দ সৃষ্টি হয় না বাক্য রচিত হয় না—এই অপ্রকাশ একমাত্র শব্দ হয় বালকের। অদম্য কথার নিকট বালকের নতজানু ভিক্ষায় কোনও উচ্চারণ দেয় না বালকের জবানে অতএব হারমানা বালক। চোখের জল তার ভাষা, কথা তার অভিব্যক্তির বাঙ্ময় উদ্‌ঘাটন, অবলম্বন তার ইশারা কথার নামান্তর ইশারা বটে, জন্ম যদি তব মাতৃকোড়ে, জন্মের প্রথম ক্ষণে, কান পেতে রেখেছিল যারা, কোনও অব্যয়ধ্বনি—জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকার, কান্নার আর্তনাদ—জন্মজয়ে কান্নার বাজনা, চরাচরে আঁতুড়ঘরে সলতের আলোর তলে, উৎপাদন করে না প্রকটিত করে নাই অনিবার্য শব্দতরঙ্গ কোনও, সেই ক্ষণে, জন্মের রাতে বালকটি যখন সদ্যোজাত আর তার নিশ্বাস-প্রশ্বাস ছিল তাঁর, এই পৃথিবীতে নতুন এসে রুমে বাঁচার জন্য পাঠরত যখন সে-ই রাত ছিল শীতের হিম নামছিল, শুক্লপক্ষের একটা বড় চাঁদ ছিল আকাশে—কুয়াশায় ঝাপসা মেঘ আকাশে হাঁটাহাঁটি করছিল বেশুমার। হিমের গায়ে, চাঁদের আলোকপাতে, প্রকৃতিতে—চতুষ্পার্শ্বে এক অবিমিশ্র প্রবাহিত দুধের স্রোত অহরহ বিরাজ করছিল উথাল-পাথাল হিম-কুয়াশা-জ্যোৎস্নার রূপবান উপস্থিতি। কুয়াশামাখা রুপালি জ্যোৎস্নালোকে মৈথুনবিফল পুরুষ একজন ডুকরে কাঁদল অনেকক্ষণ। যেহেতু পুরুষ সন্তানের জন্ম ঘটে যায়, কেউ একজন এই ঘোষণা-ই জানিয়ে দিতে গেয়ে ওঠে আজান, বড্ড কর্কশ লাগে আজানের সুরবাহার।

এই জ্যোৎস্নার তরলে কুয়াশার দুধের মধ্যখানে নারীদেহ হতে জন্ম নিয়েছে এক মাংসপিণ্ড: সন্তান আমার আর সন্তান জন্মের ঠিক পরে বুক দুইটি ভরে উঠেছে দুধে। এই দুধ সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখে। আবার সন্তান বড় হলে বুকের দুধ উধাও যেমন শীতের কুয়াশার দুধ ফুরিয়ে গিয়ে আবার আরেকটা শীতরাতের জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনে। একজন বৃদ্ধা বললেন, বুকে দুধ রয়েছে, দৈতা ভয় পাবে। ভরাট দুগ্ধবতী স্তন পৃথিবীর পবিত্রতম সৃষ্টি আর দৈতারা পবিত্রতা সহ্য করতে পারে না। দৈত্যরা পালিয়ে যায় যখন মা কান্নাচোখে নগ্নবুকে দাঁড়ায় কেবল! তবু সন্তানের কণ্ঠ রুদ্ধ তখনও, দৈত্য মুষ্ঠিতে আবদ্ধ স্বরযন্ত্র। মায়ের আকাঙ্ক্ষা অতঃপর ভূমিষ্ঠমাত্র সন্তানের হৃদয়ের ধুকপুকানি শ্রবণ করে; মা বলে ডাক আর শুনবে না শেষ পর্যন্ত জেনে ফেলার পরও নিজেকে জননীর শিরোপায় অনুভব করেছিল নারীটি।

মা ছেলেকে একটু-একটু করে বড় করে তোলে। বোবা ছেলেটা। বাবা পালিয়ে যায় অজানায়। মা পারে না বোবা ছেলেকে ফেলে দিতে কোথাও। মায়ের পালানোর জায়গাটা ঐ ছেলেটাই যে ছেলে কথা বলে না, পারে না উচ্চারণ করতে; মায়ের চোখের মণি তবু সে। মায়ের অনাবিল আশ্রয়ে বুকের দুধে চুমায় চুমায়, নরম হাতে, আদরের স্রোতে বেড়ে ওঠে সন্তান। মায়ের বুক ভর্তি করে রাখে ছেলে। মিষ্টি হাওয়া। পাখির আনন্দ। গোলাভর্তি শস্য। সুস্বাদু জল। বীজ হতে অঙ্কুর এই সন্তান। বোবা সন্তান হলেও মায়ের মন কুচিন্তায় তবু আকুলিবিকুলি করে তাই যেন সন্তানের কপালে নজরফোঁটা, কাজলের টিপ। মা কখনও কাঁদে না। ছেলে শুধু মাকে জাপটে আঁকড়ে ক্রন্দনহীন চোখের পানিতে মিশে থাকে।

মায়ের কাছে ছেলেটা প্রতিদিন আরেকটু নতুন। অগণনেও একমাত্র। ছেলেটি অগণিত সকাল দেখে অবিরাম, মাথার উপর সূর্য যখন দেখেছে দুপুর: সূর্য হেলে পড়লে পেয়েছে বিকাল: অন্তরাগ, সন্ধ্যার পর রাত্রির হাতছানি। এইসব সময়াস্তর বালকের নিভৃতে বয়সান্তর ঘটে চলে। অতঃপর একদা এক চিলমারা দুপুরে কৈশোরক সে মুখোমুখি হলো নিজের। রোদের প্রাখর্যে পরিপূর্ণ ঝিলমিল করতে করতে একটি ভর উত্তাপ চাপ আর ভাসমান সাদা সাদা মেঘময় আকাশ উড়িয়ে এসে কলরোলের মধ্য দিয়ে সীমানা ভেদ করে শরীরের অভ্যন্তরে হানা দেয় দুর্দান্ত। কৈশোরক ছেলেটি অর্জন করে শেষপর্যন্ত একটি দুপুর, অধিকার করে নেয় দুপুরটা আর শরীর প্রকোষ্ঠে, দেহের কোষে-কোষে, মগজের কৌণিক কোনও অবস্থানে তখন বিকিরণশীল রৌদ্র ও খর উত্তাপ—মাজাঘষা দুপুরের অজানা শিহরনের দখলদারি। দেহের বীণাযন্ত্র সংগীতের মতো বেজে ওঠে। আঘাতে আঘাতে শরীরকে করে সুন্দর। রৌদ্রের সংগীতের সঙ্গে শরীর সুষমার সংগতি ও বিস্তার অতঃপর। দুপুরের রৌদ্রকলায় কৈশোরক বালক সহসা আরও বড় হয়ে ওঠে তখন, অবেলায়। অচেনা তখন নিজের কাছে সে অকস্মাৎ। বালকের করোটিতে ঢোকে রৌদ্র আর শরীর জুড়ে উত্তাপময় এক আয়নায় অবিরাম আলোক বিকিরণ আর প্রতিফলন। বালক কুঁকড়ে যায়, নিজের ভেতর একটা ঝলসিত প্রকটিত অস্তিত্ব—উত্থানপর্ব। এখনকার বালক অচেনা। নিজেকে নিষ্পেষণ করে এবার। নিজের ভেতর হতে নিজেকে নিংড়ে আনবে, তবে সে প্রস্তুত।

হারিয়ে যায় বালক। আরেক খেলা যেন, লুকোচুরি খেলায় যেমন সে এতদূরে গিয়ে লুকায় যে আর সে খুঁজে পায় না; বহুদূর চলে যায় এইভাবে অনেক–অনেক দূরবর্তী তখন নিজে। শরীরের প্রতিটা গ্রন্থি, প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্কা ও স্নায়ু আমূল কম্পিত হয়। মিত হোক অমিত হোক কালে হোক অকালে হোক প্রয়োজনে হোক আর অভিলাষে হোক এক অদম্য ক্রিয়ায় দেহের সারাংশ স্খলিত হয় : তাপের শীর্ষে বৃষ্টি, বিস্ফোরণ ভূতগ্রস্ত হয়ে এবারের মতো এই জীবনে প্রথমবার হস্তমৈথুনের পর তিরতির করে কম্পমান ধনুকের মতো বাঁকানো শরীর পরের দফায় সটান, স্থির। শরীরজুড়ে ঘামের প্রবাহ। বুকের ভেতর দুইটা ডানার ঝটপটানি ক্রমে শান্ত-অবসাদের মধ্যে ডুবসাঁতার। যে তাপ সঞ্চারণশীল তার মাত্রা কমে যায়। নিশ্বাসের ওঠানামা ক্রমে মৃদুলয়ে পৌঁছে। অদ্ভুত এক সন্তরণ, ভ্রমণ, প্রদক্ষিণ বালকের ঘটে যায়। নির্বাপিত হওয়ার প্রাকমুহূর্তে এক. অস্ফুট শব্দের গোঁ-গো শব্দের হ্রস্ব রব যেন উচ্চারণ, যেন জন্মমাত্র প্রথম উচ্চারণ–তৎক্ষণাৎ স্বয়ং আবিষ্কার। এই পিষ্ট গোঙানি নতুন ভাষা, বাকস্ফূরণ, স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রাণবান। বালক নিজের কানে সমস্ত অনুভব দিয়ে স্বীয় উচ্চারণ শোনে। সময় বড় দ্রুতযান, নিজেকে কুড়িয়ে পায় বালক পুনরায়। বালকের ভয় লাগে, কে যেন তাড়া করে চলে; চকিতে চারপাশে তাকায় উৎকণ্ঠিত বালক। কে যেন নুইয়ে দেয়। বিকালের রৌদ্র এখন নম্র; কোমল আলো চারদিকে। এবার ধীরে ঘটে বিকাল ফুরিয়ে অন্তরাগ—সন্ধ্যা-রাত্রি; তারপর প্রত্যুষ, সকাল, দুপুর হবে আবার দৈনিক নিয়মে শুধু অনুভবের ভাষায় অতি দ্রুত রূপান্তর এক রূপার যাদুদণ্ডের কার্যকলাপে। সোনাঝরা বিকালের আলোতে বালক দ্রুত অপসৃত হবে আর পালাবে এবার; আততায়ী দুপুরটা পেছনে পেছনে তাড়া করে যেন। বালক রাস্তায় দ্রুত দৌড়ায় এবার। অনেক দূরে যাবে বলে ভাবে বালক। পথচলতি চেনাজানা যে কোনও মুখের দিকে চেহারা দেখাবে না যেন বালক। নিজেকে লুকিয়ে রাখা, পালিয়ে যাওয়া, নদীর কিনারায় হারিয়ে পরিত্রাণ চাওয়া বালকের ঊর্ধ্বগতি বালক খোঁজে যুৎসই আত্মগোপন। পলায়ন আর পলায়ন। এই শহরটার অলি-গলি পথ বালকের কাছে বড় সংকুচিত মনে হয়, কোথাও চলে যাওয়ার স্থান খুঁজে পায় না। চলতে-চলতে হেঁটে যাওয়া বালকের এখন কোনও ঠিকানা নাই। পরিচিত এই শহরেই দ্রুত পরিক্রমা করে। বালক—একাকী, সুদূর, জনতায় নির্জন। অসহায় হয়ে ভাবে যে, নিজেকে সে এ শহরে হারিয়ে ফেলতে, লুকিয়ে রাখতে পারে না। বিকাল শেষে ঘরে ফেরে না; শহরের দূর প্রান্তে চলে গিয়েছিল সে অতঃপর।

আজান, মাগরিবের হয়, মসজিদে মসজিদে। রাস্তার দুই ধারে সবগুলো স্ট্রিট ল্যাম্প একটার পর একটা চেনা আলোয় জ্বলে ওঠে। রেস্তোরাঁর পরিচিত গান বাজতে থাকে। শহরের সবগুলো রিকশা ক্রিং ক্রিং ক্রিং বেল বাজিয়ে ঝড় তুলে বাড়িমুখী... গতিষ্মান: বিকাল ঘুরে একলা বালক ফেরে। বিকাল ঘুরে ক্লান্ত কিশোর বাড়ি ফেরে। বিকাল শেষে সন্ধ্যা নামলে অন্ধকারের ভেতর আঙিনাময় বাড়ির পাতাবাহারের ঝোপ, গোলাপ ঝাড় আর আতা গাছটা, পেয়ারা গাছটা অন্ধকার বুকে জড়িয়ে লুপ্ত হয়ে গেল। অন্ধকার এক আড়াল সৃষ্টি করে। অন্ধকারে পেঁজা পেঁজা এই যে রাতটি—দুপুর-বিকাল পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার–লিপ্ত অতঃপর অন্যরকম যে রাত—আকাশে বৃত্তাকার চাঁদ—মেঘের ওড়াওড়ি: শাদা-শাদা মেঘে চাঁদের ঢাকাঢাকি– তখন চাঁদটাকে চলন্ত মনে হয়; চাঁদের বুড়ি জ্যোৎস্নার সুতা বুনে মায়ার জাল বিস্তার করে চলে পৃথিবীতে : এই রাতে এক জাদু দেখে বালক; বালক জেগে থাকে এই রাতে; রাতের নিঃশব্দ প্রহরী সে, ঘুমহীন রাতে একক মাত্র। জেলখানার ঘণ্টা বাজে, নিশুতি রাতে দূর হতে প্রহরান্তে ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ ধ্বনিত হলো। অফুরান রাতের এই দৈর্ঘ্য, চোখে একফোঁটা ঘুম নাই বালকের, জেগে থাকা রাতে–আরেকটি রৌদ্র ঝলসিত দুপুর, ঝিলমিল আলোর রণসজ্জাসমেত নীলাকাশটা নিজের শরীরের ভেতর পুনরায় অর্জন করার তীব্র কামনায় উদ্বেল, প্রস্তুত করে সে নিজেকে; পলকহীন চোখের সম্মুখে গাঢ়রাত অন্ধকারে দীর্ঘ চুল খোলে মাত্র।