ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের প্রেক্ষাগৃহে এবার তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন প্রতিযোগিতার আবহ। একদিকে শাকিব খান অভিনীত ‘রকস্টার’ যেমন বিপুল সংখ্যক হলে মুক্তি পেয়ে বাণিজ্যিক দাপট দেখাচ্ছে, অন্যদিকে আরিফিন শুভসহ একাধিক তারকার সিনেমা মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক দর্শক টানার লড়াইয়ে নেমেছে। ফলে ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্স থেকে শুরু করে ব্লকবাস্টার সিনেমাস ও লায়ন সিনেমাস—সবখানেই তৈরি হয়েছে দর্শকের ভিড় ও শো-ভিত্তিক চাহিদার চাপ।
এবার ঈদে মোট আটটি সিনেমা একসঙ্গে মুক্তি পেয়েছে—‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘মালিক’, ‘বনলতা সেন’, ‘মাসুদ রানা’, ‘পিনিক’, ‘তসনস’ এবং ‘অফিসার’। এর মধ্যে মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক বাজার দখলের লড়াইয়ে কার্যত ছয়টি সিনেমা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, যেখানে তারকা, গল্প এবং প্রচারণা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শাকিব খানের ‘রকস্টার’—হল ও শো দখলে একচ্ছত্র আধিপত্য
আজমান রুশো পরিচালিত ‘রকস্টার’ এবারের ঈদে সবচেয়ে বেশি ১০৩টি হলে মুক্তি পেয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিন মিলিয়ে দেশের প্রায় সব প্রধান প্রেক্ষাগৃহেই সিনেমাটি প্রদর্শিত হচ্ছে।
স্টার সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা সিটি, এসকেএস টাওয়ার, সীমান্ত সম্ভার, সনি স্কয়ার, উত্তরা সেন্টার পয়েন্টসহ সব শাখায় একাধিক শোতে চলছে সিনেমাটি। একইভাবে যমুনা ফিউচার পার্কের ব্লকবাস্টার সিনেমাস এবং লায়ন সিনেমাসেও ছবিটির শো প্রায় পূর্ণ দখলে রয়েছে।
ঢাকার বাইরে যশোরের মনিহার, সিলেটের নন্দিতা, খুলনার লিবার্টি ও সঙ্গীতা, চট্টগ্রামের সিনেমা প্যালেস, রাজশাহীর রাজতিলকসহ বড় বড় সিঙ্গেল স্ক্রিনেও ছবিটি ভালো সাড়া পাচ্ছে বলে জানা গেছে।
সিনেমাটিকে ঘিরে তারকা উপস্থিতি, বিশাল প্রচারণা এবং ঈদকালীন দর্শকচাপ—সব মিলিয়ে এটিকে এবারের ঈদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক প্রজেক্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরিফিন শুভ–মিম জুটির ‘মালিক’—কম হলেও মাল্টিপ্লেক্সে শক্ত অবস্থান
সাইফ চন্দন পরিচালিত ‘মালিক’ এবারের ঈদে তুলনামূলকভাবে কম ২৯টি হলে মুক্তি পেয়েছে। তবে সীমিত স্ক্রিন থাকা সত্ত্বেও মাল্টিপ্লেক্সে ছবিটি দর্শকের দৃষ্টি কাড়ছে।
স্টার সিনেপ্লেক্সের নির্বাচিত শাখা, ব্লকবাস্টার সিনেমাস, লায়ন সিনেমাস এবং কুমিল্লার কে-স্কয়ার সিনেপ্লেক্সে ছবিটি নিয়মিত শো পাচ্ছে। শহুরে দর্শকের মধ্যে সিনেমাটির গল্প ও নির্মাণশৈলী নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
চলচ্চিত্রটি একজন যুবকের জীবনে মায়ের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে ধীরে ধীরে অপরাধ জগতের শীর্ষে উঠে যাওয়ার গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত। অ্যাকশন ও আবেগের মিশেলে নির্মিত এই ছবিটি দর্শক টানলেও প্রচারণায় এটি তুলনামূলকভাবে শাকিব খানের ছবির তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে আছে বলে ইন্ডাস্ট্রি সূত্রের মত।
‘মাসুদ রানা’—কেবল মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তি
ঈদে অন্যতম আলোচিত নাম ‘মাসুদ রানা’, যা দীর্ঘদিন পর বড়পর্দায় ফিরেছে সৈকত নাসিরের পরিচালনায়। তবে ছবিটি নিয়ে ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে আলোচনা থাকলেও মুক্তির পর প্রচারণায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। সীমিত সংখ্যক হলে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি স্টার সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা সিটি ও সনি স্কয়ার শাখা, ব্লকবাস্টার সিনেমাস এবং লায়ন সিনেমাসে প্রদর্শিত হচ্ছে।
আলোচনায় সমানভাবে এগিয়ে ‘রইদ’ ও ‘বনলতা সেন’
ঈদুল আজহার সিনেমা লড়াইয়ে মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক দর্শক আগ্রহে সমানভাবে আলোচনায় রয়েছে মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’ এবং মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত ‘বনলতা সেন’। ভিন্নধর্মী গল্প, নির্মাণশৈলী এবং শহুরে দর্শকের টার্গেটেড উপস্থাপনার কারণে এই দুটি সিনেমাই আলাদা জায়গা তৈরি করেছে ঈদের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর ভিড়ে।
‘রইদ’ মূলত মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক মুক্তি পেয়েছে। স্টার সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা সিটি, সীমান্ত সম্ভার, এসকেএস টাওয়ার, সনি স্কয়ার, উত্তরা সেন্টার পয়েন্ট, চট্টগ্রামের বালি আর্কেড এবং নারায়ণগঞ্জ শাখায় সিনেমাটি প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্লকবাস্টার সিনেমাস (যমুনা ফিউচার পার্ক), লায়ন সিনেমাস এবং কুমিল্লার কে-স্ক্রিনেও নির্ধারিত শোতে চলছে ছবিটি।
অন্যদিকে ‘বনলতা সেন’ সাহিত্যনির্ভর ও শিল্পঘন উপস্থাপনার কারণে দর্শকমহলে আলাদা কৌতূহল তৈরি করেছে। সীমিত পরিসরে মুক্তি পেলেও মাল্টিপ্লেক্সে ছবিটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। স্টার সিনেপ্লেক্সের ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রধান শাখাগুলো এবং যমুনা ফিউচার পার্কের ব্লকবাস্টার সিনেমাসে নিয়মিত শো চলছে সিনেমাটির।
প্রচারণাহীণ ‘পিনিক’
জাহিদ জুয়েলের পরিচালনায় শবনম বুবলী ও আদর আজাদের অ্যাকশন-থ্রিলার ‘পিনিক’ মুক্তি পেয়েছে শুধু স্টার সিনেপ্লেক্সে। প্রচারণায় দূর্বল ছবিটির ট্রাম্প কার্ড নায়িকা শবনম বুবলিকে দেখা যায়নি প্রচারণার কোথাও। সন্তানসম্ভবা হওয়ায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এ নায়িকা।
সীমিত পরিসরে ‘অফিসার’
‘অফিসার’ এবারের ঈদে সীমিত সংখ্যক হলে প্রথম সপ্তাহেই প্রদর্শিত হচ্ছে। সিনেমাটি স্টার সিনেপ্লেক্সের সনি স্কয়ার, ব্লকবাস্টার সিনেমাস, লায়ন সিনেমাসসহ খুলনা, রংপুর, কিশোরগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের কয়েকটি হলে চলছে।
মফস্বলে ‘তসনস’
বদিউল আলম খোকনের এই সিনেমাটি মূলত সিঙ্গেল স্ক্রিনকেন্দ্রিক হলেও কিছু নির্দিষ্ট হলে প্রদর্শিত হচ্ছে। মফস্বল দর্শকদের লক্ষ্য করেই এর বণ্টন করা হয়েছে।
ঈদের সিনেমা বাজারে চাপ ও সম্ভাবনা
একসঙ্গে একাধিক বড় বাজেট ও তারকাবহুল সিনেমা মুক্তির ফলে এবারের ঈদে দেশের প্রেক্ষাগৃহে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। শো ভাগাভাগি, দর্শক টানার লড়াই এবং প্রথম সপ্তাহের বক্স অফিস পারফরম্যান্স—সবকিছুই এখন সিনেমাগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে শাকিব খানের ‘রকস্টার’ বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে থাকলেও আরিফিন শুভসহ অন্যান্য তারকার সিনেমাগুলো মাল্টিপ্লেক্সে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ফলে ঈদের এই সিনেমা যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করছে দর্শকের প্রতিক্রিয়া ও ধারাবাহিক উপস্থিতির ওপর।
হল মালিক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, একসঙ্গে অতিরিক্ত সংখ্যক সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় প্রাথমিকভাবে দর্শক আগ্রহ তৈরি হলেও শো বণ্টন ও স্ক্রিন বিভাজনের চাপও বেড়েছে। তাদের মতে, কোন সিনেমা শেষ পর্যন্ত টিকবে তা নির্ভর করবে কনটেন্টের গ্রহণযোগ্যতা, মুখে মুখে প্রচারণা এবং প্রথম সপ্তাহের বক্স অফিস পারফরম্যান্সের ওপর।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদ যেমন প্রযোজকদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি একই সঙ্গে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাজারও হয়ে উঠেছে। কারণ অতিরিক্ত প্রতিযোগিতায় প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলে একাধিক সিনেমার বাণিজ্যিক ক্ষতির সম্ভাবনাও থেকে যাচ্ছে। ফলে এখন দর্শক সাড়া, প্রচারণা এবং বাজার গ্রহণযোগ্যতাই নির্ধারণ করবে—কোন সিনেমা বাড়তি হল পাবে এবং কোনটি ধীরে ধীরে প্রদর্শনী হারাবে।



