ধানবাদে বাস্তবের 'গ্যাংস অব ওয়াসেপুর ৩', গ্যাংস্টার প্রিন্স খানের ত্রাস
ধানবাদে বাস্তবের গ্যাংস অব ওয়াসেপুর ৩, প্রিন্স খানের ত্রাস

ঝাড়খণ্ডের কয়লা শহর ধানবাদে এখন রমরমিয়ে চলছে 'গ্যাংস অব ওয়াসেপুর ৩'। তবে এটি অনুরাগ কাশ্যপের কোনও চলচ্চিত্র নয়, বরং রক্তমাংসের অপরাধীদের এক বাস্তব চিত্রনাট্য। যেখানে প্রধান চরিত্রে রয়েছেন কুখ্যাত গ্যাংস্টার প্রিন্স খান। বর্তমানে দুবাই হয়ে পাকিস্তানে ঘাঁটি গেড়ে বসা এই গ্যাংস্টার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করছে, এমনকি ধানবাদের এসএসপি-কেও খুনের হুমকি দিচ্ছে। গালিগালাজ, আধুনিক অস্ত্র আর চরম সহিংসতার এই মহালয়া দেখে খোদ বিজেপি নেতা বাবুলাল মারান্ডি এনআইএ তদন্তের দাবি তুলেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

সিনেমার মতো বাস্তবতা

২০১২ সালে অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমার সেই বিখ্যাত সংলাপ, 'আমাদের মুসলমানদের এই মহাভারত আজকের নয়, এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে'; এখন ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ধানবাদের কয়লা খনি এলাকায় যেন ধ্রুব সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে। সিনেমার ফয়সাল খান বা সরদার খানের বদলে এখন ওয়াসেপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই চলছে প্রিন্স খান ও ফাহিম খানের মধ্যে।

হুমকি ও ভয় দেখানো

অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমার সরদার খান যেমন হুঙ্কার দিয়ে বলতেন, 'সরদার খান নাম হ্যায় হামারা, বাতা দিজিয়েগা সবকো', ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঠিক একইভাবে ঝাড়খণ্ডের এক ব্যবসায়ীকে হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস পাঠিয়ে হুমকি দেয় প্রিন্স খান। সে বলে, 'নাম মনে রেখো, প্রিন্স খান। দুবাই থেকে বলছি।' বর্তমানে ঝাড়খণ্ড পুলিশের দাবি, প্রিন্স খান এখন পাকিস্তানে রয়েছে এবং সেখানে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই-মোহাম্মদ-এর সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অপরাধী প্রিন্স খানের পরিচয়

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রিন্স খানের আসল নাম হায়দার আলী। তবে অপরাধ জগতে সে 'ছোটে সরকার' নামেই পরিচিত। তার নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে দুবাই থেকে পাকিস্তানি এক গৃহকর্মীর সহায়তায় সে সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সম্প্রতি তার প্রধান সহযোগী সাইফি ওরফে 'মেজর'-কে দুবাই থেকে প্রত্যর্পণ করে ভারতে আনা হয়েছে। পুলিশের জেরায় সাইফিই নিশ্চিত করেছে যে প্রিন্স এখন পাকিস্তানে লুকিয়ে আছে।

পুলিশকে চ্যালেঞ্জ

বিস্ময়কর বিষয় হলো, অপরাধী হয়েও আইনের রক্ষকদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছে প্রিন্স খান। ধানবাদের এসএসপি প্রভাত কুমারকে হুমকি দিয়ে সে একটি ভিডিও বার্তায় বলেছে, 'সাবধানে শোনো প্রভাত কুমার, আজেবাজে কথা বলো না। আমি মুখ খুললে তোমার ঘুমানোর জন্য মদের প্রয়োজন হবে।' শুধু তাই নয়, পুলিশ কয়লা ও জমি মাফিয়ার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলে প্রিন্স খান খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে যাতে এসএসপি-র বিরুদ্ধে ইডি তদন্ত হয়! গ্যাংস্টারের এই স্পর্ধা দেখে ঝাড়খণ্ড বিধানসভার বিরোধী দলনেতা বাবুলাল মারান্ডি মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে চিঠি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ঝাড়খণ্ডে পুলিশ ও মাফিয়াদের এক 'ভয়ঙ্কর আঁতাত' তৈরি হয়েছে। মারান্ডি বলেন, 'সাধারণত পুলিশ অপরাধীদের মুখোশ খোলে, কিন্তু ঝাড়খণ্ডে গ্যাংস্টাররাই পুলিশ কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড ফাঁস করছে।'

অস্ত্র প্রদর্শন ও হত্যার হুমকি

ফাহিম খানের অনুসারীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে একটি ভিডিওতে প্রিন্স খানকে আধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করতে দেখা যায়। সেখানে সে বলে, এই অস্ত্রগুলো ভালো করে দেখে নাও। আমরা এমন গণহত্যা চালাব যে পুরো 'সিস্টেম' কেঁপে উঠবে। প্রশাসন আমাকে ধরার আগে আমি নিজেকে গুলি করে দেব।

পুলিশের অভিযান

পুলিশের অভিযানে প্রিন্স খানের ওয়াসেপুরের বাড়িতে গত সপ্তাহে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছে। ধানবাদ পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টররা যখন মুচকি হেসে গোঁফে তা দিয়ে এই অভিযান পরিচালনা করেন, তখন অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমার সেই ধূর্ত পুলিশ অফিসারদের কথা মনে পড়ে যেতে বাধ্য।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিও

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একজন পাকিস্তানি পাঞ্জাবি উচ্চারণে কথা বলা ব্যক্তি প্রিন্স খানকে পিস্তল দেখাচ্ছে। সেই দৃশ্যটি অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমার ফয়সাল খানের বারাণসীতে অস্ত্র কেনার দৃশ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ভিডিওতে অস্ত্র বিক্রেতাকে 'গয়ে হ্যায়' না বলে পাকিস্তানি টানে 'গিয়ে হ্যায়' বলতে শোনা যায়।

ব্যবসায়ীকে হুমকি

লোপা জনশক্তি পার্টির (আরভি) নেতা প্রেমচাঁদ সিংয়ের কাছে ২ কোটি টাকা দাবি করে প্রিন্স খানের হুমকি ছিল আরও ভয়াবহ। সে বলেছিল, 'তোমার ছেলের বিয়ে ছিল বলে ছেড়ে দিয়েছি। এখন বিয়ে শেষ। নাতিকে দেখে মরতে চাও না কি আগেই?'

বাস্তবের 'পার্ট ৩'

২০১২ সালে অনুরাগ কাশ্যপ 'গ্যাংস অব ওয়াসেপুর ২' শেষ করলেও, ২০২৬ সালে এসে ধানবাদের কয়লা বলয়ে প্রিন্স খানের দাপট আর পুলিশের পাল্টা অভিযান বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বাস্তব জীবনের 'পার্ট ৩' এখন সফলভাবেই চলছে। ঝাড়খণ্ডে এখন কেবল কয়লার ধোঁয়া নয়, বন্দুকের বারুদের গন্ধই বেশি ভারী।