‘দ্য টিকটক কিলার’: একাকী ভ্রমণের আতঙ্কের বাস্তব কাহিনি
একাকী ভ্রমণ অনেকের কাছে স্বাধীনতা ও রোমাঞ্চের প্রতীক হলেও, স্পেনের এক নারীর জীবনে তা রূপ নেয় এক ভয়ংকর ট্র্যাজেডিতে। নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া তথ্যচিত্র সিরিজ ‘দ্য টিকটক কিলার’ এই মর্মান্তিক ঘটনাকে তুলে ধরেছে, যা শুধু একটি খুনের কাহিনি নয়, বরং ডিজিটাল যুগে বিশ্বাস, প্রতারণা ও বিপদের এক শীতল প্রতিচ্ছবি।
এক ভ্রমণপ্রেমী নারীর শেষ যাত্রা
৪২ বছর বয়সী ভ্রমণপ্রেমী এস্থার এসতেপা একা ঘুরতে গিয়েছিলেন স্পেনে। সেখানে একটি হোস্টেলের লবিতে তাঁর পরিচয় হয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হোস হুরাডো মন্টিলার সঙ্গে। প্রথম দিকে মন্টিলা নিজেকে বন্ধুসুলভ ও প্রাণবন্ত একজন ভ্রমণকাহিনি শেয়ারকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন, কিন্তু এই পরিচয়ই পরিণত হয় এস্থারের জীবনের শেষ অধ্যায়ে।
অদ্ভুত বার্তা ও নিখোঁজ হওয়া
২০২৩ সালের আগস্টে দুজনে মিলে দীর্ঘ পথ হাঁটতে বের হন। পথে এস্থার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাঁর আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দেয়। পরিবারের কাছে আসে অদ্ভুত বার্তা—তিনি নাকি নিঃস্ব হয়ে গেছেন এবং নতুন জীবন শুরু করতে আর্জেন্টিনায় যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর মা হোসেপা পেরেজ বুঝতে পারেন, এই বার্তা তাঁর মেয়ের স্বাভাবিক ভাষা নয়। এরপরই এস্থার নিখোঁজ হয়ে যান।
পরিবারের অনুসন্ধান ও সন্দেহ
প্রথমে পুলিশ ধারণা করে যে এস্থার স্বেচ্ছায় যোগাযোগ বন্ধ করেছেন, কিন্তু পরিবার ভিন্ন সন্দেহ পোষণ করে। মা ও বোন নিজেরাই খোঁজ শুরু করেন এবং তাঁরা খুঁজে পান মন্টিলাকে, যিনি শেষবার এস্থারের সঙ্গে ছিলেন এবং নিজেই ফোন করে জানান যে তিনি এস্থারকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই মানুষটিই ছিলেন হোস হুরাডো মন্টিলা।
ভয়ংকর অতীতের উন্মোচন
ইন্টারনেটে খোঁজ করতেই বেরিয়ে আসে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। মন্টিলা কোনো সাধারণ ট্রাভেল ব্লগার নন; তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি, যিনি অতীতে চারটি হত্যাকাণ্ডের জন্য দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। তবুও তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে একজন সহানুভূতিশীল ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করতেন, তাঁর ভিডিও, লোকেশন ও গল্প সবই ছিল প্রকাশ্যে।
ডিজিটাল ট্রেইল ও তদন্ত
মন্টিলার টিকটক ভিডিও, পোস্ট ও জিও-ট্যাগগুলো তদন্তের বড় সূত্র হয়ে ওঠে। এই ডিজিটাল ট্রেইল ধীরে ধীরে পুলিশের সন্দেহকে জোরালো করে। তথ্যচিত্রটির হেক্টর মুনিয়েত্তি উল্লেখ করেন যে এই কেসটি দেখায় সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যে জীবন দেখি, তা অনেক সময় সাজানো, ভুয়া এবং ভয়ংকরভাবে বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
সত্যের মুখোমুখি ও বিচার
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি খুলির সন্ধান পাওয়া যায়, যা পরে নিশ্চিত হয় এস্থারের। একই বছরের জুনে তাঁর শরীরের বাকি অংশও উদ্ধার করা হয়। মন্টিলা এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে তাঁকে এই মামলাসহ একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
ডিজিটাল যুগের সতর্কবার্তা
এই গল্পের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়। একজন নারী, যিনি পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছিলেন, তাঁর শেষ যাত্রা শেষ হয় এমন একজনের হাতে, যিনি নিজেকে বন্ধুসুলভ ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ‘দ্য টিকটক কিলার’ শুধু একটি ক্রাইম তথ্যচিত্র সিরিজ নয়, এটি আমাদের সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা, যা মনে করিয়ে দেয় যে ডিজিটাল যুগে মানুষকে চেনা যত সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই জটিল ও বিপজ্জনক হতে পারে।



