আন্দামান সাগরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মৃত্যুঝুঁকি: ২০২৫ সালে ৯০০ নিখোঁজ বা নিহত
ইন্দোনেশিয়ার উত্তর আচেহ প্রদেশের উলি মাদোনে একটি নৌকা থেকে নামছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। নভেম্বর ২০২৩-এর এই দৃশ্য ইউএনএইচসিআরের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রযাত্রা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সমুদ্রপথে মৃত্যুর হার বিশ্বে সর্বোচ্চ
গত বছর সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে প্রতি সাতজনে একজন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, যা সারা বিশ্বে শরণার্থীদের সমুদ্রযাত্রার যতগুলো পথ আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর হার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া রোহিঙ্গাদের অর্ধেকের বেশিই নারী ও শিশু, এবং ২০২৬ সালেও এই প্রবণতা কমেনি। চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৮০০-এর বেশি রোহিঙ্গা এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা বেছে নিয়েছেন।
ভয়াবহ নৌকাডুবি ও উদ্ধার অভিযান
সম্প্রতি আন্দামান সাগরে এক ভয়াবহ নৌকাডুবির ঘটনায় এসব তথ্যের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশ থেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা সমুদ্রপথে রওনা দেয়। উত্তাল সাগরে নৌকাটি ডুবে গেলে নিখোঁজ হন প্রায় ২৫০ জন। পরে ৯ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছ থেকে মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে ইউএনএইচসিআর, এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সব ধরনের সহায়তা দিতেও প্রস্তুত সংস্থাটি।
মানব পাচার ও নিরাপত্তাহীনতা: রোহিঙ্গাদের বাধ্যতামূলক পথ
মানব পাচার, নিপীড়ন এবং সমুদ্রে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার রোহিঙ্গা এই পথ বেছে নিচ্ছেন। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও সাগরে চলার অনুপযোগী এসব নৌকা সাধারণত বাংলাদেশের কক্সবাজার কিংবা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অধিকাংশ রোহিঙ্গা শরণার্থীই পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে মিয়ানমারে ফিরতে চান, কিন্তু সেখানে চলমান সংঘাত, নিপীড়ন আর নাগরিকত্ব পাওয়ার অনিশ্চয়তার ভেতরে তাঁরা তেমন কোনো আশার আলো দেখছেন না।
বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা
অন্যদিকে বাংলাদেশে তহবিলের অভাবে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অনেক কমে গেছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরে নিরাপত্তাহীনতা এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় রোহিঙ্গারা এই বিপজ্জনক পথে পা বাড়াচ্ছেন। ইউএনএইচসিআর বিভিন্ন দেশের প্রতি বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলোর সমাধান করতে এবং নিরাপদ ও বৈধ পথে যাতায়াতের সুযোগ বাড়াতে আহ্বান জানিয়েছে। মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং মানব পাচার ঠেকাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি সহায়তার দাবি
বর্তমানে এই অঞ্চলে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন, যাঁদের ১২ লাখই আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। তবে ২০২৫ সালের যৌথ মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে চাহিদার মাত্র ৫৩ শতাংশ অর্থ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়েছে যে, যদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট অব্যাহত থাকে, তবে রোহিঙ্গাদের এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা আরও বাড়তে পারে, যা মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।



