মোহাম্মদপুরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে কিশোর গ্যাং নেতা হত্যা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গত রোববার দিনের বেলায় প্রকাশ্যে ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন নামের এক কিশোর গ্যাং নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ইমন কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ছিলেন এবং ছিনতাই হওয়া একটি মুঠোফোন নিয়ে আরেক গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে তিনি খুন হন। খুনের আগে রোববার সকালে দুই দফায় তাঁদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ও তদন্তের অগ্রগতি
খুনের পর থেকে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। এ ঘটনায় ইমনের মা ফেরদৌসী বেগম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছেন, যেখানে ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রোববার ঘটনাস্থল থেকে মো. সাইফ (২৩), তুহিন (২০) ও মো. রাব্বী কাজী (২৫) আটক করা হয় এবং মামলা হওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আর গতকাল বিকেলে মো. সুমন (২৫) নামের আরেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আটক তিনজনের কাছ থেকে তিনটি চাপাতি, একটি কাটার, স্টিলের একটি পাত জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনই আরমান-শাহরুখ গ্রুপের সদস্য বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার পটভূমি ও দ্বন্দ্বের কারণ
সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুনের শিকার ইমন হোসেন দীর্ঘদিন ধরে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ১ নম্বর গেট-সংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং ওই এলাকার ভ্রাম্যমাণ দোকান, অটোরিকশার গ্যারেজ, নার্সারি থেকে চাঁদা তুলতেন। পাশাপাশি মাদক ব্যবসা, চুরি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে রায়েরবাজার ২ নম্বর গলি থেকে কাঁচাবাজার পর্যন্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করেন আরমান-শাহরুখ নামের আরেকটি কিশোর গ্রুপের সদস্যরা। দুই গ্রুপের সদস্যরাই আবার মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ দুই সন্ত্রাসীর সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন এবং এলাকা হওয়ায় আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে আগে থেকেই এ দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই রোববার এ খুনের ঘটনা ঘটে।
ডিএমপির গোয়েন্দা সূত্র বলছে, রোববার সকালে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ইমন ও আরমান-শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে, যা ছিনতাই হওয়া একটি মুঠোফোনের ভাগাভাগি নিয়েই শুরু হয়। ধাওয়া খেয়ে ইমনসহ তাঁর লোকজন রায়েরবাজার ২ নম্বর গলি এলাকায় এলে তাঁদের মধ্যে আরেক দফা কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিকেল চারটার দিকে আরমান ও শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা ইমনদের ধাওয়া দিলে তাঁরা রায়েরবাজার ঢালের ১ নম্বর গলির দিকে পালানোর চেষ্টা করেন, সেখানেই ইমনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। পরে আহত ইমনকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয় আতঙ্ক
ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায়, যেখানে দেখা গেছে চাপাতি হাতে ইমনকে ধাওয়া করছেন প্রতিপক্ষ গ্রুপের ১০ থেকে ১৫ জন। একপর্যায়ে একটি বাসার সামনে পড়ে যান তিনি এবং তারপর চারদিক ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে কোপানো হয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ইমনের বাঁ পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে ইমনকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যান হামলাকারীরা। পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে এ হত্যার সঙ্গে জড়িত ১০ থেকে ১২ জনকে চিহ্নিত করেছে তারা এবং তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ইমনকে হত্যার স্থানটি ইটের টুকরা ও কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে এবং পাশের বাড়ির দেয়ালে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেগে আছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাঝেমধ্যেই এ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে, তবে দিনের বেলা এভাবে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁরা আতঙ্কিত এবং ভয়ে দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন।
মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এবং বিভিন্ন সময় এলাকায় একাধিক গ্যাং গড়ে উঠেছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বেশির ভাগই তরুণ, যাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালান। পুলিশ বলছে, মোহাম্মদপুরে ৮-১০টি বাহিনী এখন সক্রিয় রয়েছে, যেমন গাংচিল, কবজি কাটা আনোয়ার, এলেক্স ইমন, আরমান-শাহরুখ, লও ঠেলা, লাড়া দে, লাল বাহিনী, বিরিয়ানি সুমন গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, দে ধাক্কা নামে পরিচিত।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা মোহাম্মদপুর-আদাবরের গ্যাং কালচারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন এবং যখন যে গ্রুপের সদস্যরা আইনের আওতায় আসেন, সেই গ্রুপের কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে যায়, পরে নতুন নামে আরেকটি গ্রুপ মাথাচাড়া দেয়। নিহত ইমন হোসেনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ থানায় হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ ১৮টি মামলা রয়েছে এবং অন্যদিকে আরমান ও শাহরুখের নামেও এসব থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।



