কুষ্টিয়ায় পীর শামীম হত্যা: থমথমে পরিস্থিতি, মামলা ও গ্রেফতার হয়নি
কুষ্টিয়ায় পীর শামীম হত্যা: থমথমে পরিস্থিতি, মামলা হয়নি

কুষ্টিয়ায় পীর শামীম হত্যা: থমথমে পরিস্থিতি, মামলা ও গ্রেফতার হয়নি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে আস্তানায় হামলা চালিয়ে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকায় এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে ঘটনার পর থেকে এখনও কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি এবং কোনও মামলা করা হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও দেখে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

ময়নাতদন্ত ও দাফন সম্পন্ন

রবিবার (১২ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জানাজা শেষে উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বিকাল ৪টার দিকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স এলাকায় পৌঁছালে ভক্তরা ভিড় জমান। দুপুর ১টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পীর শামীমের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

ময়নাতদন্তে মুখমণ্ডলে ১৫ থেকে ১৮টি এলোপাতাড়ি কোপের দাগ দেখা গেছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা হোসেন ইমাম বলেন, ‘মুখমণ্ডলের আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছেন। মাথা, ঘাড়, পিঠে তুলনামূলক গভীর জখমের চিহ্ন রয়েছে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হামলার পটভূমি

শনিবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শতাধিক লোকজন দরবারে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করা হয়। কয়েকজন আহত হন। পরে পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ফিলিপনগর এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাতটি আইডি থেকে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট হতে থাকে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা ভিডিওটি শনিবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে শেয়ার হতে থাকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পূর্বপরিকল্পিত হামলা

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হামলার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতার সঙ্গে কথা চলছিল, কিন্তু তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন। বেলা ২টা ৩৬ মিনিটের দিকে শতাধিক মানুষ দেশীয় লাঠিসোঁটা নিয়ে দরবারে হামলা চালায়। পুলিশের তুলনায় হামলাকারীরা বেশি থাকায় নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।’

দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, ‘যেসব আইডি থেকে ভিডিওগুলো ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোর দুই-একটির অ্যাডমিনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। এ ছাড়া হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ১৫ থেকে ১৮ জনকেও শনাক্ত করা গেছে। তবে এখনও তাদের কাউকে আটক করা হয়নি।’

পরিবারের প্রতিক্রিয়া

নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তখন মামলা করবো। এখনও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না।’ দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তাই মামলা হয়নি।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, ‘ধর্ম অবমাননা করা যেমন অন্যায়, তেমনি কোনও মানুষকে হত্যা করা, বাড়ি ভাঙচুর করা, হামলা চালানোও অন্যায়। আইনের ভিত্তিতে এর সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করা হবে।’

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হামলার ঘটনায় ভিডিও দেখে অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।’

জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত আছে। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। পার্শ্ববর্তী দৌলতপুরের লালনশিল্পী বাউল শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশের পাহারা রাখা হয়েছে।’

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

পীর শামীম ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ঢাকায় উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন, পরে আধ্যাত্মিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন। ২০২১ সালে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার হন।