বাগেরহাটে কুমিরের মুখে কুকুর: প্রশাসনের তদন্ত, প্রতিমন্ত্রীর উদ্বেগ
বাগেরহাটে কুমিরের মুখে কুকুর, তদন্ত চলছে

বাগেরহাটে কুমিরের মুখে কুকুর: তদন্তে প্রশাসন, প্রতিমন্ত্রীর উদ্বেগ

বাগেরহাটের হজরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে এক কুকুরকে কুমিরে ধরে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি ৮ এপ্রিল বিকেলে ঘটলেও শুক্রবার থেকে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার বিবরণ

দিঘির ঘাটে পানিতে ডুবে থাকা সিঁড়ির ধাপ থেকে কুকুরটি ওপরে উঠার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পা ওঠাতে পারছিল না। এ সময় সামনে পানিতে মাথা তুলে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে একটি কুমির। কুকুরটি উঠতে গিয়ে পানির মধ্যে আরও এক ধাপ নেমে যায় এবং কুমিরটি হাঁ করে মুখে তুলে টেনে পানির নিচে নিয়ে যায়। দিঘির ঘাটে দাঁড়িয়ে অনেকে এ দৃশ্য দেখছিলেন, কেউ কেউ মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন।

প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিও ও ছবি দেখে প্রাণিপ্রেমীদের হৃদয় কেঁদেছে। অনেকের ধারণা, কুকুরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের সামনে দেওয়া হয়েছে খাওয়ানোর জন্য। কেউ বলছেন, পা বেঁধে ফেলা হয়েছিল, আবার কারও মতে কুমিরকে দর্শনার্থীদের কাছে আনতে টোপ হিসেবে কুকুরটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যবহারকারীরা ‘কুমিরের মুখে কুকুরটাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে’ এমন অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশাসনের পদক্ষেপ

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানতে পেরে তিনি অনুসন্ধান করেছেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে যে কুকুরটি জলাতঙ্কগ্রস্ত ছিল এবং কয়েকজনকে কামড় দিয়েছিল। বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য মাটিচাপা দেওয়া কুকুরটির মৃতদেহ তুলে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন শনিবার বিকেলে ফেসবুকে পোস্ট করে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, ‘বাগেরহাটের ঘটনাটা আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়; বরং মানুষ হিসেবে ঘটনাটা আমাকে ব্যথিত করেছে।’ তিনি এই অমানবিক ঘটনার সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনা এবং যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় তার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাগেরহাট প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান।

স্থানীয়দের বক্তব্য

ঘটনার সময় মাজার এলাকায় থাকা এক ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রেতার ভাষ্য, কুকুরটি আগেও একবার পানি খেতে নামছিল এবং পরের বার কুমিরে টেনে নেওয়া হয়। পানিতে পড়ার আগে কুকুরটি খুব বেশি ঘেউ ঘেউ করছিল। স্থানীয় দুই তরুণের মতে, কুকুরটি কিছুটা অসুস্থ ছিল এবং মাজারের কয়েকজনকে কামড় দিয়েছিল। এক নারী দোকানি কুকুরটাকে তাড়া করলে এবং কিছু লোক লাঠি ছুড়ে মারলে পায়ে আঘাত পায় এবং চিৎকার করে। এর পরই কুকুরটি দিঘির প্রধান ঘাটের দিকে যায়।

মাজার সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

মাজারের খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, এই দিঘির কুমিরের আক্রমণে মানুষের আহত-নিহত হওয়ার রেকর্ড আছে। কুমিরটি বেশ খানিকটা এগিয়ে আসায় লোকজন ভয়ে সামনে এগোতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগ মোটেও সত্যি নয়। মাজার-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, পানির মধ্যে থাকা সিঁড়ি শেওলার কারণে পিচ্ছিল ছিল, এ কারণে কুকুরটি উঠে আসতে পারছিল না।

প্রাণিপ্রেমীদের প্রতিক্রিয়া

প্রাণিপ্রেমীরা কুমিরের মুখ থেকে কুকুরটিকে উদ্ধার করতে না পারার বিষয়টা মেনে নিতে পারছেন না। একজন শিক্ষক শাহ আলমগীর বাদশা লিখেছেন, ‘প্রথার দোহাই দিয়ে অবোধ প্রাণীকে পৈশাচিক উল্লাসে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া আমাদের বিবেক ও মনুষ্যত্বের চরম অবক্ষয়।’ অনেকেই আইনি কঠোরতা ও নৈতিক জাগরণের দাবি জানিয়েছেন।

তদন্তের অগ্রগতি

তদন্ত কমিটির প্রধান আতিয়া খাতুন জানান, তদন্ত কার্যক্রম চলমান এবং শিগগিরই ফলাফল জানানো হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শনিবার রাত আটটা পর্যন্ত পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসন ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেনি। এদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকজন প্রাণিপ্রেমী বাগেরহাটে এসে তদন্ত কমিটির সঙ্গে দেখা করেছেন এবং মাজার প্রাঙ্গণে ঘাটে থাকা কুকুরদের খাবার খাওয়ান।

মাজারে কুমিরের ইতিহাস

বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘির একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। কথিত আছে, হজরত খানজাহান আলী (রহ.) এই দিঘি খনন করে এক জোড়া কুমির ছেড়েছিলেন। তাদের বংশধর কুমিরদের মধ্যে পুরুষকে ‘কালা পাহাড়’ ও স্ত্রী কুমিরকে ‘ধলা পাহাড়’ ডাকা হতো। সর্বশেষ বংশধরের মৃত্যু হয়েছে ২০১৫ সালে। ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে ছাড়া হয়, কিন্তু কয়েকটি মারা যায়। সর্বশেষ যে দুটি ছিল, তার একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায়। বর্তমানে একটি কুমিরই দিঘিতে আছে।