খুলনায় দখল-চাঁদাবাজির নতুন চক্র: রেলের জমি থেকে নদীর ঘাট সর্বত্র
খুলনায় দখল-চাঁদাবাজির নতুন চক্র: রেলের জমি থেকে ঘাট

খুলনা জংশন রেলওয়ে স্টেশনের ভবনের দক্ষিণ পাশে রেলওয়ে কোয়ার্টার–সংলগ্ন জমিতে গড়ে উঠেছে মিষ্টান্ন তৈরির কারখানা ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এভাবে স্থাপনা গড়ে ওঠায় স্টেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

দখল-চাঁদাবাজির নতুন চক্র

খুলনায় রেলের জমি, নদীর ঘাট, বাজারসংলগ্ন খোলা জায়গা ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজ ঘিরে নতুন করে দখল ও চাঁদাবাজি চলছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পর শহরের বিভিন্ন এলাকায় রেলের জমিতে নতুন স্থাপনা উঠেছে, কোথাও দোকানঘর করা হয়েছে, কোথাও ঠিকাদারি কাজ বন্ধ করে চাঁদা আদায়ের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং প্রশাসনের অসাধু অংশের যোগসাজশের অভিযোগ এসেছে।

ঘাট এলাকায় দখল ফিরছে

রূপসা নদীর তীরবর্তী ঘাট এলাকা একসময় আলোচিত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের অপরাধজগতের কেন্দ্র ছিল। তাঁর ফাঁসির পর বড় বাজার ও ঘাট এলাকায় তুলনামূলক স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেখানে আবার দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনা সামনে এসেছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কারও কারও সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিনে ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সরকারি জমির কিছু জায়গায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন স্থাপনা উঠেছে। কোথাও অস্থায়ী স্থাপনা করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খুলনায় বর্তমানে রেলওয়ের ৭৬ একরের বেশি জমি অবৈধ দখলে রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক আশ্রয়ে সন্ত্রাসী

আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপের কিছু সদস্য রাজনৈতিক সংগঠনের কমিটিতে ঢুকে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। খুলনা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একজন প্রথম আলোকে বলেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটিতে সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর সদস্যদের অনেকে জায়গা করে নিয়েছে। কেবল ঘাট এলাকা নয়, শহরজুড়েই দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রেলের জমিতে থাকা স্কুলের সীমানাপ্রাচীর এবং রেলওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকদের বাসভবন ভেঙে সেটি দখলে নেওয়া হয়েছে। দখলের জন্য অনেকের নামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার বিভিন্ন ঘটনায় মিথ্যা মামলা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। উন্নয়নকাজেও ভাগ বসাচ্ছে চাঁদাবাজেরা। চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের তালিকাতেই শুধু খুলনা শহরে ৬৯ জন চাঁদাবাজ ও ১৮১ জন সন্ত্রাসীর নাম আছে।

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা

সন্ত্রাসীদের সঙ্গে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতার যোগসাজশের কারণে দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ। পুলিশসহ প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তিও এই প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছর বিএনপির তিন নেতার বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকাদেশও (ডিটেনশন) দেওয়া হয়েছিল। যদিও তাঁদের কাউকেই তখন পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রশাসনের দুর্বলতার কারণেই খুলনায় দখল, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। যেখানে অনিয়ম, সেখানে পুলিশও আছে।

রেল জমি দখলের চিত্র

খুলনা নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে রেলের জমি দখলের স্পষ্ট চিত্র দেখা যায়। পুরোনো রেলস্টেশন এলাকায় রেললাইনসংলগ্ন জায়গায় সারি সারি দোকানঘর। জোড়াগেট এলাকায় রেলের জমির ওপর স্থাপনা। হাসপাতাল রোডে সেমিপাকা দোকান। দৌলতপুর, বিশেষ করে কলেজ স্টেশন এলাকায় রেলের জায়গা ঘেঁষে পাকা ও টিনশেড স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কোথাও দোকান চালু হয়েছে, কোথাও নতুন স্থাপনা তোলার প্রস্তুতি দেখা গেছে। অনেক জায়গায় রেললাইনের পাশের খোলা অংশ আর আলাদা করে চেনার উপায় নেই। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব এলাকায় দখলের প্রবণতা বেড়েছে। অনেকে আবার দখলের কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছেন মামলা। এ ক্ষেত্রে শুরুতে তাঁরা জায়গা দখল করছেন। পরে রেল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে গেলে ক্ষতিপূরণের মামলা করছেন।

উন্নয়নকাজে চাঁদাবাজি

খুলনা সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি, কাজ বন্ধ করে দেওয়া, ঠিকাদারদের হুমকি-মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় কেউ মামলা করার সাহস করেননি। পুলিশও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ। অন্তত চারটি ঘটনা নিয়ে স্থানীয় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ১৪ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানিয়েছেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী 'বি কোম্পানি'ও 'আশিক বাহিনী' চাঁদার জন্য এসব কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। ঠিকাদারের লোকজনকে তুলে নিয়ে মারধর করে টাকা আদায় করে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও আছে।

সুশাসনের অভাব

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খুলনার বর্তমান পরিস্থিতি তিন স্তরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম স্তরে দৃশ্যমান দখল-রেলের জমি, ঘাট, পুকুর, স্কুলের প্রাচীর, পুরোনো ভবন, বাজারসংলগ্ন খোলা জায়গা। দ্বিতীয় স্তরে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ-চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি, বালু সরবরাহ, ঘাটের টোল, দোকান ভাড়া। তৃতীয় স্তরে রাজনৈতিক ছায়া-দলীয় পরিচয়, ওয়ার্ড কমিটি, স্থানীয় নেতার আশ্রয়, অভিযোগ উঠলে অস্বীকার। এই তিন স্তর মিলে খুলনায় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, এতে অপরাধ কেবল বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সীমিত থাকছে না; স্থানীয় ক্ষমতা, অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কেউ দখল করছে, কেউ দখল রক্ষা করছে, কেউ রাজনৈতিক পরিচয় দিচ্ছে, কেউ অস্বীকার করছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রশাসনের দুর্বলতার কারণেই খুলনায় মাদক, দখল, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। যেখানে অনিয়ম, সেখানে পুলিশও আছে। কোনো না কোনোভাবে তারা জড়িত থাকে। খুলনায় হাজী মুহম্মদ মুহসীন এস্টেটসহ বড় এস্টেটগুলোর জমিও প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনকে 'ম্যানেজ' করে দখল করছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র এখনো নিরাপত্তা দিতে পারছে না। পুলিশও দিতে পারছে না। সে কারণে কেউ মামলা করতে চায় না, কথাও বলতে চায় না।