দ্রুত সামরিক সক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে ইরান, ড্রোন বানানো শুরু
দ্রুত সামরিক সক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে ইরান, ড্রোন বানানো শুরু

প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করছে ইরান। এমনকি গত এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতির মধ্যে ড্রোন বানানোও শুরু করে দিয়েছে। এমন খবর পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গোয়েন্দা সূত্র সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতার কিছু অংশ ইতিমধ্যে পুনর্গঠন শুরু করেছে তেহরান। আরও চারটি সূত্র বলেছে, পুনরুদ্ধারের গতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি।

গোয়েন্দা তথ্যে কী উঠে এসেছে?

গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলোর মতে, চলমান সংঘাতের সময় ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র ও অস্ত্র কারখানা ধ্বংস হয়েছিল। এখন সেগুলো আবার সচল করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার হামলা শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য ইরান এখনো বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে। কারণ আগে দাবি করা হয়েছিল, ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের জন্য তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য

মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরিতে ভিন্ন ভিন্ন সময় লাগতে পারে। তবে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই ইরান তাদের ড্রোন হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারবে। তিনি আরও বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যতটা অনুমান করেছিল, ইরান তার চেয়েও দ্রুত অগ্রগতি করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ড্রোন হামলা নিয়ে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ এখন ড্রোন হামলা। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরান তাদের ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ঘাটতি পুষিয়ে নিতে আরও বেশি ড্রোন ব্যবহার করতে পারে। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো এই দুই ধরনের অস্ত্রের নাগালের মধ্যেই পড়ে। ফলে ড্রোন দিয়ে এসব দেশে অনবরত হামলা চালানো ইরানের পক্ষে সম্ভব।

যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার অবস্থা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে বিরতি শুরু হয় ৮ এপ্রিল থেকে। তারপর ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একদফায় আলোচনায় বসলেও তারপর ঝুলে যায়। শান্তিচুক্তি না হলে ইরানে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়ে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন করে বোমা হামলা শুরু করা থেকে তিনি মাত্র এক ঘণ্টা দূরে ছিলেন, গত মঙ্গলবার এমনটাই বলেছিলেন তিনি। যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের এই পুনর্গঠিত সামরিক সক্ষমতাগুলোই আবার সামনে চলে আসবে।

দ্রুত পুনরুদ্ধারের কারণ

ইরানের এত দ্রুত সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে। এর মধ্যে বড় হলো রাশিয়া ও চীনের সমর্থন। পাশাপাশি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরান আসলে ধারণার চেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া চলমান সংঘাতের মধ্যেও চীন ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে গেছে। তবে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে এই সরবরাহ এখন কিছুটা কম।

চীনের ভূমিকা

গত সপ্তাহে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সিবিএস নিউজকে বলেছেন, ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির যন্ত্রাংশ দিচ্ছে চীন। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। অবশ্য এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে নাকচ করেন।

মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন

মার্কিন গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো সচল রয়েছে; অর্থাৎ তেহরানকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, তাঁদের কমান্ড গোয়েন্দা–সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকাশ করে না।

পেন্টাগনের বক্তব্য

পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল সিএনএনকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী। প্রেসিডেন্ট যখন ও যেখানে চাইবেন, সেখানে অভিযান চালানোর সব সক্ষমতা আমাদের আছে।’ তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন অঞ্চলে সফল সামরিক অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা ও স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় অস্ত্রভান্ডারও রয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্রের অবস্থা

এর আগে গত এপ্রিলে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্কিন হামলার পরও ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র অক্ষত রয়েছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা এখন দুই–তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধবিরতির সময়ে মাটিচাপা পড়া উৎক্ষেপণ যন্ত্রগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে তেহরান। এর আগে দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছিল, ইরানের হাজার হাজার ড্রোন এখনো অক্ষত রয়েছে, যা দেশটির মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ।

উপকূলীয় প্রতিরক্ষা

গোয়েন্দা তথ্যে আরও উঠে এসেছে, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশ অক্ষত রয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলায় ইরানের জাহাজে আঘাত হানলেও উপকূলীয় সামরিক স্থাপনাগুলোতে তেমন মনোযোগ দেয়নি। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই হরমুজ প্রণালি অচল করে রাখার ক্ষেত্রে ইরানের প্রধান হাতিয়ার।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

সামগ্রিকভাবে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো বলছে, যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করেছে ঠিকই, তবে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছে, এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তারা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম। প্রতিরক্ষা শিল্প ঘাঁটি পুনর্গঠনেও ইরান আশাতীত অগ্রগতি দেখিয়েছে। অথচ গত মঙ্গলবার সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেছিলেন, ইরানের এই ঘাঁটিগুলো অনেকাংশেই ধ্বংস করা হয়েছে।

কুপারের বক্তব্যের বিপরীতে

হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটিতে শুনানিতে কুপার বলেন, অপারেশন এপিক ফিউরির মাধ্যমে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং তাদের ৯০ শতাংশ সমরাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা পুনর্গঠন করতে ইরানের বহু বছর লেগে যাবে। তবে কুপারের এই বক্তব্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত। দুটি সূত্র সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে, ইরানের সামরিক পুনর্গঠনের সক্ষমতা ও সময়সীমা নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সঙ্গে কুপারের দাবির কোনো মিল নেই।

সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানায়, ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প ঘাঁটির এই ক্ষতি দেশটিকে বড়জোর কয়েক মাস পিছিয়ে দিতে পারে, কোনোভাবেই তা বছরে গড়াবে না। সূত্রটি আরও জানায়, ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের কিছু অংশ এখনো সম্পূর্ণ অক্ষত, যা নির্দিষ্ট কিছু সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত করছে।