গাজায় ফিলিস্তিনি বন্দির ছবি পোস্ট করে ‘বিক্রির জন্য’ ক্যাপশন ইসরায়েলি সেনার
ইসরায়েলি সেনার ‘বিক্রির জন্য’ পোস্টে ফিলিস্তিনি বন্দির পরিচয়

গাজায় যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার কিছু স্মৃতি শেয়ার করতে গিয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর নিজের ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ৯টি ছবির একটি অ্যালবাম পোস্ট করেন হারেল আমশিকা নামের এক ইসরায়েলি সেনা। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানো বছরগুলো ‘দ্রুত কেটে গেছে, তবে বড় দাগ রেখে গেছে’। তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘এমন সময়ে একজন যোদ্ধা হতে পারাটা গৌরবের... অনিদ্রার রাতগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা... এবং একটি সুদীর্ঘ যুদ্ধ। বন্ধুদের জন্য যারা পরিবারে পরিণত হয়েছে। এমন কিছু অভিজ্ঞতার জন্য যা ভালো বা মন্দের খাতিরে কখনো পাব বলে ভাবিনি।’

আমশিকা তার ইউনিট শাকেদ ব্যাটালিয়নকে ধন্যবাদ জানান, যা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গিভাতি ব্রিগেড-এর অধীনে পরিচালিত। গাজায় নিহত তার পরিচিত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি নিজের প্রোফাইলে শাকেদ ব্যাটালিয়নের যুদ্ধকালীন চিকিৎসক ইডো জানোর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।

ছবিতে যা দেখা যায়

ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা সেই ছবিগুলোর একটিতে দেখা যায়, এক ফিলিস্তিনি যুবক সাদা রঙের সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা একটি হ্যাজম্যাট স্যুট পরে আছেন এবং তার ডান কাঁধের ঠিক নিচে কালো মার্কার কলম দিয়ে ‘বি ফোর’ লেখা রয়েছে। যুবকের পা দুটি খালি, হাত ও পায়ের গোড়ালি বাঁধা। তিনি একটি সিমেন্টের ব্লকের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছেন। তার চোখ সবুজ রঙের একটি কাপড় বা টেপ দিয়ে বাঁধা। তার ঠিক ওপরে, পাশের আরেকটি ব্লকের চূড়ায় অন্য একজন মানুষের শরীরের নিচের অংশ দেখা যাচ্ছে, যার হাত ও পা প্লাস্টিকের জিপ টাই দিয়ে বাঁধা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এই ছবিটির ওপর একটি ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। যাতে লেখা ছিল: ‘বিক্রির জন্য’।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরে এই ইনস্টাগ্রাম পোস্টটি মুছে ফেলা হয়। এমনকি আমশিকার পুরো অ্যাকাউন্টটিই ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। যদিও তিনি প্রায় একই নামে আরেকটি নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছেন যার প্রোফাইলে লেখা রয়েছে, ‘শুধু বিনোদনের জন্য’। তবে আগের সেই পোস্টের আর্কাইভ কপি এবং স্ক্রিনশটগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

পরিবারের শনাক্তকরণ

গ্লোবাল লিগ্যাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (গ্ল্যান)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার বাসিন্দা জহরা শোরাব নামের এক ফিলিস্তিনি নারী ছবিটি দেখতে পান এবং ছবির মানুষটিকে নিজের নিখোঁজ ছেলে মোহাম্মদ শোরাব হিসেবে শনাক্ত করেন। তিনি জানান, ছবির মানুষটির হাত, চুল ও পা হুবহু তার ছেলের মতোই।

৪১ বছর বয়সী মোহাম্মদের একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, যার কারণে তার সার্বক্ষণিক সামাজিক ও পারিবারিক যত্নের প্রয়োজন হতো। ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট তিনি নিখোঁজ হন। সেদিন সন্ধ্যার নামাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর পরিবার আর কখনও তার দেখা পায়নি।

প্রায় দেড় বছর ধরে পরিবারটি তার সন্ধান করছিল। জহরা যখন ইসরায়েলি সেনার ওই ‘বিক্রির জন্য’ পোস্টটি দেখেন, কেবল তখনই তারা মোহাম্মদের ভাগ্যে কী ঘটেছে সে সম্পর্কে সামান্য ধারণা পান।

মায়ের প্রতিক্রিয়া

সাংবাদিক আলী আসমারের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জহরা শোরাব বলেন, ‘ফিলিস্তিনি মানুষ কি এতটাই সস্তা হয়ে গেছে যে তাদের বিক্রির জন্য তোলা হচ্ছে? আমাদের সঙ্গে যা ঘটছে তা অত্যন্ত নিষ্ঠুর... এটা সহ্য করা যায় না যে তারা আমাদের এভাবে ছিন্নভিন্ন করছে এবং একজন ফিলিস্তিনিকে বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।’

জহরা প্রশ্ন তোলেন, ‘মানুষের কি আর কোনও মূল্য নেই? আমরা তো মানুষ। আমরা জনগণ... কীভাবে তারা তাকে এভাবে মূল্যহীন একটি বস্তুতে পরিণত করতে পারলো?’

আইনি পদক্ষেপ

মোহাম্মদের মা তাকে ছবিতে শনাক্ত করার পর, গ্ল্যান ইসরায়েলি সংস্থা হামোকেড-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে, যা দখলদারত্বের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনিদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হামোকেড পরিবারের পক্ষ থেকে ইসরায়েল কারা কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চায় যে মোহাম্মদকে কোথায় রাখা হয়েছে।

জবাবে ইসরায়েল কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের রেকর্ড খতিয়ে দেখে মোহাম্মদ শোরাবকে তাদের কোনও কেন্দ্রে আটক বা বন্দি রাখার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অথচ গ্ল্যান তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘ছবিটি বাস্তব। যে সেনা এটি তুলেছেন তার নাম জানা গেছে। ইউনিটটি চিহ্নিত করা হয়েছে। এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে ওই ব্রিগেড যে সেই এলাকায় সক্রিয় ছিল, তাও নিশ্চিত হওয়া গেছে।’

সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া

মোহাম্মদ শোরাব এবং হারেল আমশিকার বিষয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন নিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। জবাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পরিচালিত তদন্তের ভিত্তিতে, মুহাম্মদ রাবি সাইদ শোরাব নামের কোনও ব্যক্তিকে বর্তমানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কোনও বন্দিশালায় রাখা হয়েছে বা যুদ্ধ চলাকালীন রাখা হয়েছিল বলে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘উপস্থাপন করা ছবিটির বিষয়ে বলা যায়, ছবিতে থাকা ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ছবিটি দুই বছরেরও বেশি সময় আগে তোলা হয়েছিল এবং এতে জড়িত ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে চাকরি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন এবং তারা এখন আর সেনাবাহিনীতে কর্মরত নন। ছবিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। যুদ্ধজুড়ে বন্দিদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ে বাহিনীকে নির্দেশনা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।’

ছবিটি পোস্ট করার অপরাধে আমশিকার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাব প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দেয়নি।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন

এদিকে গত সোমবার, জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়াররা ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো নির্যাতনের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। সেখানে যাচাইকৃত সাক্ষ্যের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বন্দিদের ওপর ‘বারবার ও গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, তাদের পেছনে কুকুর লেলিয়ে দেওয়া’, ‘দীর্ঘ সময় হাত ও চোখ বেঁধে রাখা, বিছানার সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে পাইপ দিয়ে খাবার খাওয়ানো’ হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বন্দিদের ‘দীর্ঘ সময় খাবার ও ঘুম থেকে বঞ্চিত রাখা, পানি ও চিকিৎসা সেবা না দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ তীব্র শীতে ফেলে রাখা, নুড়িপাথরের ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য করা, ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা, ব্ল্যাকমেইল করা, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া এবং ভ্রম সৃষ্টিকারী ওষুধ খাইয়ে দেওয়ার’ মতো ঘটনা ঘটছে।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে গাজার ‘জরুরি স্বাস্থ্যকর্মীদের জোরপূর্বক নিখোঁজ করা এবং নির্বিচারে আটকে রাখার’ বিষয়টিরও উল্লেখ করা হয়েছে।