লিবিয়ায় দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরের আরও এক যুবকের মৃত্যু
লিবিয়ায় দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরের যুবকের মৃত্যু

অবৈধপথে ইতালিতে যাওয়ার পথে লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরের আরও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বেলা ১টার দিকে লিবিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহতের পরিচয়

নিহত তছির ফকির (৪০) রাজৈর উপজেলার ঘোষালকান্দি গ্রামের কালু ফকিরের ছেলে। গতকাল মঙ্গলবার পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। তছিরের পরিবার জানায়, চাহিদামতো মুক্তিপণের ৪৮ লাখ টাকা দেওয়ার পরও কষ্ট দিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত বাংলাদেশি দালালের বিচার দাবি করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।

পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট

গত দুই মাসে মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার দুই তরুণ ও কালকিনির এক যুবকের মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে দালালের নির্যাতনে লিবিয়ায় মৃত্যু হয়েছে। এর আগে নৌকাডুবিতে অভিবাসনপ্রত্যাশী ব্যক্তিরা মারা গেলেও দালালের নির্যাতনে বন্দিশালায় মৃত্যুর ঘটনা তেমন একটা ঘটেনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঘটনার বিবরণ

নিহত তছিরের স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তছির ফকির চায়ের দোকানি ছিলেন। দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালাতেন। তাঁর তিন মেয়ে, স্ত্রী ও মা-বাবা রয়েছেন। আট মাস আগে পাশের পূর্ব স্বরমঙ্গল গ্রামের মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য রফিকুল ইসলাম ওরফে বাঘা দালালের খপ্পড়ে পড়েন তিনি। দালালের কথামতো অবৈধপথে ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন তছির। প্রথমে তছিরের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়ে তাঁকে দুবাই হয়ে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছানোর পর বন্দিশালায় আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতনের পর পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের ২০ লাখ টাকা আদায় করে লিবিয়ায় বসবাসকারী বাংলাদেশি দালালেরা। একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তছিরকে লিবিয়ার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার কথা বলে দালাল চক্র আরও আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বেলা ১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দালালের বর্তমান অবস্থা

ঘটনার পর রফিকুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাঁর মুঠোফোন নম্বরে একাধিবার যোগাযোগ করলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

স্বজনদের বক্তব্য

নিহত তছিরের ভাই শাহিন ফকির বলেন, ‘মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রথমে এক দালাল জানায়, আমার ভাই আর নাই। পরে লিবিয়ায় খোঁজ নিই। সেখানে বন্দিশালায় থাকা এক বাংলাদেশি ফোন করে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি মরদেহের ছবিও আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন।’ শাহিন ফকির আরও বলেন, ‘ভাইকে বিদেশে পাঠানোর জন্য জমিজমা সব বিক্রি করে দালালকে টাকা দিয়েছি। আমরা এখন নিঃস্ব। না পারল আমার ভাই বিদেশ যেতে, না পারছি টাকা ফিরে পেতে। দালাল রফিকের বিচার চাই।’

নিহত তছিরের স্ত্রী এসমোতারা বেগম আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমার তিনটা মেয়ে। অগো এহন কী হইব? কেডায় দেখব অগো? আমাগো যা ছিল, সব শ্যাষ। দালাল টাকাও নিল, আমার স্বামীর জীবনডাও কাইড়া নিল। তারে দফায় দফায় নির্যাতন করে মারছে। অনেক কষ্ট দিয়া মারছে। আমি এর বিচার চাই।’

প্রশাসনের পদক্ষেপ

রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুল হক বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন করলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অনুসন্ধান) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘লিবিয়ায় সন্ত্রাসী বা দালালের নির্যাতনে এক যুবকের মৃত্যুর খবর আমরা শুনেছি। নিহতের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা থানায় গিয়ে দালাল ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’