পাকিস্তানের আকাশসীমায় ঢুকে গত বুধবার ড্রোন হামলা চালায় আফগান তালেবান। আল–জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার কিছু অংশে এই হামলার পর পাকিস্তান দাবি করে, তারা অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে চারটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
পাল্টাপাল্টি হামলার ধারা
এর ঠিক দুদিন আগে আফগানিস্তানের পাক্তিয়া ও কুন্নার প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছিল পাকিস্তান বলে জানিয়েছে দ্য ইনডিপেনডেন্ট। ওই হামলায় ২৯ জঙ্গি নিহত হয় বলে পাকিস্তানের দাবি। তবে তালেবান সরকার জানায়, নিহতের সংখ্যা অন্তত ৩৬ জন এবং তারা বেসামরিক নাগরিক।
পাল্টাপাল্টি এই হামলা প্রমাণ করে যে একসময়ের কৌশলগত মিত্র এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র এখনো প্রকাশ্য যুদ্ধে লিপ্ত। ২০২১ সালের আগস্টে কাবুলের পতনের পর আফগান তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় আসাকে পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে নিজেদের কৌশলগত বিজয় হিসেবে উদ্যাপন করেছিল। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই উচ্ছ্বাস হারিয়ে গেছে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে।
‘অপারেশন গজব-লিল হক’ ও সংঘাতের সূত্রপাত
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে গত বছরের অক্টোবর মাস থেকেই সংঘাত চলছিল। তবে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে শুরু করে ‘অপারেশন গজব-লিল হক’। এই সংঘাতের পেছনের কারণগুলো কেবল সীমান্ত হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে প্রক্সি গোষ্ঠীর তৎপরতা, অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ব্যর্থতা আড়ালের চেষ্টা, ডুরান্ড লাইন বিতর্ক এবং পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক চাল।
টিটিপি ও ‘পারস্পরিক ব্ল্যাকমেল’
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চলমান এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তানি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। কাবুলে একটি পাকিস্তানপন্থি সরকার থাকলে ভারতের প্রভাবমুক্ত কৌশলগত সুবিধা পাওয়া যাবে—দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই আশায় আফগান তালেবানকে সমর্থন দিয়ে এসেছিল পাকিস্তান। কিন্তু তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই সমীকরণ সম্পূর্ণ উল্টে যায়।
ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইসলামাবাদের (আইএসএসআই) গবেষক আমিনা খানের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, টিটিপি বর্তমানে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান তালেবান তাদের দীর্ঘদিনের আদর্শিক মিত্র টিটিপিকে আফগান ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে এবং সেখান থেকে তারা পাকিস্তানে প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিষয়টিকে কেবল একতরফা অভিযোগ হিসেবে দেখছেন না। আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোয়েটাভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক রহিম নাসারি এই পরিস্থিতিকে পারস্পরিক ব্ল্যাকমেল (মিউচুয়াল ব্ল্যাকমেল) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
নাসারির মতে, পাকিস্তান নিজের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ব্যর্থতা আড়াল করার জন্যই আফগানিস্তানের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ জুন পাকিস্তানের করাচিতে আধাসামরিক বাহিনীর একটি সুরক্ষিত কম্পাউন্ডে টিটিপির উপদল জামায়াত-উল-আহরারের হামলায় তিন সেনা নিহত হন। আফগান সীমান্ত থেকে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হামলাকারীরা কীভাবে করাচি পৌঁছাল এবং রসদ সংগ্রহ করল, সেটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার এক বিশাল ব্যর্থতা। কিন্তু পাকিস্তান এর দায় সরাসরি কাবুলের ওপর চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়ালের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে আফগান তালেবানও কূটনৈতিকভাবে পিছিয়ে নেই। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ১ জুলাইয়ের ড্রোন হামলার পর তালেবানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করে, তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আইএসআইএল-কের (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ত–খোরাসান প্রভিন্স) কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হেনেছে, যেখান থেকে আফগানিস্তানে নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
তালেবানের ড্রোন প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’
কেন এই যুদ্ধ থামছে না, তার আরেকটি বড় কারণ হলো তালেবানের অভাবনীয় প্রযুক্তিগত বিবর্তন। নিউ লাইনস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তালেবানরা চীন থেকে কৃষিকাজে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক ড্রোন আমদানি করে নিজস্ব প্রকৌশলীদের মাধ্যমে সেগুলোকে মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত করেছে। ড্রোনের রাসায়নিক ট্যাংক সরিয়ে সেখানে থ্রিডি-প্রিন্টেড প্লাস্টিক র্যাক বসিয়ে আরডিএক্স বিস্ফোরকযুক্ত মর্টার শেল ব্যবহারের প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছে।
এর বিপরীতে পাকিস্তানের সামরিক কৌশলও অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। আল–জাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট বর্তমানে নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা (কন্ট্রোলড এসক্যালেশন) নীতি অনুসরণ করছে। এর অর্থ হলো, তারা টিটিপির মতো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলার অত্যন্ত কঠোর ও বিধ্বংসী জবাব দিচ্ছে, কিন্তু আফগান তালেবান সরকারের সরাসরি হামলার ক্ষেত্রে তারা মেপে মেপে পাল্টা আঘাত করছে। পাকিস্তান ভালো করেই জানে, আফগানিস্তানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ প্রচলিত যুদ্ধ শুরু হলে তা কেবল দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুলই হবে না, বরং পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের সামরিক শক্তিকে আটকে ফেলবে এবং পূর্ব সীমান্তে ভারতের বিপরীতে কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করবে।
ডুরান্ড লাইন বিতর্ক ও ভারতের ‘পরিবেষ্টন নীতি’
এই সংঘাতের আগুনে সব সময় ঘি ঢেলে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ডুরান্ড লাইন বিতর্ক। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশদের টানা ১ হাজার ৬২২ মাইলের এই সীমান্তরেখাকে আফগানিস্তান কখনোই স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে মেনে নেয়নি। দ্য হিন্দুর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে নিয়মিত সংঘাত ঘটছে। এর পাশাপাশি, ২০২৫ সালে পাকিস্তান থেকে ১০ লাখের বেশি আফগান শরণার্থীকে জোরপূর্বক বহিষ্কারের ঘটনা তালেবান সরকারকে চরম ক্ষুব্ধ করেছে।
দ্বিপক্ষীয় এই সংঘাতে পর্দার আড়ালে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে ভারত। চ্যাথাম হাউসের গবেষক হামিদ হাকিমি আল–জাজিরা ইংলিশের ‘ইনসাইড স্টোরি’ অনুষ্ঠানে বলেন, পাকিস্তানের বড় ভয় হলো আফগানিস্তানে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। পাকিস্তান প্রকাশ্যে অভিযোগ করছে যে আফগান তালেবান এখন ভারতের একটি ‘প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করছে। ২০২১ সালের পর থেকে ভারত অত্যন্ত কৌশলগতভাবে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে। পাকিস্তানের সামরিক নীতিনির্ধারক মহল এটিকে ভারতের পরিবেষ্টন নীতি (এনসার্কেলমেন্ট পলিসি) হিসেবে দেখছে।
পরাশক্তির ব্যর্থতা
এই যুদ্ধে অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছে চীন। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, বেইজিং এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা রক্ষায় মরিয়া। কারণ, তাদের মেগা প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এবং এর অংশ ৬৫ বিলিয়ন ডলারের ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর’ (সিপিইসি)-এর সফলতা এই দুই দেশের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা চীনের দোরগোড়ায় চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে, যা জিনজিয়াং প্রদেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। এই আশঙ্কা থেকে গত এপ্রিলে চীনের উরুমকিতে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও তালেবান প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা প্রমাণ করে যে চীনের সেই শান্তিপ্রয়াস মুখ থুবড়ে পড়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করলেও তারা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে এবং পাকিস্তানের ‘আত্মরক্ষার অধিকারকে’ সমর্থন জানিয়েছে। অপরদিকে গত বছরের জুলাই মাসে রাশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব আরও পাকাপোক্ত করেছে।
জবরদস্তিমূলক কূটনীতি
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এত অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের পরও কেন দুই দেশ সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছে? কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) এক বিশেষ নিবন্ধে গবেষক ড্যানিয়েল মার্কি এই পরিস্থিতিকে জবরদস্তিমূলক কূটনীতি (কোয়ার্সিভ ডিপ্লোমেসি) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
মার্কির মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয়েই একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত ফাঁদে আটকা পড়েছে, যেখানে কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়। পাকিস্তান চায় তালেবান টিটিপিকে দমন করুক, অন্যদিকে তালেবান তাদের দীর্ঘদিনের আদর্শিক মিত্রকে ছুড়ে ফেলতে নারাজ। ফলে যখন কূটনীতি বা আলোচনা ব্যর্থ হয়, তখন তারা একে অপরের ওপর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে। আবার যখন যুদ্ধ ব্যয়বহুল ও কম ফলপ্রসূ মনে হয়, তখন তারা সাময়িকভাবে যুদ্ধবিরতি করে পুনরায় আলোচনায় বসে। কিন্তু মৌলিক ভূরাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান না হওয়ায় কয়েক মাস পরই আবার যুদ্ধ শুরু হয়। মার্কির মতে, এই অন্তহীন চক্রই হলো জবরদস্তিমূলক কূটনীতি।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও উপসংহার
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার বর্তমান পরিস্থিতি ভূরাজনীতির এক রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে। এটি দেখায়, ভুল কৌশল ও প্রক্সি–নির্ভরতা কীভাবে একটি রাষ্ট্রের জন্য বুমেরাং হয়ে আসতে পারে। একসময় পাকিস্তান যে তালেবানকে নিজেদের কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে, সেই তালেবানই আজ ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক সুরক্ষাবলয়ে আঘাত হানছে।
আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফাহাদ নাবিল ও রিকার্ডো আলভারেজ স্পষ্ট করেই বলেছেন, এই সংঘাতগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংহত সামরিক ধরনে রূপ নিয়েছে। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংঘাতের ফলে দুই দেশের প্রধান দুটি সীমান্ত ক্রসিং তোরখাম ও চামান ঘন ঘন বন্ধ থাকছে, যার ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় স্থবির। সাধারণ ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে পড়ছেন এবং সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
তবে এটা বোঝা যাচ্ছে, এই সংঘাত শিগগিরই থামার কোনো লক্ষণ নেই। টিটিপি এবং ডুরান্ড লাইন ইস্যুর রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলবেই। সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হলো, রাষ্ট্রগুলোর ছায়াযুদ্ধ ও সীমান্ত সংঘাতের শূন্যস্থানে যদি নতুন করে আল-কায়েদা বা আইএসআইএস–কের মতো আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। সামরিক আগ্রাসন বা নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা দিয়ে এই ভূরাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে দুই দেশকেই সংঘাতের পথ ছেড়ে গঠনমূলক কূটনীতির পথে হাঁটতে হবে।



