পুতিনের নওরোজ শুভেচ্ছা: ইরানের জন্য প্রতীকী বার্তা, রাজনৈতিক নিরাপত্তা নয়
পুতিনের নওরোজ শুভেচ্ছা: ইরানের জন্য প্রতীকী বার্তা

পুতিনের নওরোজ শুভেচ্ছা: ইরানের জন্য প্রতীকী বার্তা, রাজনৈতিক নিরাপত্তা নয়

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে নওরোজ বা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তবে, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই শুভেচ্ছা বার্তাকে বিশ্লেষকরা একটি মৌসুমি শিষ্টাচার হিসেবে দেখছেন, যা ইরানের জন্য কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেয় না। ক্রেমলিন থেকে এই ঘোষণা আসলেও, রাশিয়ার কৌশলগত মানসিকতা ইঙ্গিত করে যে পুতিন ইরানকে একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন, যা প্রয়োজনে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলা যায়।

কৌশলগত অংশীদারত্ব নাকি স্বার্থের খেলা?

তেহরান ও মস্কোর মধ্যে বহুল আলোচিত ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি, বিপদের সময় ইরানকে রক্ষার কোনো গ্যারান্টিও এখানে অনুপস্থিত। আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাশিয়া কখনোই অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হয়নি। বরং, তারা অন্যদের সাময়িক সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে, যা তাদের স্বার্থে কাজে লাগানো যায়। ইরানের ভেতরেও অনেক কর্মকর্তা নিভৃতে স্বীকার করেন যে, ১৯৭৯ সালের শাহর পতনের পর থেকে ইরান যে ভয়াবহ সংকটে রয়েছে, সেখানে মস্কোর কাছ থেকে কার্যত কোনো অর্থবহ সহায়তা তারা পায়নি।

রাশিয়ার সম্পর্কের প্রকৃতি: লেনদেনভিত্তিক ও একতরফা

আমেরিকান ঐতিহাসিক স্টিফেন কোটকিনের মতে, পুতিন জোট গঠন করেন না; বরং তিনি প্রভাব বিস্তারের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যার মেয়াদ তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন তা রক্ষার ব্যয় রাশিয়ার স্বার্থের চেয়ে বেড়ে যায়। পুতিনের নওরোজ শুভেচ্ছা তাই কোনো রাজনৈতিক সমর্থন বা সামরিক প্রতিশ্রুতির অংশ নয়। এটি কেবল একটি প্রতীকী বাক্য, যা ইরানকে কোনো হামলা থেকে সুরক্ষা দেবে না। রাশিয়ার কাছে ইরান এমন এক ঘুঁটি, যাকে যেকোনো মুহূর্তে বিসর্জন দেওয়া যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি রাশিয়ার সব কর্মকাণ্ডকে ব্যাখ্যা করে, কারণ রাশিয়া কখনো অন্য কোনো মিত্রের জন্য যুদ্ধে জড়ায় না; তারা কেবল নিজের জন্যই যুদ্ধে অংশ নেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিহাসের প্রমাণ: মিত্রতা নাকি ব্যবহার?

ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। সাদ্দাম হোসেন যখন আক্রান্ত হন, তখন মস্কো সেই আক্রমণের বিরুদ্ধে সামান্যতম আপত্তিও তোলেনি, যদিও দশকের পর দশক তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এটি কোনো অনুগত মিত্রের আচরণ নয়; বরং এমন এক রাষ্ট্রের আচরণ, যারা অন্যদের কেবল আয়ের উৎস হিসেবে দেখে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা সিরিয়ার বাশার আল আসাদের ক্ষেত্রেও দেখেছি। এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি কার্যত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট নন; বরং মস্কোর একজন রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে বাস করছেন। তাঁর নিজ দেশে আজ রাশিয়ার প্রভাব থাকলেও আসাদের নিজের কর্তৃত্ব বলতে কিছু নেই।

বর্তমান প্রস্তাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

মস্কো ইরানের পরিস্থিতিকে মিত্রতার বদলে দর-কষাকষির ঘুঁটি হিসেবে দেখছে, যা সম্প্রতি ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো একটি চাঞ্চল্যকর প্রস্তাবে স্পষ্ট। রাশিয়া জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানকে গোয়েন্দা সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করবে। ওয়াশিংটন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে, মস্কো আবার তার পুরোনো ভূমিকায় ফিরে যায়—যা হলো দর্শকের ভূমিকা, যে কেবল দর-কষাকষি করতে জানে, কিন্তু রক্ষা করতে জানে না। ইরান আজ চারপাশ থেকে আক্রান্ত হওয়ার সময় খুব ভালোভাবেই জানে যে, মস্কো কখনোই তাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়াবে না। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, রাশিয়ার কোনো বন্ধু নেই, আছে শুধু স্বার্থ। আর স্বার্থ কখনোই দুর্বলের পক্ষে থাকে না।