কিউবার অন্ধকার রাত আলোকিত করতে রাশিয়ার সাহসী তেল সরবরাহ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা চরম জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এই সংকটের প্রভাবে দেশটির বেশিরভাগ এলাকায় রাতের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অন্ধকারে ঢেকে থাকে, লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় জনজীবন চরম সংকটে পড়েছে।
রাশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সাহায্যের হাত
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কিউবাকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছে তার বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়া। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির জন্য রাশিয়া তেলবাহী ট্যাঙ্কার জাহাজ পাঠিয়েছে, যা কিউবার নাগরিকদের মধ্যে কিছুটা হলেও আশার আলো জাগিয়েছে। সামুদ্রিক ট্র্যাকিং ডেটা অনুসারে, কয়েক লাখ ব্যারেল রুশ তেল বর্তমানে কিউবার দিকে যাত্রা করছে। এই তেল সরবরাহ এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে কমিউনিস্ট শাসিত এই দ্বীপটি বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে ভুগছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটি দখল করার হুমকিও দিচ্ছেন।
কেপলারের বিশ্লেষণে তেল সরবরাহের বিস্তারিত
সামুদ্রিক চলাচল বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত রুশ ট্যাঙ্কার 'আনাতোলি কোলোডকিন' গত ৮ মার্চ রাশিয়ার প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে ৭ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বোঝাই করেছে। বুধবার, ১৮ মার্চ জিএমটি ১৬টায় জাহাজটি পূর্ব আটলান্টিকে কিউবার পথে অবস্থান করছিল। কেপলারের প্রতিবেদন অনুসারে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় শিপিং কোম্পানি সভকমফ্লট-এর মালিকানাধীন এই রুশ পতাকাবাহী জাহাজ ২৩ মার্চের দিকে দ্বীপের উত্তরে অবস্থিত মাতানজাস তেল টার্মিনালে তার মালামাল খালাস করার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
সোমবার এক ঘোষণায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি 'কিউবা দখলের গৌরব' অর্জন করতে চান। দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে হাভানার সঙ্গে আলোচনার মধ্যেই তিনি সেখানে 'যা খুশি তা-ই' করতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন। গত জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের শত্রু কিউবার ওপর চাপ আরও তীব্র করার চেষ্টা করছে। ট্রাম্প কিউবায় ভেনিজুয়েলার তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন এবং কিউবার কাছে তেল বিক্রি করা যেকোনো দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তার এই পদক্ষেপের ফলে কিউবা 'আর কোনো তেল বা টাকা' পাবে না।
অতিরিক্ত তেল সরবরাহ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব
কেপলারের তথ্য মতে, হংকংয়ের পতাকাবাহী 'সি হর্স' নামক আরেকটি ট্যাঙ্কার জানুয়ারির শেষের দিকে সাইপ্রাসের কাছে অন্য একটি জাহাজ থেকে প্রায় ২ লাখ ব্যারেল ডিজেল বোঝাই করেছে। ট্র্যাকারটি ইঙ্গিত দেয় যে, জাহাজটি ১৩ ফেব্রুয়ারি ভূমধ্যসাগর থেকে বেরিয়ে আটলান্টিক হয়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করে। ফেব্রুয়ারির শেষ এবং মার্চের শুরুর দিকে এর গতি ধীর হয়ে যায় এবং এটি একটি অনিয়মিত পথ অনুসরণ করে। বুধবার, ১৮ মার্চ জিএমটি ১৬টা ৩০ মিনিটের দিকে এটি উত্তর-পশ্চিম ক্যারিবীয় অঞ্চলে ছিল, যা কিউবার উপকূল থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
রুশ পতাকাবাহী 'আনাতোলি কোলোডকিন' জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি মেক্সিকো থেকে একটি চালানের পর থেকে কিউবা আর কোনো তেল আমদানি করতে পারেনি। মাদুরোর পতনের পর মেক্সিকোকেও এ ধরনের সরবরাহ বন্ধ করতে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।
এই সংকটময় সময়ে রাশিয়ার তেল সরবরাহ কিউবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে, যদিও মার্কিন হুমকি ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই সাহসী পদক্ষেপ কিউবার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।



