যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ড্রোন তৈরির কর্মসূচি হাতে নিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। ইতিমধ্যে একমুখী হামলা চালাতে সক্ষম ৩০ হাজার ড্রোন অর্ডার করা হয়েছে। পেন্টাগন ২০২৮ সাল নাগাদ তিন লাখ ড্রোন তৈরি করতে চায়। তবে এই বিশাল উদ্যোগের মধ্যেই একটি দুর্বলতা রয়েছে, যা নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বলয়ের বাইরে কম মানুষই কথা বলেন।
চুম্বকের জটিলতা
ড্রোন চালাতে বিরল খনিজ থেকে তৈরি চুম্বক প্রয়োজন। শিল্প প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুম্বকের ৯৮ শতাংশ চীনে তৈরি হয়। নিজেদের অস্ত্রভান্ডার বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র বিরল খনিজের নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা বাজেটে ড্রোনের জন্য ১ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।
বিরল খনিজ থেকে নিওডিমিয়াম-আয়রন-বোরনের মতো শক্তিশালী চুম্বক তৈরি হয়, যা জটিল প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত হয়। বর্তমানে এই শিল্পে চীনের আধিপত্য। এই সমস্যা সমাধানে গড়ে উঠেছে ‘আরইঅ্যালয়স’-এর মতো প্রতিষ্ঠান। তাদের দাবি, উত্তর আমেরিকায় খনি থেকে সরাসরি চুম্বক তৈরির একমাত্র সম্পূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা তাদের রয়েছে। তারা এমন প্রক্রিয়াজাত ধাতু তৈরি করে, যা সামরিক খাতের চুম্বক উৎপাদনে ব্যবহার করা যায় এবং চীনের কোনো সহায়তা প্রয়োজন হয় না।
পেন্টাগনের দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা
বিশ্লেষকেরা ইউক্রেনের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন। গত দুই বছরে ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রকে বদলে দিয়েছে, যা মেশিনগান আবিষ্কারের পর দেখা যায়নি। ২০২৪ সালে ইউক্রেন এক বছরে ১২ লাখের বেশি ড্রোন তৈরি করেছে, যার প্রায় প্রতিটিতে চীনের সরবরাহব্যবস্থা থেকে চুম্বক এসেছে।
ওয়াশিংটন এই শিক্ষা নিয়েছে। গত জুনে ‘আনলিশিং আমেরিকান ড্রোন ডোমিনেন্স’ নির্বাহী আদেশে সই করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার উদ্দেশ্য সামরিক ও বাণিজ্যিক খাতে ড্রোন উৎপাদন বাড়ানো। এক মাস পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ড্রোন কেনার প্রক্রিয়া জোরদার করার নির্দেশ দেন।
অর্থই সব সমাধান নয়
ড্রোন তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রচুর অর্থ রয়েছে, কিন্তু বিরল খনিজের ওপর নির্ভরশীলতা সমস্যা। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ড্রোনের মোটর থেকে সেন্সর—যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৯০০টি অস্ত্রব্যবস্থার প্রায় ৮০ হাজার উপাদানে চীনের তৈরি বিরল খনিজ ব্যবহার করা হয়। জেট ইঞ্জিন বা ড্রোনের মোটরের অতিরিক্ত তাপ ও চাপেও চুম্বকের কার্যক্ষমতা ধরে রাখে এই ভারী খনিজ। এগুলো ছাড়া চুম্বক দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
ড্রোনের জোয়ার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতকে নতুন রূপ দিচ্ছে। অ্যারোভাইরনমেন্ট, ক্রাটোস ডিফেন্স ও প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিসের মতো প্রতিষ্ঠান স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ এবং এআইয়ের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার প্রযুক্তিতে গভীরে প্রবেশ করছে। তবে এই খাত শেষ পর্যন্ত একই চুম্বক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
হিসাব সহজ: চীন যদি বিরল খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প সরবরাহকারী নেই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিরল খনিজ খাতে বিনিয়োগ করছে। যেমন ভলকান নামের প্রতিষ্ঠান চীনের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজের চুম্বক কারখানা তৈরি করছে। ট্রাম্প সরকার চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে খনি ব্যবসার অনুমোদনের জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প প্রতিবেদন অনুযায়ী, খনির অনুমতি পেতে ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। নতুন খনি পুরোপুরি সচল করতে গড়ে ২৯ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, যা বৈশ্বিকভাবে দীর্ঘ সময়।
হালকা বনাম ভারী বিরল খনিজ
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। ‘এমপি ম্যাটেরিয়ালস’-এর ৪০ কোটি ডলারের শেয়ার কিনে নিয়েছে পেন্টাগন, ফলে তারা প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বেশি শেয়ারের মালিক। এ ছাড়া দেশীয় উৎপাদকদের ঋণ দিয়েছে প্রতিরক্ষা দপ্তর।
তবে পেন্টাগনের এই প্রচেষ্টা বেশির ভাগ হালকা প্রকৃতির বিরল খনিজ ঘিরে, যেমন নিওডিয়ামিয়াম ও প্রাসিওডিয়ামিয়াম। এগুলো মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সাধারণ ইলেকট্রনিকসের চুম্বকে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে সামরিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন ভারী খনিজ, যেমন ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়াম। জেট ইঞ্জিন বা ড্রোনের মোটরের অতিরিক্ত তাপ ও চাপেও চুম্বকের কার্যক্ষমতা ধরে রাখে এই ভারী খনিজ। এগুলো ছাড়া চুম্বক দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এটাই সাধারণ বাণিজ্যিক ও সামরিক যন্ত্রাংশের মধ্যে মূল পার্থক্য।
বড় প্রশ্ন হলো—ড্রোনের চুম্বকের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কি চীনের ওপর নির্ভর করবে, নাকি নিজেরাই তৈরি করতে পারবে?



