পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিক্ষোভে নিহত ১৫, শরণার্থী আসন বিতর্ক
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিক্ষোভে নিহত ১৫

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রধান জেলাগুলোতে এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছে। পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কয়েক দশক আগে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে আসা শরণার্থীদের জন্য আইনসভার আসন সংরক্ষিত রাখার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল বেশ কয়েকটি অধিকারকর্মী সংগঠনের একটি জোট। এরপরই এ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

সহিংসতার ঘটনা ও হতাহত

কর্তৃপক্ষ এ জোটের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সহিংসতার অভিযোগ এনেছে। সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এর নেতাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এ পদক্ষেপ হাজার হাজার মানুষকে আঞ্চলিক রাজধানী মোজাফফরাবাদ অভিমুখে পদযাত্রা করা থেকে আটকাতে পারেনি।

স্থানীয় আইনসভার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসন এ অঞ্চলের বাইরে (পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশে) বসবাসকারী শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ। সাম্প্রতিক এ সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক ও চারজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়েছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিক্ষোভের অবস্থা

স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, বিক্ষোভকারীদের একটি বিশাল বহর রাওয়ালকোট শহরের চার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। বহরে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ রয়েছে। পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার প্রশাসক সরদার ওয়াহিদ খান বিবিসি উর্দুকে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ওই এলাকায় টহল দিচ্ছেন। পাশাপাশি বাসিন্দাদের ঘর থেকে বের না হতে বলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিক্ষোভকারীদের এ বহরকে রাওয়ালকোটের ভেতর দিয়ে মোজাফফরাবাদে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিবিসি উর্দুর সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন, স্থানীয় মসজিদগুলো থেকে মাইকিং করে মানুষকে ঘর থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। সেখানে আরও সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে সরদার ওয়াহিদ খান বলেছেন, আইনের শাসন ‘নিশ্চিত করা হবে’।

হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত

এদিকে গত বুধবার মোজাফফরাবাদে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে আরোহী ২২ জনের সবাই নিহত হয়েছেন। সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, উড্ডয়নের পরপরই ‘কারিগরি ত্রুটি’ দেখা দেওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

বিক্ষোভের কারণ: শরণার্থী আসন সংরক্ষণ

আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্থানীয় আইনসভা নির্বাচনে কাশ্মীরী শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বাইরে বসবাসকারী এ শরণার্থীদের জন্য আসন বরাদ্দ রাখার বিষয়টি এই অঞ্চলে একটি বড় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কেননা, স্থানীয় বাসিন্দারা আইনসভার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কয়েক দশক আগে এ সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের শাসনকাজে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা। শরণার্থীরা কাশ্মীরের দীর্ঘদিনের বিরোধ মীমাংসা হলে একদিন নিজেদের ঘরে ফেরার আশা নিয়ে পাকিস্তানে বসবাস করছেন।

বেশ কয়েকটি অধিকারকর্মী সংগঠনের মোর্চা ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি) এ সংরক্ষিত আসন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, এ ব্যবস্থা স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করছে। তাই আইনসভার সব আসনে শুধু এই অঞ্চলে প্রকৃতভাবে বসবাসকারীদেরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকা উচিত। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, এ আসনগুলোর সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

আইনি ও প্রশাসনিক অবস্থান

স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় গত ৫ জুন জেএএসিকে নিষিদ্ধ করে কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, সংগঠনটি ‘সন্ত্রাসবাদে লিপ্ত’ এবং ‘অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর উপায়ে’ কার্যক্রম চালাচ্ছে।

এদিকে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল রেফারেন্সের (রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে চাওয়া আইনি মতামত) পরিপ্রেক্ষিতে বিস্তারিত পরামর্শমূলক মতামত দিয়েছেন পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালত রায়ে বলেন, আসনগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত। তাই কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ, রাজনৈতিক চুক্তি বা জনগণের চাপের মুখে এগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

কাশ্মীরের প্রেক্ষাপট

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর নিজস্ব আঞ্চলিক সরকার চালিত একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর থেকে দীর্ঘ ৭০ বছরের বেশি সময় ধরেই গোটা কাশ্মীর অঞ্চল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধের মূল উৎস হয়ে রয়েছে। নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ—উভয় পক্ষই হিমালয় অঞ্চলের এ কাশ্মীরকে নিজেদের একক ভূখণ্ড বলে দাবি করে। কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে প্রতিবেশী দেশ দুটি পূর্ণাঙ্গ দুটি যুদ্ধ এবং একটি সীমিত পরিসরের যুদ্ধে জড়িয়েছে। বর্তমানে দুই প্রতিবেশীর কেউই পুরো কাশ্মীর নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং তারা এর একেকটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।